০৯:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
তুরাগের বস্তিতে আগুন, নিয়ন্ত্রণে আনতে পাঁচ ইউনিটের চেষ্টা লেবানন ঘিরে যুদ্ধবিরতির টানাপোড়েন ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় কমছে বিশ্ব অর্থনীতির গতি: আইএমএফের সতর্কবার্তা বগুড়ায় ‘মাগুরা স্টাইলে’ ভোটের অভিযোগ, ফল দেখেই শেষ সিদ্ধান্ত তেলের লাইনে চালকদের দিনভর দুর্ভোগ আসামে এক দফার ভোটে ব্যাপক সাড়া, সন্ধ্যা পর্যন্ত ভোট পড়ল ৮৫.১৩ শতাংশ ভোটের অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন জামায়াত প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল, আগের নিয়োগ বহাল থাকছে শরীর ভালো রাখার নামে সাপ্লিমেন্ট ঝোঁক, দ্রুত সমাধানের এই সংস্কৃতি কতটা নিরাপদ মিশরের পুরোনো জৌলুসে নতুন প্রাণ, ইতিহাসঘেরা হোটেল আর নীলনদের ভাসমান আবাসে ফিরছে ভ্রমণের মুগ্ধতা

প্রত্যাশা থাকবে, কিন্তু আমার সব মনোযোগ এখন কাজেই

নতুন মঞ্চ, পুরোনো বিশ্বাস

জম্মু ও কাশ্মীরের পেসার আউকিব নবি এবার প্রথমবারের মতো আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসের জার্সিতে খেলবেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত সাফল্যের পর তাঁকে দলে নিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। তবে আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও নবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বাইরের প্রত্যাশা বা মূল্যট্যাগ নয়, তাঁর মূল মনোযোগ নিজের প্রস্তুতি, নিজের প্রক্রিয়া এবং দলের জন্য অবদান রাখার দিকে।

রণজি জয় থেকে আইপিএল

গত দুই বছরে ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে আউকিব নবি নিজের নাম জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। নতুন লাল বলে সুইং এবং কবজির সূক্ষ্ম ভঙ্গি বদলে ব্যাটারকে ফাঁদে ফেলার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করেছে। ২০২৫-২৬ রণজি ট্রফি মৌসুমে জম্মু ও কাশ্মীর প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে, আর সেই ঐতিহাসিক যাত্রায় নবি ছিলেন দলের প্রধান শক্তিগুলোর একজন। ১০ ম্যাচে তাঁর ৬০ উইকেট ছিল সেই সাফল্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি।

এর আগের মৌসুমেও তিনি সমান কার্যকর ছিলেন। তখন জম্মু ও কাশ্মীর কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়, আর নবি নেন ৪৪ উইকেট। ধারাবাহিক এই সাফল্যই তাঁকে এখন দেশের সবচেয়ে বড় টি-টোয়েন্টি মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে।

Auqib Nabi: ৩০ লাখের প্লেয়ার ৮.৪০ কোটিতে, ঘরোয়া ক্রিকেটের পর নিলামের  মঞ্চেও চমক জম্মুর পেসারের

টি-টোয়েন্টিতেও সহজ রাখার লক্ষ্য

লাল বলের ক্রিকেটে ব্যাটারকে ধাপে ধাপে সেটআপ করার জন্য পরিচিত নবি মনে করেন, টি-টোয়েন্টিতেও তাঁর মূল দর্শন একই থাকবে। তিনি জটিলতা বাড়াতে চান না। তাঁর ভাষায়, যে ফরম্যাটই হোক, তিনি সহজ পরিকল্পনা নিয়ে খেলতে চান। অতিরিক্ত ভাবনা নয়, পরিষ্কার পরিকল্পনাই তাঁর ভরসা।

