নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিদলের মধ্যে বুধবার অনুষ্ঠিত বৈঠক তীব্র উত্তেজনা ও পারস্পরিক অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। বৈঠক শেষে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগ তোলে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন পরিচালনা এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বৈঠকে কারা ছিলেন
তৃণমূলের প্রতিনিধিদলে ছিলেন রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন, উপনেতা সাগরিকা ঘোষ, সাংসদ সাকেত গোখলে এবং মেনকা গুরুস্বামী। তাঁদের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনার এস. এস. সান্ধু ও বিবেক যোশী।
উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বৈঠক
তৃণমূলের অভিযোগ, আলোচনার একপর্যায়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁদের উদ্দেশে “চলে যান” ধরনের অপমানজনক মন্তব্য করেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডেরেক ও’ব্রায়েন উচ্চস্বরে কথা বলেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কথা বলতে বাধা দেন। কমিশনের বক্তব্য ছিল, বৈঠকের পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বজায় রাখতে শালীনতা রক্ষা করা প্রয়োজন।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, বৈঠকটি শুধুই প্রশাসনিক আলোচনা ছিল না; তা দ্রুত রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
কমিশনের বার্তা
বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশন সামাজিক মাধ্যমে জানায়, এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হবে ভয়মুক্ত, সহিংসতামুক্ত, ভীতিমুক্ত, প্রলোভনমুক্ত এবং জাল ভোট, বুথ দখল ও অন্যান্য কারসাজিমুক্ত। এই বার্তায় কমিশন বোঝাতে চেয়েছে যে রাজ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে তারা দৃঢ় অবস্থানে আছে।
তবে তৃণমূলের নেতারা এই অবস্থানকে নিরপেক্ষ আশ্বাস হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখেছেন।
ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ নাম বাদ পড়া নিয়ে উদ্বেগ
এই বৈঠকটি হয় এমন এক সময়, যখন পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়ার পর ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে আসে। এই বিপুল বাদ পড়া ভোটারসংখ্যা নিয়েই মূলত উদ্বেগ বাড়ে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়।
তৃণমূলের বক্তব্য, এত বড় পরিসরে নাম বাদ যাওয়া শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে ভোটের স্বচ্ছতা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন সরাসরি জড়িত।
মমতার চিঠি, অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
ডেরেক ও’ব্রায়েন সাংবাদিকদের বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা নয়টি চিঠি তাঁরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের হাতে তুলে দেন, কিন্তু সেগুলোর কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন কীভাবে কমিশন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করবে, যখন পশ্চিমবঙ্গে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সেই প্রশ্নের জবাবেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁদের প্রতি অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করেন বলে তিনি দাবি করেন।
ও’ব্রায়েন আরও বলেন, তাঁরা কমিশনের এমন একধরনের বৈঠক আগেও বহুবার দেখেছেন, যেখানে অন্য কমিশনাররা কার্যত নীরব থাকেন এবং শুধু প্রধান নির্বাচন কমিশনারই কথা বলেন। তাঁর কথায়, বৈঠকের পরিবেশ ছিল একমুখী, এবং প্রতিনিধিদলের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়নি।
সাগরিকা ঘোষের কড়া প্রতিক্রিয়া
সাগরিকা ঘোষ নির্বাচন কমিশনের অভিযোগকে সরাসরি মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন। তাঁর দাবি, কমিশন যে আচরণের কথা বলছে, তা চার সদস্যের প্রতিনিধিদলকে বলা হয়নি। তিনি বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁদের সঙ্গে মাত্র দুটি কথা বলেছেন। প্রথমটি ছিল, তাঁদের অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী কোথায়। দ্বিতীয়টি ছিল অপমানজনক “চলে যান” মন্তব্য।
তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, তৃণমূল শুধু বৈঠকের ভাষা বা পরিবেশ নিয়েই ক্ষুব্ধ নয়; তারা মনে করছে, তাদের রাজনৈতিক মর্যাদাকেও খাটো করা হয়েছে।
গোখলের অভিযোগ
সাকেত গোখলে সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে আলাদা করে নিশানা করছে। তাঁর বক্তব্যে তৃণমূলের সেই আশঙ্কাই সামনে আসে, যেখানে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ দীর্ঘতর রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিচ্ছে।
![]()
নাগরিক সমাজের সমালোচনা
দিনের পরের ভাগে নাগরিক সমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, যার মধ্যে যোগেন্দ্র যাদব ও প্রশান্ত ভূষণও ছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
যোগেন্দ্র যাদব বিস্তারিত উপস্থাপনায় বলেন, এটি আসলে কোনো নিবিড় পুনর্বিবেচনা নয়, বরং ভোটারদের পথে বাধা তৈরি করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। তাঁর কথায়, এটি সংশোধন নয়, কার্যত নতুন করে লিখে ফেলার চেষ্টা।
মুসলিম ভোটারদের নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
নিজের বক্তব্যের পক্ষে উদাহরণ দিতে গিয়ে যোগেন্দ্র যাদব নন্দীগ্রামের কথা তোলেন। তিনি বলেন, সেখানে মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুসলিম, অথচ বাদ পড়া ভোটারের ৯৫ শতাংশই মুসলিম। তাঁর দাবি, এই তথ্য প্রক্রিয়াটির নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর দিনাজপুরে, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তাঁর আশঙ্কা, মুসলিম ভোটারদের পর এবার নারীরাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।

বিতর্কের গভীরতা কোথায়
পুরো ঘটনার মধ্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের মধ্যে আস্থার সংকট এখন আরও প্রকট। দ্বিতীয়ত, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনায় শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের অভিযোগও জোরালো হচ্ছে।
তৃণমূলের দৃষ্টিতে এই বৈঠক ছিল অসম্মানজনক এবং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের উদাহরণ। কমিশনের দৃষ্টিতে এটি ছিল শৃঙ্খলা ও মর্যাদা বজায় রাখার প্রশ্ন। কিন্তু সাধারণ ভোটারের কাছে মূল প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে একটাই—পশ্চিমবঙ্গে সত্যিই কি অবাধ, সুষ্ঠু এবং সবার জন্য সমান নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে?
এই বৈঠক সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি, বরং সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















