০২:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি জব্দ করল বিজিবি শহরে বিদ্যুৎ স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামে লোডশেডিং বাড়ছে তেলের দাম ১৫০ ডলারের ওপরে পৌঁছাতে পারে যদি যুদ্ধবিরতি না হয় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন উত্তপ্ত: পশ্চিম তীরের আগুন আরও তীব্র ও অদৃশ্য আরটেমিস II মহাকাশচারীরা চাঁদের চারপাশের ঐতিহাসিক অভিযানের পর বাড়ি ফিরছেন ট্রাম্প বললেন, ইরানের প্রস্তাব হামলা বন্ধের জন্য যথেষ্ট নয় ইসরায়েল ইরানের প্রধান পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বিমান হামলা চালাল তেহরানের শারিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমান হামলা, ইরানজুড়ে ক্ষোভ ইরানকে ট্রাম্পের হুশিয়ারি: চুক্তি না হলে ধ্বংসের হুমকি দেমিস হাসাবিস: গুগল ডিপমাইন্ডের ভিশনারি বিজ্ঞানীর আড়ালে জ্ঞান ও প্রযুক্তি

দেমিস হাসাবিস: গুগল ডিপমাইন্ডের ভিশনারি বিজ্ঞানীর আড়ালে জ্ঞান ও প্রযুক্তি

গুগল ডিপমাইন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা দেমিস হাসাবিস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এক প্রতিভাধর ভিশনারি হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সেবাস্তিয়ান ম্যালাবির লেখা “দ্য ইনফিনিটি মেশিন”, যা শুধুই হাসাবিসের ব্যক্তিগত জীবনের বিবরণ নয়, বরং কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই তৈরির পটভূমি, তার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং গবেষণার নানা কৌশলকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে।

এক স্বপ্নদ্রষ্টার জীবনদর্শন

ম্যালাবির লেখায় হাসাবিসকে একজন নিঃস্বার্থ ও মানবিক দিকসম্পন্ন বিজ্ঞানী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার লক্ষ্য ছিল কোনো ক্ষমতা, অর্থ বা স্বার্থ নয়, বরং এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা যা বিজ্ঞানের সমস্ত জটিল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। দেমিস হাসাবিসের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কল্যাণে প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে কাজে লাগানো। তার এই জীবনদর্শনকে কখনও কখনও মেসিয়ানিক বা দূরদর্শী বলা হয়, তবে এটি তার বিজ্ঞানী এবং মানবিক মূল্যবোধের সংমিশ্রণকে নির্দেশ করে।

The man behind Google's AI machine: Watch CNBC's full interview with  DeepMind CEO Demis Hassabis

ডিপমাইন্ডের সূচনা ও এজিআই ধারণা

২০১০ সালে দেমিস হাসাবিস শেইন লেগ এবং মুস্তাফা সুলেমানের সঙ্গে ডিপমাইন্ড প্রতিষ্ঠা করেন। তখনও এজিআই বা কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ স্পষ্ট ধারণা ছিল না। শেইন লেগ এ ধারণার প্রচার করেছেন, তবে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে “সাধারণ” বুদ্ধিমত্তা মানে মানবসদৃশ হওয়া আবশ্যক নয়। অন্যদিকে, হাসাবিসের নিউরোসায়েন্স পটভূমি তাকে প্ররোচিত করেছিল মানব মস্তিষ্ককে অন্তত একটি দিকনির্দেশক হিসেবে কাজে লাগাতে। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি এআই তৈরি করা যা নিজে নিজে শেখার মাধ্যমে জটিল সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে।

নিজে শেখার প্রযুক্তি: গেম থেকে জটিল বিজ্ঞান

ডিপমাইন্ডের মূল কৌশল ছিল এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা যা নিজেই গেম খেলতে শিখবে। গেম খেলা মানে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এআই বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করতে পারে এবং পরবর্তীতে জটিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়। ‘নিজে শেখা’ বা রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং পদ্ধতিতে এআই তার কৌশল আবিষ্কার করে, যা মানুষ দ্বারা সরাসরি পরিচালিত হলে কখনো মানুষের সৃজনশীলতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারত না।

