মৃত নক্ষত্রের ঘন ও দ্রুত ঘূর্ণায়মান অবশিষ্ট কেন্দ্র, যেগুলোকে পালসার বলা হয়, সেগুলোর রেডিও সংকেত বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বে দূরত্ব মাপার একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, মহাকাশের মধ্যে দিয়ে আসতে আসতে পালসারের সংকেত যেভাবে বিকৃত হয়, সেই পরিবর্তনগুলোকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে আগের তুলনায় আরও নির্ভুলভাবে দূরত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব।
নতুন গবেষণার দিশা
গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা, তাঁদের মধ্যে আইআইটি কানপুরের গবেষকরাও আছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন, আকাশগঙ্গার মধ্যে থাকা আয়নিত গ্যাসের মেঘের ভেতর দিয়ে পালসারের রেডিও তরঙ্গ অতিক্রম করার সময় দুটি সূক্ষ্ম প্রভাব তৈরি হয়। এই দুই প্রভাবকে একসঙ্গে ব্যবহার করেই নতুন পদ্ধতিটি গড়ে তোলা হয়েছে।
গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি স্বীকৃত সাময়িকীতে। সেখানে বলা হয়েছে, শুধু একটি সূচক নয়, একাধিক সংকেত-পরিবর্তন একত্রে বিচার করলে পালসারের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

পালসার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
পালসার হলো মৃত নক্ষত্রের অত্যন্ত ঘন অবশিষ্ট অংশ, যা খুব দ্রুত ঘোরে। এদের থেকে নির্গত রেডিও তরঙ্গ অনেকটা বাতিঘরের আলোর মতো নির্দিষ্ট বিরতিতে পৃথিবীর দিকে আসে। যেহেতু এদের ঘূর্ণনের গতি অত্যন্ত স্থির, তাই পালসারের সংকেত নিয়ম মেনে পৌঁছায়। এই কারণেই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই পালসারকে মহাজাগতিক ঘড়ি হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।
বিশেষ করে মিলিসেকেন্ড পালসার প্রতি সেকেন্ডে শত শত বার ঘোরে। ফলে এগুলোর সংকেতের আগমন সময় অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপা যায়। সেই নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে বাস্তব পর্যবেক্ষণের অমিল দেখা দিলে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, পথে অন্য কোনো মহাজাগতিক প্রভাব কাজ করেছে কি না।
সংকেতের পথে বাধা
পালসারের রেডিও তরঙ্গ পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগে আকাশগঙ্গার ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। এই পথে তারা আয়নিত গ্যাস বা প্লাজমার মেঘের মধ্যে দিয়ে যায়। এই প্লাজমায় থাকা মুক্ত ইলেকট্রন সংকেতের ওপর সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো বিচ্ছুরণ মাত্রা। নিম্ন কম্পাঙ্কের রেডিও তরঙ্গ উচ্চ কম্পাঙ্কের তুলনায় বেশি ধীর হয়ে যায়। ফলে একই সংকেতের বিভিন্ন অংশ পৃথিবীতে সামান্য ভিন্ন সময়ে এসে পৌঁছায়। এই সময়ের পার্থক্য মেপে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, পৃথিবী ও পালসারের মাঝখানে কত ইলেকট্রন রয়েছে।
সাধারণভাবে দূরের পালসারের সংকেত বেশি প্লাজমার ভেতর দিয়ে আসে। তাই বিচ্ছুরণ মাত্রা দূরত্ব সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দেয়। কিন্তু এই পদ্ধতির বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি আকাশগঙ্গাজুড়ে ইলেকট্রনের বণ্টনের মডেলের ওপর নির্ভর করে। জটিল অঞ্চলে এই মডেল অনেক সময় নির্ভরযোগ্য থাকে না।

গাম নীহারিকার জটিলতা
এই গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে গাম নীহারিকা, যা আকাশগঙ্গার অন্যতম বৃহৎ আয়নিত গ্যাসমেঘ। এটি সম্ভবত কোনো অতিনোভার বিস্ফোরণ বা উষ্ণ নক্ষত্রের বিকিরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই অঞ্চলে ভেলা পালসারও রয়েছে। ফলে এই নীহারিকার ভেতর দিয়ে যাওয়া রেডিও সংকেত সহজে বদলে যায়, এবং দূরত্ব নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
এই কারণেই শুধু পুরোনো পদ্ধতিতে পাওয়া হিসাব সব সময় যথেষ্ট নির্ভুল হয় না। গবেষকেরা মনে করেন, জটিল এমন অঞ্চলে নতুন সমন্বিত পদ্ধতি অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
সংকেতের কাঁপুনি ও ছড়িয়ে পড়া
আয়নিত গ্যাস একেবারে মসৃণ নয়। এর ভেতরের অস্থিরতা রেডিও তরঙ্গকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেয়। ফলে সংকেত একাধিক পথ ধরে পৃথিবীতে পৌঁছায়। এই ভিন্ন পথের তরঙ্গগুলো একে অপরের সঙ্গে হস্তক্ষেপ করে, যার কারণে পালসারের উজ্জ্বলতা সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করতে দেখা যায়। এই ঘটনাকে বলা হয় ঝিকিমিকি প্রভাব।
একই সঙ্গে, ভিন্ন পথে আসা সংকেত সামান্য ভিন্ন সময়ে পৌঁছায় বলে মূল সংকেতটি প্রসারিত বা ঝাপসা হয়ে যায়। এটিই ছড়িয়ে-প্রশস্ত হওয়ার প্রভাব। গবেষণায় এই প্রভাবকে বিচ্ছুরণ মাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
দুই প্রভাব একসঙ্গে ব্যবহারের সুফল
নতুন পদ্ধতির মূল শক্তি এখানেই। বিজ্ঞানীরা শুধু বিচ্ছুরণ নয়, সংকেতের ছড়িয়ে-প্রশস্ত হওয়ার মাত্রাও বিশ্লেষণ করেছেন। কারণ এই দ্বিতীয় প্রভাব নির্ভর করে প্লাজমার অস্থিরতা, ইলেকট্রনের ঘনত্ব এবং পৃথিবী ও পালসারের মাঝপথে ওই অস্থির অঞ্চলের অবস্থানের ওপর।
ফলে দুই ধরনের তথ্য একত্রে ব্যবহার করে গবেষকেরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন, পথে কোথায় কতটা অস্থির প্লাজমা রয়েছে। এতে পালসারের দূরত্ব নির্ধারণও হয়েছে আরও পরিশীলিতভাবে।
গবেষণার প্রধান লেখকের ভাষ্যে, আগে সমস্যার সমাধানে হাতে ছিল শুধু একটি উপায়, এখন দুটি উপায় একসঙ্গে কাজে লাগানো যাচ্ছে। এই বাড়তি তথ্যই হিসাবকে শক্তিশালী করেছে।

