মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত লাখো প্রবাসী বাংলাদেশির জীবনে গভীরভাবে পড়ছে। আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে তারা এখন এক অনিশ্চিত সময় পার করছেন। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও।
যুদ্ধের ছায়ায় প্রবাসীদের অনিশ্চিত জীবন
সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা বর্তমানে দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন। একদিকে ড্রোন ও মিসাইল হামলার আতঙ্ক, অন্যদিকে কর্মসংস্থান হারানোর ভয়—এই দুই চাপের মধ্যে তাদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে। আবুধাবি ও দুবাইসহ বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী প্রবাসীরা জানাচ্ছেন, প্রতিদিনই তাদের মধ্যে এক ধরনের অজানা আতঙ্ক কাজ করছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মীদের ক্ষেত্রে।

আয় কমে ৭০ শতাংশ, থমকে গেছে অর্থনীতি
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমিরাতের পর্যটন ও শিক্ষা খাত বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। স্কুলগুলো অনলাইনে চলে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মরত বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। একই সঙ্গে পর্যটন কার্যক্রম কমে যাওয়ায় ট্যাক্সিচালকদের আয় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
নির্মাণ, ডেলিভারি ও পরিচ্ছন্নতা খাতেও নতুন কাজের সুযোগ কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমাতে কর্মী ছাঁটাই করছে বা বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাচ্ছে। ফলে হাজার হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক আয়হীন হয়ে পড়ছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে চরম সংকট
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে আমিরাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ছে দ্রুত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে চাপ সৃষ্টি করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমিরাতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ খাদ্য আমদানি নির্ভর হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
আইনি ঝুঁকি ও কূটনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা
যুদ্ধ সংক্রান্ত ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রকাশের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক প্রবাসী অজান্তেই আইনি জটিলতায় পড়ছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রবাসীদের অভিযোগ, বিপদের সময় দূতাবাসের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা বা সচেতনতা কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। ফলে সংকটে পড়া শ্রমিকরা নিজেদের মতো করেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন।
প্রাণহানি ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
ড্রোন ও মিসাইল হামলার ঘটনায় কিছু বাংলাদেশি হতাহত হয়েছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার দায়িত্ব নিচ্ছে, তবে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে সামরিক স্থাপনা বা সংবেদনশীল এলাকার আশপাশে বসবাসকারীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ আসে এই দেশ থেকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আয় কমে যাওয়ায় প্রবাসীরা আগের মতো অর্থ পাঠাতে পারছেন না। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

জরুরি পদক্ষেপের দাবি
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দূতাবাসের সক্রিয় ভূমিকা বাড়ানো এবং সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পরিস্থিতি উন্নত না হলে শুধু প্রবাসীদের ব্যক্তিগত জীবনই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