এই প্রযুক্তি ডিপমাইন্ডকে সাধারণ আর্কেড গেম পং থেকে শুরু করে জটিল গো খেলার সক্ষমতা প্রদান করে। বিশ্বসেরা গো খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বিজয় এনে দেয়, যা প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক মানচিত্রে তুলে ধরে। একই প্রযুক্তি প্রোটিন ফোল্ডিং সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের পথ খুলে দেয়, যা হাসাবিস এবং তার সহকর্মীকে ২০২৪ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার এনে দেয়।

Demis Hassabis - Wikipedia

প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ

২০১৭ সালে ডিপমাইন্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই ট্রান্সফরমার মডেল ব্যবহার করে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে। ট্রান্সফরমার মডেলগুলি বৃহৎ পরিমাণে মানব-উৎপাদিত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাক্কলিত উত্তর তৈরি করতে পারে। এটি প্রথমে হাসাবিসসহ অনেক বিশেষজ্ঞের চোখে “অধিক সাধারণ” হলেও কিছু ভুল উত্তর দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে ব্যবসায়িক দিক থেকে ওপেনএআই ছিল অনেক বেশি চতুর এবং প্রায়শই বাণিজ্যিক লক্ষ্যসম্পন্ন। ডিপমাইন্ড কখনো কোনো বাণিজ্যিক পণ্য প্রকাশ করেনি। ফলে ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার সময় গুগল কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।

নৈতিকতা, আবিষ্কার এবং এজিআই-এর সীমা

ম্যালাবির লেখায় হাসাবিসকে একজন বুদ্ধিমান এবং নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বিজ্ঞানী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এজিআই কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তার সীমা ও ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি। প্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য গতিপথে একজন বিজ্ঞানীর নৈতিক চিন্তাভাবনা কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে না। জিওফ্রি হিন্টন মন্তব্য করেছেন যে, নতুন আবিষ্কারের প্রলোভন প্রায়ই নৈতিক দ্বিধাকে ছাপিয়ে যায়।

ডিপমাইন্ডের উদাহরণ প্রমাণ করে যে, ব্যক্তিগত প্রতিভা এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মিলিয়ে কাজ করলে প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী এবং মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব। হাসাবিসের কাজ দেখায়, বিজ্ঞানী ও মানবিক মূল্যবোধের সংমিশ্রণ আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে এক অনন্য চাবিকাঠি হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি জব্দ করল বিজিবি

দেমিস হাসাবিস: গুগল ডিপমাইন্ডের ভিশনারি বিজ্ঞানীর আড়ালে জ্ঞান ও প্রযুক্তি

১২:৪৮:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬

গুগল ডিপমাইন্ডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা দেমিস হাসাবিস কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এক প্রতিভাধর ভিশনারি হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সেবাস্তিয়ান ম্যালাবির লেখা “দ্য ইনফিনিটি মেশিন”, যা শুধুই হাসাবিসের ব্যক্তিগত জীবনের বিবরণ নয়, বরং কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা এজিআই তৈরির পটভূমি, তার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং গবেষণার নানা কৌশলকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে।

এক স্বপ্নদ্রষ্টার জীবনদর্শন

ম্যালাবির লেখায় হাসাবিসকে একজন নিঃস্বার্থ ও মানবিক দিকসম্পন্ন বিজ্ঞানী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার লক্ষ্য ছিল কোনো ক্ষমতা, অর্থ বা স্বার্থ নয়, বরং এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা যা বিজ্ঞানের সমস্ত জটিল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। দেমিস হাসাবিসের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কল্যাণে প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে কাজে লাগানো। তার এই জীবনদর্শনকে কখনও কখনও মেসিয়ানিক বা দূরদর্শী বলা হয়, তবে এটি তার বিজ্ঞানী এবং মানবিক মূল্যবোধের সংমিশ্রণকে নির্দেশ করে।

The man behind Google's AI machine: Watch CNBC's full interview with  DeepMind CEO Demis Hassabis