যদিও অনেকে মনে করেন তাঁর বোলিং ধরণ সাদা বলের ক্রিকেটের জন্য পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়, তবু সাম্প্রতিক সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিতে তিনি ৭ ম্যাচে ১৫ উইকেট নিয়েছেন, এবং রান দেওয়ার হারও ছিল নিয়ন্ত্রিত। ফলে টি-টোয়েন্টিতে তাঁর কার্যকারিতা নিয়েও আশাবাদী থাকার যথেষ্ট কারণ আছে।

প্রত্যাশা, চাপ এবং মূল্যট্যাগ

দিল্লি ক্যাপিটালস তাঁকে নিলামে ৮.৪ কোটি রুপিতে দলে নেয়। স্বাভাবিকভাবেই এই মূল্যট্যাগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক। কিন্তু নবি জানিয়েছেন, তাঁর কাছে টাকা বড় বিষয় ছিল না। তিনি বলছেন, কম টাকায় হলেও আইপিএলে একবার খেলার সুযোগ পেলে সেটাই তাঁর কাছে বড় ছিল। বড় অঙ্কে দল তাঁকে নিয়েছে, এতে ভালো লেগেছে ঠিকই, কিন্তু সেটাকে তিনি নিজের ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে নিতে চান না।

তিনি মনে করেন, চাপ থাকবেই, প্রত্যাশাও থাকবে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে না ভেবে নিজের শক্তির জায়গাগুলো কাজে লাগানোই বেশি জরুরি। তাঁর প্রধান শক্তি নতুন বলে দুই দিকেই সুইং করানো। তাই শুরুতেই উইকেট নেওয়ার কাজটাকেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।

There will be expectations, but I am focusing on my work - The Hindu

আইপিএল আর ঘরোয়া ক্রিকেটের পার্থক্য

নবির মতে, আইপিএলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো ভুলের সুযোগ খুব কম। ঘরোয়া ক্রিকেটও এখন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, কিন্তু আইপিএলে ছোট ভুলও বড় শাস্তি ডেকে আনতে পারে। এই সূক্ষ্ম ব্যবধানই দুই মঞ্চকে আলাদা করে।

তিনি বুঝতে পারছেন, এখানে প্রতিটি বল, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি ওভারের গুরুত্ব অন্য মাত্রার। তাই নিজের প্রক্রিয়ায় অটল থাকলেও পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

বারামুলা থেকে বড় মঞ্চে

কাশ্মীরের বারামুলা জেলা থেকে উঠে আসা নবির পথচলা সহজ ছিল না। তিনি জানিয়েছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল অবকাঠামোর ঘাটতি। ভালো টার্ফ উইকেট ছিল না, প্রস্তুতির সুযোগও সীমিত ছিল। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তিনি নিজের মতো করে কাজ চালিয়ে গেছেন এবং যা ছিল, তা দিয়েই সেরাটা বের করে আনার চেষ্টা করেছেন।

এখন তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরে ক্রিকেটের পরিবেশ উন্নত হচ্ছে, আর সাম্প্রতিক সাফল্য সেই পরিবর্তনকে আরও গতি দেবে।

It Would Be Shame @DelhiCapitals if You Don't Play Auqib Nabi In XI.He Is  Domestic McGrath I would say Without any exaggeration

নিজের লক্ষ্য কী

নবির ব্যক্তিগত লক্ষ্যও স্পষ্ট। যে টুর্নামেন্টেই তিনি খেলেন, চেষ্টা থাকে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হওয়ার। তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বড় লক্ষ্য হলো দলের জয়ে অবদান রাখা। দিল্লি ক্যাপিটালসকে শিরোপা জেতাতে পারলে সেটিই হবে তাঁর মৌসুমের সবচেয়ে বড় অর্জন।

তিনি আরও জানিয়েছেন, টি-টোয়েন্টির শেষ দিকের ওভারে ইয়র্কার ও ধীরগতির বলের ব্যবহার আরও উন্নত করতে কোচদের সঙ্গে কাজ করছেন। নিজের মূল শক্তি অক্ষুণ্ণ রেখেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার দিকেই তাঁর মনোযোগ।

