হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের দল এবার এমন এক নির্বাচনী লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে, যেখানে দেশের প্রান্তিক রোমা জনগোষ্ঠীই হয়ে উঠতে পারে ফল নির্ধারণের বড় শক্তি। বহু বছর ধরে সরকারি চাকরি, সামাজিক সহায়তা এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের জটিল সম্পর্কের মধ্যে আটকে থাকা এই জনগোষ্ঠী এখন প্রশ্ন তুলছে—অরবানের শাসন তাদের সত্যিই এগিয়ে নিয়েছে, নাকি আরও গভীর প্রান্তিকতায় ঠেলে দিয়েছে।
ভোটের আগে কেন রোমারা এত গুরুত্বপূর্ণ
হাঙ্গেরির মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রোমা জনগোষ্ঠী। নির্বাচনের লড়াই যখন খুবই হাড্ডাহাড্ডি অবস্থায়, তখন এই জনগোষ্ঠীর ভোট বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অরবানের সরকার দরিদ্র ও বেকার মানুষের জন্য স্বল্পদক্ষতার সরকারি কাজের ব্যবস্থা করেছে, যার বড় অংশই গেছে রোমাদের কাছে। এতে একদিকে কিছু মানুষের জীবিকা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ—এই সুবিধা রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

শিক্ষানীতির কেন্দ্রে ক্ষোভ
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। অরবানের সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্কুল ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হাতে চলে যায়। পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত স্কুলে বেশি অর্থায়নের ফলে সাধারণ সরকারি স্কুলগুলো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, এতে রোমা শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে আরও দূরে সরে গেছে।
সমালোচকদের মতে, বাধ্যতামূলক শিক্ষার বয়স আঠারো থেকে ষোলোতে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত রোমা শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। এতে অনেকেই অল্প বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে কম মজুরির কাজের দিকে ঠেলে গেছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এই নীতি রোমাদের দারিদ্র্যের চক্র ভাঙার বদলে সেটিকে আরও শক্ত করেছে।
সরকার যা বলছে
সরকারি পক্ষ অবশ্য এই সমালোচনা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ফলে সারাদেশে একরকম শিক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। আরও বলা হচ্ছে, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা শিক্ষকদের জন্য বাড়তি সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভাষ্য, রোমাদের উন্নয়নে তারা ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে আগের চেয়ে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে।
তবে বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ, কিছু উন্নতির পরও রোমা শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখনও আলাদা বা প্রায় আলাদা পরিবেশে পড়াশোনা করছে। অর্থাৎ সামাজিক বৈষম্য পুরোপুরি ভাঙেনি।

অপমানজনক মন্তব্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে
নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সরকারের এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর বর্ণবাদী মন্তব্যে। সেই মন্তব্যে রোমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে দুঃখ প্রকাশ করা হলেও অনেকের কাছে এটি ছিল সরকারের ভেতরে থাকা মানসিকতার প্রকাশ। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন বহুদিনের চাপা অসন্তোষ প্রকাশ্যে উঠে আসে।
প্রচারযুদ্ধের নতুন হিসাব
অরবানের দল এবার অভিবাসন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং ইউরোপীয় রাজনীতিকে সামনে এনে ভোট চাইছে। এই প্রচার কিছু রোমা ভোটারের মধ্যেও সাড়া ফেলতে পারে, বিশেষ করে যারা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। আবার বিরোধীরা বলছে, এই প্রচারের আড়ালে রোমাদের শিক্ষা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়নের আসল প্রশ্ন চাপা পড়ে যাচ্ছে।
তাই ভোটের ময়দানে এখন কেবল উন্নয়ন বনাম বঞ্চনার হিসাবই নয়, বরং আস্থার লড়াইও চলছে। যারা আগে সুবিধা পেয়েছে, তারা অরবানের পাশে থাকতে পারে। কিন্তু যারা মনে করছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিচের স্তরে আটকে রাখা হয়েছে, তারা ভিন্ন সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
এক তরুণীর গল্পে উঠে এল বড় বাস্তবতা
এই বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে এক রোমা তরুণীর অভিজ্ঞতা। তাকে সাধারণ উচ্চশিক্ষার পথ ছেড়ে কারিগরি শিক্ষায় যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই চাপ মানেননি। নিজের ইচ্ছায় এগিয়ে গিয়ে এখন আইন পেশায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, রোমা শিক্ষার্থীদের জন্য স্বপ্ন দেখার পথ এখনও কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
শেষ কথা
হাঙ্গেরির এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়, এটি দেশটির প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কেরও এক পরীক্ষা। রোমারা যদি মনে করে তাদের জন্য দেওয়া সুবিধা যথেষ্ট নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, তাহলে সেই ক্ষোভ ব্যালট বাক্সে বড় বার্তা হয়ে ফিরতে পারে। আর যদি জীবিকা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে তারা পুরোনো সমীকরণেই থাকে, তাহলে অরবানের জন্য সেটিই হতে পারে শেষ মুহূর্তের ভরসা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















