চীনা পণ্যের ওপর কড়া শুল্ক আরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি ব্যবস্থায় এক নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পণ্যের প্রকৃত দাম কম দেখানো, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে চালান ঘোরানো, কাগজে-কলমে হিসাব বদলে শুল্ক কমানো এবং কোথাও কোথাও সরাসরি প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ বাড়ছে। এতে শুধু সরকারের রাজস্বই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সৎ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
শুল্ক বাড়ার পরই বদলে গেল চালানের হিসাব
বাণিজ্য-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী কনটেইনারে ঘোষিত পণ্যমূল্য হঠাৎ বড় অঙ্কে কমে গেছে। অথচ বিশ্বের অন্য দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া চালানে এমন নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায়নি। এতে সন্দেহ জোরালো হয়েছে যে, অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে শুল্কের বোঝা হালকা করার পথ নিয়েছেন। কারণ শুল্ক সাধারণত ঘোষিত মূল্যের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। ঘোষিত মূল্য যত কম, পরিশোধযোগ্য শুল্কও তত কম।

কারসাজির পথ কত রকম
এই প্রবণতার পেছনে একাধিক কৌশল কাজ করছে। কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি উৎপাদন ঘাঁটি বদলে ভিয়েতনাম, মেক্সিকো বা অন্য তুলনামূলক কম শুল্কের দেশে কারখানা গড়েছে। আবার অনেকে উৎপাদন না সরিয়েও হিসাবের খেলায় শুল্ক কমানোর চেষ্টা করছে। কোথাও পণ্যের আসল দাম গোপন রাখা হচ্ছে, কোথাও মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাগজে দাম পরিবর্তন করা হচ্ছে, আবার কোথাও আমদানিকারকের বদলে সরবরাহকারীই সব শুল্ক ও পরিবহন ব্যয় বহনের প্রস্তাব দিচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে এসব পদ্ধতি ব্যবসায়িক সুবিধা মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অনেক ক্ষেত্রেই তা আইনি প্রশ্ন তৈরি করছে।
ছোট ব্যবসায়ীদের সামনে বাঁচা-মরার লড়াই
শুল্কের বাড়তি চাপ সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা। অনেকের জন্য বড় অঙ্কের শুল্ক বিল সরাসরি ব্যবসার অস্তিত্ব সংকটে পরিণত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় কিছু চীনা সরবরাহকারী নির্দিষ্ট একক মূল্যে পণ্য পাঠানো, শুল্ক মেটানো এবং গুদাম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। এতে ক্রেতা আগাম খরচের একটা নিশ্চয়তা পেলেও প্রকৃতপক্ষে কত শুল্ক দেওয়া হচ্ছে, তা অনেক সময় তার জানা থাকে না। ফলে ব্যবসায়ী দাম বাড়ানো এড়াতে পারলেও পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে।

সৎ ব্যবসায়ীরা কেন ক্ষুব্ধ
যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে শুল্ক দিচ্ছে, তারা বলছে প্রতিযোগিতার মাঠ দ্রুত অসম হয়ে যাচ্ছে। কেউ যদি প্রকৃত দামের চেয়ে অনেক কম মূল্য দেখিয়ে পণ্য ছাড় করিয়ে নেয়, তবে সে বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারবে। এতে নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে পড়বে। কিছু ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীরা এমন সব মূল্য ঘোষণা করছে যা বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে মেলে না। তাদের অভিযোগ, এতে সঠিকভাবে পরিচালিত ব্যবসা বিনিয়োগ করেও সুবিধা পাচ্ছে না। বরং প্রতারণাই যেন লাভজনক হয়ে উঠছে।
সবই কি অবৈধ
বিষয়টি পুরোপুরি একরৈখিক নয়। কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমন কিছু হিসাবপদ্ধতি ব্যবহার করে, যা আইনের মধ্যে থেকেই আমদানি মূল্যের একটা অংশ আলাদা করে দেখাতে পারে। যেমন নকশা, ব্র্যান্ড-মূল্য, সফটওয়্যার বা বিতরণ অধিকারের মতো অদৃশ্য মূল্যকে পণ্যের শারীরিক দামের বাইরে দেখানো হয়। আবার এমন ব্যবস্থাও আছে, যেখানে বিদেশি উৎপাদক তার নিজস্ব পরিবেশককে কম দামে পণ্য দেখিয়ে প্রথম ধাপের বিক্রয়মূল্যের ওপর শুল্ক নির্ধারণের সুবিধা নেয়। কাগজে এসব বৈধ পদ্ধতি থাকলেও, এর সুযোগে কোথায় আইনসম্মত হিসাব শেষ হচ্ছে আর কোথা থেকে অপব্যবহার শুরু হচ্ছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

বাণিজ্য পরিসংখ্যানে তৈরি হচ্ছে নতুন ধোঁয়াশা
এই কারসাজির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে বাণিজ্য তথ্যের ওপর। কাগজে-কলমে যদি পণ্যের মূল্য কম দেখানো হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চীন থেকে আমদানি কমেছে বলে যে চিত্র উঠে আসছে, তার একটা অংশ বিভ্রান্তিকরও হতে পারে। দুই দেশের সরকারি বাণিজ্য পরিসংখ্যানের মধ্যে যে বড় ফারাক দেখা যাচ্ছে, সেটিও এই সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ বাস্তব বাণিজ্য আর ঘোষিত বাণিজ্যের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়বে, অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র বোঝাও তত কঠিন হবে।
কাস্টমসের সামনে কঠিন বাস্তবতা
শুল্ক ফাঁকি বা মূল্য জালিয়াতি প্রমাণ করা সহজ নয়। বিশেষ করে বিদেশি প্রতিষ্ঠান, শেল কোম্পানি, মধ্যবর্তী ক্রেতা-বিক্রেতা এবং সীমান্তপারের জটিল কাগজপত্র জড়িত থাকলে তদন্ত আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসন নজরদারি বাড়ানোর কথা বললেও সমালোচকেরা বলছেন, সমস্যার পরিসর এত বড় যে কেবল বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে তা ঠেকানো কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে ধরা পড়ার আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান উধাও হয়ে যায় বা নতুন নামে কাজ শুরু করে।

শুল্কযুদ্ধের নতুন বাস্তবতা
পুরো পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, শুল্ক যত বাড়ে, তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রলোভনও তত বাড়ে। ফলে এটি আর শুধু আমদানি-রপ্তানির হিসাবের বিষয় নয়; এটি এখন ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা, সরকারি রাজস্ব, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্য স্বচ্ছতার প্রশ্ন। যে শুল্কনীতি দিয়ে এক দেশ অন্য দেশের ওপর চাপ তৈরি করতে চায়, সেই নীতিই অনেক সময় নতুন ধোঁয়াশা, হিসাবি কারসাজি এবং প্রতারণার দরজা খুলে দেয়। আর শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্বচ্ছ ব্যবসা ও বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা।
বিকল্প শিরোনাম
শুল্কের চাপ বাড়তেই চীনা পণ্যে মূল্য কারসাজির অভিযোগ জোরালো
চীনা আমদানিতে নতুন ফাঁকির পথ, ঘোষিত দাম কমিয়েই কমছে শুল্ক
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