কীভাবে যাচাই করা হলো
গবেষণায় একই আকাশ অঞ্চলে থাকা ১০টি পালসার পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গাম নীহারিকার ইলেকট্রন বণ্টনের একটি উন্নত মডেল তৈরি করা হয়েছে। ধাপে ধাপে এমনভাবে মডেল সামঞ্জস্য করা হয়, যাতে পর্যবেক্ষণে পাওয়া বিচ্ছুরণ মাত্রা ও সংকেত-প্রসারণ—দুইয়ের সঙ্গেই তা মিলে যায়।
যে দূরত্বে গিয়ে মডেল ও বাস্তব তথ্যের মিল পাওয়া গেছে, সেটিকেই সংশ্লিষ্ট পালসারের সম্ভাব্য দূরত্ব হিসেবে ধরা হয়েছে। এই বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলেছে, ওই দিকের পালসারগুলোর সংকেত-বিকৃতির বড় অংশই সম্ভবত গাম নীহারিকার অস্থির স্তর থেকে তৈরি হচ্ছে।
ফলাফলে আরও দেখা গেছে, ভেলা পালসার নীহারিকার সামনের আবরণীরও পেছনে অবস্থান করছে।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
সংকেত কতটা ছড়িয়ে পড়বে, তা নির্ভর করে দৃষ্টিপথ বরাবর ছড়িয়ে পড়ার মাত্রার ওপর। এটি সরাসরি হিসাব করা কঠিন। তাই গবেষকেরা একটি একক সূচক ব্যবহার করেছেন, যেটিকে তারা একটি সহগ হিসেবে ধরেছেন। এই সহগ নির্ধারণ করাই ছিল গবেষণার সবচেয়ে কঠিন অংশগুলোর একটি, কারণ জটিল অঞ্চলে এর মান অনেক বদলে যেতে পারে।
তবে কাছাকাছি অবস্থানকারী এবং আগে থেকেই পরিচিত দূরত্বের অন্য পালসারের তথ্য ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু পালসারের জন্য এই মান অনুমান করা সম্ভব হয়েছে। গাম নীহারিকার ক্ষেত্রে গবেষকেরা একক মান নেওয়ার বদলে সম্ভাব্য একটি পরিসর ব্যবহার করেছেন, যাতে অনিশ্চয়তাও বিবেচনায় থাকে।

এরপর কী
গবেষক দল এখন আকাশগঙ্গাজুড়ে প্রায় ৩০০টি পালসার নিয়ে আরও বড় পরিসরের অনুসন্ধান চালাচ্ছে। লক্ষ্য হলো, কোন দিকের মহাশূন্যে এই সহগ কীভাবে বদলায়, তার একটি বৃহত্তর মানচিত্র তৈরি করা।
এর ফলে ভবিষ্যতে শুধু পালসারের দূরত্ব নয়, আকাশগঙ্গার ভেতরের আয়নিত গ্যাসের গঠন নিয়েও আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
পুরোনো পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা
দূরত্ব মাপার ক্ষেত্রে প্যারাল্যাক্সভিত্তিক পদ্ধতিকে এখনো সবচেয়ে নির্ভুল বলে ধরা হয়। গবেষকরাও স্বীকার করেছেন, নির্ভুলতার বিচারে নতুন পদ্ধতি সেই মানদণ্ডকে ছাড়িয়ে যায় না। তবে এর বড় সুবিধা অন্য জায়গায়।
কিছু প্যারাল্যাক্স পদ্ধতির ক্ষেত্রে দূরত্বের একটি কার্যকর সীমা রয়েছে। কিন্তু নতুন পদ্ধতির তেমন নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা নেই। তাই ভবিষ্যতে এটি আকাশগঙ্গার বাইরের উৎস, এমনকি রহস্যময় দ্রুত রেডিও বিস্ফোরণের মতো ঘটনাগুলোর দূরত্ব মাপতেও কাজে লাগতে পারে।
কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ
এই গবেষণা শুধু নতুন একটি পরিমাপপদ্ধতি হাজির করেনি, বরং দেখিয়েছে যে মহাশূন্যের জটিল অঞ্চলগুলো বুঝতে হলে সংকেতের নানা ধরনের বিকৃতি একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা দরকার। ফলে এটি দূরত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সহজভাবে বললে, মৃত নক্ষত্রের নিয়মিত স্পন্দন এখন শুধু সময় মাপার যন্ত্র নয়, মহাবিশ্বের গভীরতায় পৌঁছানোর নতুন মানচিত্রও হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