ভারত দলে খেলার স্বপ্ন

ভারতের হয়ে খেলা যে তাঁর চূড়ান্ত স্বপ্ন, তা তিনি লুকাননি। তবে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে অস্থির হতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, নিজের নিয়ন্ত্রণে যা আছে, সেটিতে ভালো করতে পারলেই বড় সুযোগ আসবে। রেড বলের ক্রিকেটে তিনি ইতিমধ্যে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। এখন আইপিএলে ভালো করলে সেটি আরও বড় দরজা খুলে দিতে পারে।

তিনি এটাও মনে করেন, আইপিএল বিশ্বজুড়ে দেখা হয়, তাই এখানে ভালো পারফরম্যান্স অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আপাতত তাঁর পূর্ণ মনোযোগ কেবল বর্তমান মৌসুমে ভালো করা।

Auqib Nabi: ৩০ লাখের প্লেয়ার ৮.৪০ কোটিতে, ঘরোয়া ক্রিকেটের পর নিলামের  মঞ্চেও চমক জম্মুর পেসারের

নিলামের দিন এবং আবেগের মুহূর্ত

নিলামের দিন তিনি বাড়িতেই ছিলেন। পরদিন বিজয় হাজারে ট্রফির ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা ছিল। যখন তাঁর নামের পাশে বড় অঙ্ক উঠল, পরিবারের সদস্যরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বহু বছরের পরিশ্রমের পর এমন এক মুহূর্ত আসায় তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে নবি নিজেও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।

তিনি বলেন, এলাকায় কাউকে বিশেষ কিছু জানাননি, তবু খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর বাড়ির বাইরে মানুষের ভিড় জমে যায়। আনন্দে নাচ, উচ্ছ্বাস, উদযাপন—সব মিলিয়ে সেটি ছিল তাঁর জীবনের স্মরণীয় এক দিন।

ব্যাট হাতেও অবদান রাখতে চান

শুধু বল হাতেই নয়, ব্যাটিং নিয়েও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। অনুশীলনে নিয়মিত ব্যাট করছেন, কোচদের সঙ্গে কথা বলছেন, কোথায় আরও উন্নতি করা যায় তা বোঝার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, ব্যাট হাতে বাড়তি অবদান রাখতে পারলে তা নিজের জন্য যেমন ভালো, দলের জন্যও তেমনি মূল্যবান হবে।

রণজি শিরোপার প্রভাব

জম্মু ও কাশ্মীরের রণজি জয় নিয়ে নবি অত্যন্ত আশাবাদী। তাঁর বিশ্বাস, এই সাফল্য পুরো অঞ্চলের ক্রিকেটে বড় পরিবর্তন আনবে। আগে অন্য দলগুলো ভাবত, জম্মু ও কাশ্মীরকে সহজেই হারানো যাবে। এখন সেই ধারণা পাল্টে গেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এখন ছোটদের সামনে অনুসরণ করার মতো উদাহরণ তৈরি হয়েছে। আগে ট্রফি না থাকায় অভিভাবকরাও হয়তো ক্রিকেটকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন না। কিন্তু এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, এই খেলায় ভবিষ্যৎ আছে। তাই অঞ্চলটিতে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ, সমর্থন এবং বিনিয়োগ—সবই বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

গত দুই বছরে বদলে যাওয়া মানসিকতা

রণজিতে অভিষেক হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু বড় প্রভাব ফেলতে তাঁর সময় লেগেছে। নবি জানিয়েছেন, গত দুই বছরে তাঁর উন্নতির পেছনে কোচদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগে দলে নিয়মিত বোলিং কোচ না থাকায় নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করা কঠিন ছিল। পরে কোচেরা ছোট ছোট বিষয় ধরিয়ে দেওয়ায় বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানসিকতায়। আগে তিনি ফল নিয়ে বেশি ভাবতেন। এখন তিনি ফল নয়, প্রক্রিয়ার দিকে মন দেন। ইতিবাচক থাকা এবং নিজের কাজ ঠিকভাবে করে যাওয়াকেই তিনি নিজের সাফল্যের আসল রহস্য বলে মনে করেন।

