নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সরিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এমন মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ।
নাজুক যুদ্ধবিরতির পরও স্বাভাবিক হয়নি চলাচল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে রাতারাতি ঘোষিত নাজুক যুদ্ধবিরতির পরও বুধবার হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফেরেনি। জাহাজমালিকেরা এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত করা সম্ভব কি না। ফলে প্রণালিটি কার্যত অচলই রয়ে গেছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার অঞ্চলটি থেকে মাত্র তিনটি জাহাজ বের হতে দেখা গেছে। এর কয়েকটির সঙ্গে ইরানের সংযোগ ছিল। পরে ইরানের গণমাধ্যমে জানানো হয়, লেবাননে হামলার পর ট্যাঙ্কার চলাচল বন্ধই থাকবে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩৫টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করে। এখন উপসাগরের ভেতরে ৮০০-র বেশি মালবাহী জাহাজ আটকা পড়ে আছে, যাদের বেশির ভাগই বের হওয়ার অপেক্ষায়।

যুদ্ধবিরতি এলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি
যুদ্ধবিরতিকে জাহাজমালিক ও বিমা খাতের অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও, তাদের বক্তব্য একটাই—নিরাপদ চলাচল কবে ও কীভাবে সম্ভব হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্টতা দরকার। ইরান বলেছে, যুদ্ধবিরতির একটি শর্ত হলো তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে এই নৌপথে চলাচল করতে হবে। কিছু পরিবহন জাহাজের কাছ থেকে একেকবার পারাপারে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোলও নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামুদ্রিক ও বিমানবিষয়ক লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নীল রবার্টসের ভাষায়, এখনই বলা যাচ্ছে না এটি সাময়িক বিরতি, না সত্যিকারের শান্তির পথে যাত্রা। তবে আপাতত উপসাগরমুখী বাণিজ্য দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে—এমনটা মনে করার সুযোগ নেই।
একটি জাহাজের নাবিকদলও জানিয়েছে, তারা ইরানের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা শুনেছে—এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনুমতি প্রয়োজন। ফলে যুদ্ধবিরতির খবর এলেও বাস্তবে কীভাবে পারাপার চলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে।
বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় চাপ
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই পথ দিয়ে যায়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এই নৌপথে কড়াকড়ি বাড়ালে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়। তখন থেকেই এই পথ প্রায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দামের পরবর্তী গতি। কারণ, এই একটিমাত্র জলপথের অচলাবস্থা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যকেও নাড়িয়ে দিয়েছে।

বড় বড় জাহাজ কোম্পানির সতর্ক অবস্থান
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কনটেইনার পরিবহন কোম্পানি জানিয়েছে, চলাচলের সাময়িক সুযোগ তৈরি হলেও এখনো পূর্ণ সামুদ্রিক নিশ্চয়তা আসেনি। জাপানের একটি বড় শিপিং প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। জার্মানির আরেকটি বড় কোম্পানি আপাতত হরমুজ এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্তই বহাল রেখেছে, যদিও তারা যুদ্ধবিরতিকে ইতিবাচক বলেছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন সক্ষমতার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণকারী বাণিজ্য সংগঠনটিও সতর্ক সুরে বলেছে, নিরাপদ নৌ চলাচলের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না আসা পর্যন্ত ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
তাদের নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আগাম সমন্বয় ছাড়া পারস্য উপসাগর ত্যাগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং তা মোটেই পরামর্শযোগ্য নয়।
নাবিকদের নিরাপত্তাই এখন প্রধান উদ্বেগ
সংঘাতের পুরো সময়জুড়ে জাহাজমালিকেরা একটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন—নাবিকদের নিরাপত্তা। এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপের একাধিক জাহাজমালিক জানিয়েছেন, তারা বিমা প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা পরামর্শকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং জাহাজগুলোকে অপেক্ষমাণ অবস্থায় রেখেছেন।
ইরান দাবি করেছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার মধ্যে তারা দুই সপ্তাহের জন্য নিরাপদ পারাপারে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে সম্পূর্ণ, তাৎক্ষণিক ও নিরাপদভাবে পথ খুলে দেওয়ার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি জাহাজের জট কমাতে সহায়তার কথাও জানান। তবে এমন ভূমিকাকে তেহরান ইতিবাচকভাবে নেবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

আটকে থাকা জাহাজের ধরন ও সংখ্যা
গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, উপসাগরের ভেতরে আটকে থাকা জাহাজগুলোর বড় অংশই জ্বালানি বহনকারী। এর মধ্যে রয়েছে ৪২৬টি অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি বহনকারী ট্যাঙ্কার, ৩৪টি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসবাহী জাহাজ এবং ১৯টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজ। বাকি জাহাজগুলোতে রয়েছে কৃষিপণ্য, ধাতুসহ অন্যান্য শুষ্ক পণ্য।
বুধবার সকাল পর্যন্ত দুপাশে, বিশেষ করে দুবাই ও খোর ফাক্কানের আশপাশে, এক হাজারের বেশি জাহাজ জট বেঁধে অপেক্ষা করছিল। এর মধ্যে অন্তত দুটি শুষ্ক পণ্যবাহী জাহাজকে প্রণালি পার হতে দেখা গেছে। একটি জাহাজ ইরানের লারাক ও কেশম দ্বীপের মাঝামাঝি পথ ব্যবহার করেছে। ইরানের পতাকাবাহী একটি নিষেধাজ্ঞাগ্রস্ত তেলবাহী জাহাজও সম্ভবত পার হয়েছে বলে তথ্য মিলেছে।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজগুলোর গতিবিধির দিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। কারণ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ ধরনের বোঝাই কোনো জাহাজই সফলভাবে প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় দুটি ট্যাঙ্কার শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিল।
হাজারো নাবিক এখনো জাহাজে আটকা
মার্চের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আটকে থাকা জাহাজ এবং সহায়ক নৌযানে প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক নাবিক এখনো অবস্থান করছেন। তাদের নিরাপত্তা ও সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বড় একটি অংশ হয়ে উঠেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা চুক্তিটিকে স্বাগত জানালেও এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এমন সরিয়ে নেওয়া, যাতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















