সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকার ফুটপাত আবারও বিশৃঙ্খলায় ফিরেছে। এতে জনসাধারণের জন্য নির্ধারিত এই জায়গাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে দখলমুক্ত রাখার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পাঁচ দিনের অভিযানে যেসব ফুটপাত ও সড়ক আংশিকভাবে খালি করা হয়েছিল, সেসব গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অনেকগুলোতেই আবার দখল শুরু হয়েছে। ১ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত আটটি ট্রাফিক বিভাগে পরিচালিত এই অভিযানে অবৈধ দোকান, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা এবং অনুমোদনহীন পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কাঠামো সরিয়ে দেওয়া হয়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বেশির ভাগ এলাকায় ফের হকারদের উপস্থিতি দেখা যায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় ৪০৫টি মামলা করা হয়, জরিমানা হিসেবে আদায় করা হয় ১১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, ৫৭ জনকে সতর্ক করা হয় এবং আরও ৯৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

স্বস্তি ছিল অল্প সময়ের
গুলিস্তান, ঢোলাইখাল, উত্তরা, শনির আখড়া এবং ধানমন্ডির কলাবাগানের মতো কিছু এলাকায় মানুষ অল্প সময়ের জন্য হাঁটার স্বস্তি পেয়েছিলেন।
কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার দুই দিনের মধ্যেই বেশির ভাগ এলাকার ফুটপাত আবারও দখল হয়ে যায়।
গুলিস্তানে আগের মতোই বিক্রেতারা ফুটপাত দখল করে বসেছেন, যদিও এখন কেউ কেউ তুলনামূলক বেশি সতর্কভাবে ব্যবসা করছেন।
গোলাপ শাহ মাজারের সামনে আগে যারা স্থায়ী স্টল বসাতেন, তাদের অনেকে এখন কাপড় বা পলিথিন বিছিয়ে পণ্য সাজিয়ে বসছেন, যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত সরে যেতে পারেন।
পল্টন, মতিঝিল এবং নিউমার্কেট এলাকাতেও একই দৃশ্য ফিরেছে। সেখানে অস্থায়ী দোকানপাট আবার ফুটপাতজুড়ে বসতে শুরু করেছে।
সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত সড়কে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার দুই পাশজুড়ে শত শত বিক্রেতা বসেছেন। এতে পথচারীরা বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কে নেমে হাঁটছেন, আর তাতে যানজটও আরও বেড়ে যাচ্ছে।

উচ্ছেদ আর ফিরে আসার চক্র
এই চিত্র এখন অনেকটাই চেনা। উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে ফুটপাত খালি করা হয়, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই হকাররা আবার ফিরে আসেন।
নিউমার্কেটের বাইরে মোহাম্মদপুর, শ্যামলী রিং রোড, মগবাজার, বাংলামোটর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, গুলিস্তানসহ রাজধানীর আরও অনেক এলাকায় একইভাবে হকারদের ফিরে আসতে দেখা গেছে।
রাস্তার মানুষের কথা
অনেক বিক্রেতার কাছে উচ্ছেদ মানে তাদের একমাত্র আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
নিউমার্কেট এলাকার এক বিক্রেতা সবুজ আলী বলেন, তাদের যদি সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তারা কোথায় যাবেন। তার ভাষায়, তারা কারও সমস্যা তৈরি করতে চান না। যদি উচ্ছেদ করতেই হয়, তাহলে সরকারের উচিত বিকল্প ব্যবস্থা করা।
অন্যদিকে পথচারীদের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন।
মৌচাক এলাকার শাহেদ আলী বলেন, ফুটপাতে হাঁটার কোনো জায়গা নেই। সবটাই দখল হয়ে গেছে। ফলে তাকে নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, ফুটপাত খালি করা হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে তিনি তেমন কোনো পরিবর্তন দেখছেন না।

অভিযান চলবে
ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, যেসব এলাকায় হকাররা আবার ফিরে এসেছেন, সেখানে অনুসরণমূলক অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, আগের দিন সায়েদাবাদ টার্মিনাল এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। যেসব এলাকা আগে খালি করা হয়েছিল, সেগুলো নজরদারিতে রাখা হবে এবং প্রয়োজন হলে আবারও উচ্ছেদ করা হবে।

সহজ সমাধান নেই
এর আগে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, হকারদের আর ফুটপাত দখল করতে দেওয়া হবে না। তাদের জন্য ছুটির দিন ও রাতের বাজারের মাধ্যমে পুনর্বাসনের পরিকল্পনাও ছিল।
কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় তার প্রভাবও দেখা যায়নি।
নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, যথাযথ ব্যবস্থা ছাড়া হঠাৎ করে হকার বা অটোরিকশা উচ্ছেদের পক্ষে তিনি নন।
তার মতে, হকারদের হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আগে তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শহরে আটটি রাতের বাজার গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। এসব বাজার অফিস সময়ের পর, বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে, যাতে দিনের বেলায় বিক্রেতারা ফুটপাত দখল না করেন।

পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই হবে না
নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইশরাত ইসলাম বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শহরে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি, যেখানে ফুটপাত দীর্ঘ সময় ধরে দখল হয়ে থাকে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
তার মতে, বারবার উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ হচ্ছে মূলত সঠিক পরিকল্পনার অভাবে।
তিনি বলেন, যাদের সরানো হবে তাদের জন্য আগে থেকেই পরিষ্কার পরিকল্পনা থাকতে হবে। তা না হলে এই ব্যবস্থা টেকসই হবে না।
তার আরও বক্তব্য, বিষয়টি গভীরভাবে গবেষণা করা দরকার, যাতে বোঝা যায় এর পেছনে কী কী শক্তি ও স্বার্থ জড়িত রয়েছে।
শুধু বিক্রেতাদের সরিয়ে দিলে হবে না, সমস্যার মূল কারণগুলোও সমাধান করতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভারতসহ অনেক দেশে নীতিমালার মাধ্যমে পথের ধারের ব্যবসা আইনগত কাঠামোর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো তেমন সুস্পষ্ট নীতিমালা গড়ে ওঠেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