Auqib Nabi's 9-For Neutralises Mohammed Shami's 8/90 As Jammu and Kashmir  Have 1 Foot In Ranji Trophy Final | Cricket News

মৃত্যুওভারের চ্যালেঞ্জ এবং প্রেরণা

টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি দেখছেন শেষ দিকের ওভারে বোলিংকে। এখানেই আরও উন্নতি দরকার বলে তাঁর উপলব্ধি। সেই কাজ নিয়েই তিনি এখন বেশি মন দিচ্ছেন।

প্রেরণার কথা বলতে গিয়ে তিনি ডেল স্টেইনের নাম উল্লেখ করেছেন। ছোটবেলায় স্টেইনের বোলিং দেখতেন, তাঁর অ্যাকশন নকলও করতেন। পরে পেশাদার ক্রিকেটে এসে তিনি সব বোলারের ভিডিও দেখার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কে কীভাবে বোলিং করেন, সেখান থেকে শেখার চেষ্টা করেন।

দিল্লির শিবিরে নতুন শেখা

দিল্লি ক্যাপিটালসের বোলিং কোচ মুনাফ প্যাটেলের সঙ্গে কাজ করতে পেরে নবি খুশি। তাঁর মতে, মুনাফ খুব শান্ত স্বভাবের এবং এখন পর্যন্ত তাঁকে বড় কোনো কারিগরি পরিবর্তনের পরামর্শ দেননি। বরং যা করে তিনি সফল হয়েছেন, সেটাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে চালিয়ে যেতে বলেছেন। ইতিবাচক থাকার কথাই বেশি বলেছেন তিনি।

নিলামের আগে দিল্লির ট্রায়ালে অংশ নিয়ে নবি কিছুটা আন্দাজ করেছিলেন, সুযোগ আসতে পারে। কোচদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছিলেন। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিটা ভালো গেলে আইপিএলের দরজা খুলে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হয়েছে।

শেষ কথা

আউকিব নবির কথায় বারবার ফিরে আসে একই সুর—কাজ, প্রক্রিয়া, সরলতা এবং আত্মবিশ্বাস। বড় মঞ্চে প্রথমবারের মতো নামলেও তিনি নিজের শক্তি ভুলতে চান না। প্রত্যাশা থাকবে, চাপও থাকবে, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, বাইরের শব্দ থামানোর একটাই উপায়—মাঠে নিজের কাজ ঠিকভাবে করে যাওয়া।

জনপ্রিয় সংবাদ

তুরাগের বস্তিতে আগুন, নিয়ন্ত্রণে আনতে পাঁচ ইউনিটের চেষ্টা

প্রত্যাশা থাকবে, কিন্তু আমার সব মনোযোগ এখন কাজেই

০৭:৩৮:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

নতুন মঞ্চ, পুরোনো বিশ্বাস

জম্মু ও কাশ্মীরের পেসার আউকিব নবি এবার প্রথমবারের মতো আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসের জার্সিতে খেলবেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত সাফল্যের পর তাঁকে দলে নিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। তবে আলোচনার কেন্দ্রে থাকলেও নবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বাইরের প্রত্যাশা বা মূল্যট্যাগ নয়, তাঁর মূল মনোযোগ নিজের প্রস্তুতি, নিজের প্রক্রিয়া এবং দলের জন্য অবদান রাখার দিকে।

রণজি জয় থেকে আইপিএল

গত দুই বছরে ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে আউকিব নবি নিজের নাম জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। নতুন লাল বলে সুইং এবং কবজির সূক্ষ্ম ভঙ্গি বদলে ব্যাটারকে ফাঁদে ফেলার ক্ষমতা তাঁকে আলাদা করেছে। ২০২৫-২৬ রণজি ট্রফি মৌসুমে জম্মু ও কাশ্মীর প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে, আর সেই ঐতিহাসিক যাত্রায় নবি ছিলেন দলের প্রধান শক্তিগুলোর একজন। ১০ ম্যাচে তাঁর ৬০ উইকেট ছিল সেই সাফল্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি।

