বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বাংলাদেশকে বছরে অতিরিক্ত ৬১ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
ঢাকা চেম্বারের মিলনায়তনে “বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কা: বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ও করণীয়” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
কেন বাংলাদেশ ঝুঁকিতে
তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে বাংলাদেশের ওপর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হতে পারে। এর সঙ্গে গ্যাস ও জ্বালানি আমদানিতে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়বে।

অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ছে
তিনি বলেন, জ্বালানির বাড়তি খরচে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, বাজেটের চাপ বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসানও ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট
তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশে জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। বিদ্যুতের ঘাটতিও ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
এর ফলে উৎপাদন, রপ্তানি এবং দেশের ভেতরের পণ্য সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।
কোন খাতগুলো বেশি চাপে

উপস্থাপনায় বলা হয়, তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, ইস্পাত ও ওষুধশিল্পের মতো খাতগুলোতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পণ্য পরিবহন খরচও ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এ ছাড়া প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪ হাজার ডলার খরচ যোগ হওয়ায় রপ্তানি পণ্যের দামও বাড়ছে। এতে বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে।
সাধারণ মানুষ ও কৃষিতে প্রভাব
তিনি বলেন, এই সংকট শুধু বড় শিল্পে নয়, ছোট ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা জ্বালানি সমস্যাকে এখন বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। আবার ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষকদের সেচ খরচও বেড়েছে। এতে খাদ্যনিরাপত্তি নিয়েও দুশ্চিন্তা তৈরি হচ্ছে।

সমাধানে কী করতে হবে
তাসকীন আহমেদ বলেন, এই ঝুঁকি কমাতে বাংলাদেশকে এখনই জ্বালানির উৎস বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস আমদানির চুক্তি করতে হবে।
উপস্থাপনায় আরও বলা হয়, জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে হবে, রপ্তানিমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি দিতে হবে এবং গ্যাস সংরক্ষণ ও অবকাঠামো বাড়াতে হবে।
সামনে কী ঝুঁকি
তাসকীন আহমেদ সতর্ক করে বলেন, এখনই পরিষ্কার জ্বালানি পরিকল্পনা নেওয়া না হলে বাংলাদেশ বড় অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে পারে। তিনি দেশের প্রবৃদ্ধি ও শিল্পখাতকে সুরক্ষায় দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