ডিপমাইন্ডের সূচনা ও এজিআই ধারণা

২০১০ সালে দেমিস হাসাবিস শেইন লেগ এবং মুস্তাফা সুলেমানের সঙ্গে ডিপমাইন্ড প্রতিষ্ঠা করেন। তখনও এজিআই বা কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ স্পষ্ট ধারণা ছিল না। শেইন লেগ এ ধারণার প্রচার করেছেন, তবে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে “সাধারণ” বুদ্ধিমত্তা মানে মানবসদৃশ হওয়া আবশ্যক নয়। অন্যদিকে, হাসাবিসের নিউরোসায়েন্স পটভূমি তাকে প্ররোচিত করেছিল মানব মস্তিষ্ককে অন্তত একটি দিকনির্দেশক হিসেবে কাজে লাগাতে। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি এআই তৈরি করা যা নিজে নিজে শেখার মাধ্যমে জটিল সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে।

নিজে শেখার প্রযুক্তি: গেম থেকে জটিল বিজ্ঞান

ডিপমাইন্ডের মূল কৌশল ছিল এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা যা নিজেই গেম খেলতে শিখবে। গেম খেলা মানে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এআই বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করতে পারে এবং পরবর্তীতে জটিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়। ‘নিজে শেখা’ বা রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং পদ্ধতিতে এআই তার কৌশল আবিষ্কার করে, যা মানুষ দ্বারা সরাসরি পরিচালিত হলে কখনো মানুষের সৃজনশীলতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারত না।

এই প্রযুক্তি ডিপমাইন্ডকে সাধারণ আর্কেড গেম পং থেকে শুরু করে জটিল গো খেলার সক্ষমতা প্রদান করে। বিশ্বসেরা গো খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বিজয় এনে দেয়, যা প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক মানচিত্রে তুলে ধরে। একই প্রযুক্তি প্রোটিন ফোল্ডিং সমস্যা সমাধানে ব্যবহার করে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের পথ খুলে দেয়, যা হাসাবিস এবং তার সহকর্মীকে ২০২৪ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার এনে দেয়।

Demis Hassabis - Wikipedia

প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ

২০১৭ সালে ডিপমাইন্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই ট্রান্সফরমার মডেল ব্যবহার করে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে। ট্রান্সফরমার মডেলগুলি বৃহৎ পরিমাণে মানব-উৎপাদিত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাক্কলিত উত্তর তৈরি করতে পারে। এটি প্রথমে হাসাবিসসহ অনেক বিশেষজ্ঞের চোখে “অধিক সাধারণ” হলেও কিছু ভুল উত্তর দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে ব্যবসায়িক দিক থেকে ওপেনএআই ছিল অনেক বেশি চতুর এবং প্রায়শই বাণিজ্যিক লক্ষ্যসম্পন্ন। ডিপমাইন্ড কখনো কোনো বাণিজ্যিক পণ্য প্রকাশ করেনি। ফলে ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার সময় গুগল কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।

নৈতিকতা, আবিষ্কার এবং এজিআই-এর সীমা

ম্যালাবির লেখায় হাসাবিসকে একজন বুদ্ধিমান এবং নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বিজ্ঞানী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এজিআই কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তার সীমা ও ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি। প্রযুক্তির অপ্রতিরোধ্য গতিপথে একজন বিজ্ঞানীর নৈতিক চিন্তাভাবনা কখনোই পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে না। জিওফ্রি হিন্টন মন্তব্য করেছেন যে, নতুন আবিষ্কারের প্রলোভন প্রায়ই নৈতিক দ্বিধাকে ছাপিয়ে যায়।

ডিপমাইন্ডের উদাহরণ প্রমাণ করে যে, ব্যক্তিগত প্রতিভা এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি মিলিয়ে কাজ করলে প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী এবং মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব। হাসাবিসের কাজ দেখায়, বিজ্ঞানী ও মানবিক মূল্যবোধের সংমিশ্রণ আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে এক অনন্য চাবিকাঠি হতে পারে।