এর আগের মৌসুমেও তিনি সমান কার্যকর ছিলেন। তখন জম্মু ও কাশ্মীর কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায়, আর নবি নেন ৪৪ উইকেট। ধারাবাহিক এই সাফল্যই তাঁকে এখন দেশের সবচেয়ে বড় টি-টোয়েন্টি মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে।

Auqib Nabi: ৩০ লাখের প্লেয়ার ৮.৪০ কোটিতে, ঘরোয়া ক্রিকেটের পর নিলামের  মঞ্চেও চমক জম্মুর পেসারের

টি-টোয়েন্টিতেও সহজ রাখার লক্ষ্য

লাল বলের ক্রিকেটে ব্যাটারকে ধাপে ধাপে সেটআপ করার জন্য পরিচিত নবি মনে করেন, টি-টোয়েন্টিতেও তাঁর মূল দর্শন একই থাকবে। তিনি জটিলতা বাড়াতে চান না। তাঁর ভাষায়, যে ফরম্যাটই হোক, তিনি সহজ পরিকল্পনা নিয়ে খেলতে চান। অতিরিক্ত ভাবনা নয়, পরিষ্কার পরিকল্পনাই তাঁর ভরসা।

যদিও অনেকে মনে করেন তাঁর বোলিং ধরণ সাদা বলের ক্রিকেটের জন্য পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়, তবু সাম্প্রতিক সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিতে তিনি ৭ ম্যাচে ১৫ উইকেট নিয়েছেন, এবং রান দেওয়ার হারও ছিল নিয়ন্ত্রিত। ফলে টি-টোয়েন্টিতে তাঁর কার্যকারিতা নিয়েও আশাবাদী থাকার যথেষ্ট কারণ আছে।

প্রত্যাশা, চাপ এবং মূল্যট্যাগ

দিল্লি ক্যাপিটালস তাঁকে নিলামে ৮.৪ কোটি রুপিতে দলে নেয়। স্বাভাবিকভাবেই এই মূল্যট্যাগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক। কিন্তু নবি জানিয়েছেন, তাঁর কাছে টাকা বড় বিষয় ছিল না। তিনি বলছেন, কম টাকায় হলেও আইপিএলে একবার খেলার সুযোগ পেলে সেটাই তাঁর কাছে বড় ছিল। বড় অঙ্কে দল তাঁকে নিয়েছে, এতে ভালো লেগেছে ঠিকই, কিন্তু সেটাকে তিনি নিজের ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে নিতে চান না।

তিনি মনে করেন, চাপ থাকবেই, প্রত্যাশাও থাকবে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে না ভেবে নিজের শক্তির জায়গাগুলো কাজে লাগানোই বেশি জরুরি। তাঁর প্রধান শক্তি নতুন বলে দুই দিকেই সুইং করানো। তাই শুরুতেই উইকেট নেওয়ার কাজটাকেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।

There will be expectations, but I am focusing on my work - The Hindu

আইপিএল আর ঘরোয়া ক্রিকেটের পার্থক্য

নবির মতে, আইপিএলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো ভুলের সুযোগ খুব কম। ঘরোয়া ক্রিকেটও এখন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, কিন্তু আইপিএলে ছোট ভুলও বড় শাস্তি ডেকে আনতে পারে। এই সূক্ষ্ম ব্যবধানই দুই মঞ্চকে আলাদা করে।

তিনি বুঝতে পারছেন, এখানে প্রতিটি বল, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি ওভারের গুরুত্ব অন্য মাত্রার। তাই নিজের প্রক্রিয়ায় অটল থাকলেও পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

বারামুলা থেকে বড় মঞ্চে

কাশ্মীরের বারামুলা জেলা থেকে উঠে আসা নবির পথচলা সহজ ছিল না। তিনি জানিয়েছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল অবকাঠামোর ঘাটতি। ভালো টার্ফ উইকেট ছিল না, প্রস্তুতির সুযোগও সীমিত ছিল। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তিনি নিজের মতো করে কাজ চালিয়ে গেছেন এবং যা ছিল, তা দিয়েই সেরাটা বের করে আনার চেষ্টা করেছেন।

এখন তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরে ক্রিকেটের পরিবেশ উন্নত হচ্ছে, আর সাম্প্রতিক সাফল্য সেই পরিবর্তনকে আরও গতি দেবে।

It Would Be Shame @DelhiCapitals if You Don't Play Auqib Nabi In XI.He Is  Domestic McGrath I would say Without any exaggeration

নিজের লক্ষ্য কী

নবির ব্যক্তিগত লক্ষ্যও স্পষ্ট। যে টুর্নামেন্টেই তিনি খেলেন, চেষ্টা থাকে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হওয়ার। তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বড় লক্ষ্য হলো দলের জয়ে অবদান রাখা। দিল্লি ক্যাপিটালসকে শিরোপা জেতাতে পারলে সেটিই হবে তাঁর মৌসুমের সবচেয়ে বড় অর্জন।

তিনি আরও জানিয়েছেন, টি-টোয়েন্টির শেষ দিকের ওভারে ইয়র্কার ও ধীরগতির বলের ব্যবহার আরও উন্নত করতে কোচদের সঙ্গে কাজ করছেন। নিজের মূল শক্তি অক্ষুণ্ণ রেখেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার দিকেই তাঁর মনোযোগ।

ভারত দলে খেলার স্বপ্ন

ভারতের হয়ে খেলা যে তাঁর চূড়ান্ত স্বপ্ন, তা তিনি লুকাননি। তবে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে অস্থির হতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, নিজের নিয়ন্ত্রণে যা আছে, সেটিতে ভালো করতে পারলেই বড় সুযোগ আসবে। রেড বলের ক্রিকেটে তিনি ইতিমধ্যে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। এখন আইপিএলে ভালো করলে সেটি আরও বড় দরজা খুলে দিতে পারে।

তিনি এটাও মনে করেন, আইপিএল বিশ্বজুড়ে দেখা হয়, তাই এখানে ভালো পারফরম্যান্স অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আপাতত তাঁর পূর্ণ মনোযোগ কেবল বর্তমান মৌসুমে ভালো করা।

Auqib Nabi: ৩০ লাখের প্লেয়ার ৮.৪০ কোটিতে, ঘরোয়া ক্রিকেটের পর নিলামের  মঞ্চেও চমক জম্মুর পেসারের

নিলামের দিন এবং আবেগের মুহূর্ত

নিলামের দিন তিনি বাড়িতেই ছিলেন। পরদিন বিজয় হাজারে ট্রফির ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা ছিল। যখন তাঁর নামের পাশে বড় অঙ্ক উঠল, পরিবারের সদস্যরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বহু বছরের পরিশ্রমের পর এমন এক মুহূর্ত আসায় তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেখে নবি নিজেও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।

তিনি বলেন, এলাকায় কাউকে বিশেষ কিছু জানাননি, তবু খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর বাড়ির বাইরে মানুষের ভিড় জমে যায়। আনন্দে নাচ, উচ্ছ্বাস, উদযাপন—সব মিলিয়ে সেটি ছিল তাঁর জীবনের স্মরণীয় এক দিন।

ব্যাট হাতেও অবদান রাখতে চান

শুধু বল হাতেই নয়, ব্যাটিং নিয়েও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। অনুশীলনে নিয়মিত ব্যাট করছেন, কোচদের সঙ্গে কথা বলছেন, কোথায় আরও উন্নতি করা যায় তা বোঝার চেষ্টা করছেন। তাঁর মতে, ব্যাট হাতে বাড়তি অবদান রাখতে পারলে তা নিজের জন্য যেমন ভালো, দলের জন্যও তেমনি মূল্যবান হবে।

রণজি শিরোপার প্রভাব

জম্মু ও কাশ্মীরের রণজি জয় নিয়ে নবি অত্যন্ত আশাবাদী। তাঁর বিশ্বাস, এই সাফল্য পুরো অঞ্চলের ক্রিকেটে বড় পরিবর্তন আনবে। আগে অন্য দলগুলো ভাবত, জম্মু ও কাশ্মীরকে সহজেই হারানো যাবে। এখন সেই ধারণা পাল্টে গেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এখন ছোটদের সামনে অনুসরণ করার মতো উদাহরণ তৈরি হয়েছে। আগে ট্রফি না থাকায় অভিভাবকরাও হয়তো ক্রিকেটকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন না। কিন্তু এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, এই খেলায় ভবিষ্যৎ আছে। তাই অঞ্চলটিতে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ, সমর্থন এবং বিনিয়োগ—সবই বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

গত দুই বছরে বদলে যাওয়া মানসিকতা

রণজিতে অভিষেক হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু বড় প্রভাব ফেলতে তাঁর সময় লেগেছে। নবি জানিয়েছেন, গত দুই বছরে তাঁর উন্নতির পেছনে কোচদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগে দলে নিয়মিত বোলিং কোচ না থাকায় নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করা কঠিন ছিল। পরে কোচেরা ছোট ছোট বিষয় ধরিয়ে দেওয়ায় বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানসিকতায়। আগে তিনি ফল নিয়ে বেশি ভাবতেন। এখন তিনি ফল নয়, প্রক্রিয়ার দিকে মন দেন। ইতিবাচক থাকা এবং নিজের কাজ ঠিকভাবে করে যাওয়াকেই তিনি নিজের সাফল্যের আসল রহস্য বলে মনে করেন।

Auqib Nabi's 9-For Neutralises Mohammed Shami's 8/90 As Jammu and Kashmir  Have 1 Foot In Ranji Trophy Final | Cricket News

মৃত্যুওভারের চ্যালেঞ্জ এবং প্রেরণা

টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি দেখছেন শেষ দিকের ওভারে বোলিংকে। এখানেই আরও উন্নতি দরকার বলে তাঁর উপলব্ধি। সেই কাজ নিয়েই তিনি এখন বেশি মন দিচ্ছেন।

প্রেরণার কথা বলতে গিয়ে তিনি ডেল স্টেইনের নাম উল্লেখ করেছেন। ছোটবেলায় স্টেইনের বোলিং দেখতেন, তাঁর অ্যাকশন নকলও করতেন। পরে পেশাদার ক্রিকেটে এসে তিনি সব বোলারের ভিডিও দেখার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কে কীভাবে বোলিং করেন, সেখান থেকে শেখার চেষ্টা করেন।

দিল্লির শিবিরে নতুন শেখা

দিল্লি ক্যাপিটালসের বোলিং কোচ মুনাফ প্যাটেলের সঙ্গে কাজ করতে পেরে নবি খুশি। তাঁর মতে, মুনাফ খুব শান্ত স্বভাবের এবং এখন পর্যন্ত তাঁকে বড় কোনো কারিগরি পরিবর্তনের পরামর্শ দেননি। বরং যা করে তিনি সফল হয়েছেন, সেটাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে চালিয়ে যেতে বলেছেন। ইতিবাচক থাকার কথাই বেশি বলেছেন তিনি।

নিলামের আগে দিল্লির ট্রায়ালে অংশ নিয়ে নবি কিছুটা আন্দাজ করেছিলেন, সুযোগ আসতে পারে। কোচদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছিলেন। তখন তাঁর মনে হয়েছিল, সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিটা ভালো গেলে আইপিএলের দরজা খুলে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হয়েছে।

শেষ কথা

আউকিব নবির কথায় বারবার ফিরে আসে একই সুর—কাজ, প্রক্রিয়া, সরলতা এবং আত্মবিশ্বাস। বড় মঞ্চে প্রথমবারের মতো নামলেও তিনি নিজের শক্তি ভুলতে চান না। প্রত্যাশা থাকবে, চাপও থাকবে, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, বাইরের শব্দ থামানোর একটাই উপায়—মাঠে নিজের কাজ ঠিকভাবে করে যাওয়া।