গুয়াহাটি, ৯ এপ্রিল: আসাম বিধানসভা নির্বাচনে বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে রাজ্যের ১২৬টি আসনেই ভোটগ্রহণ শুরু হয়। দিনভর ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাবে ভোট পড়েছে ৮৫.১৩ শতাংশ। ফল ঘোষণা ও গণনা হবে আগামী ৪ মে।
এবারের নির্বাচন এক দফায়
২০২১ সালের নির্বাচনে আসামে তিন দফায় ভোট হয়েছিল। কিন্তু এবার পুরো নির্বাচন হচ্ছে এক দফায়। রাজ্যের আড়াই কোটির বেশি ভোটার এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক লড়াইগুলোর একটি হিসেবেই এবারের ভোটকে দেখা হচ্ছে।

আগের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮২.০৪ শতাংশ। সেই নির্বাচনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ১২৬টির মধ্যে ৭৫টি আসনে জয় পেয়ে আবারও ক্ষমতায় আসে। সেই তুলনায় এবার ভোটার উপস্থিতি আরও বেশি হওয়ায় নির্বাচনী উত্তাপ ও আগ্রহের মাত্রাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ভোট
নির্বাচনকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন ছিল। ভোটকর্মীদেরও সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়, যাতে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শেষ করা যায়।
সন্ধ্যা পর্যন্ত ভোটের হার
নির্বাচন কমিশন ও সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটের হার দাঁড়ায় ৮৪.৪২ শতাংশ। পরে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সেই হার বেড়ে ৮৫.১৩ শতাংশে পৌঁছায়। বিকেল ৫টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট শেষ হলেও, সময়সীমার আগে কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

সবচেয়ে বেশি ভোট পড়া জেলা ও আসন
জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে দক্ষিণ সালমারা মানকাচরে, ৯৪.০৮ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে বরপেটা ৯১.৯২ শতাংশ, বঙাইগাঁও ৯১.৭৭ শতাংশ, গোয়ালপাড়া ৯১.৩৪ শতাংশ এবং দরং ৯০.৯১ শতাংশ।
আসনভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে দলগাঁওয়ে, ৯৪.৫৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে শ্রীরাংগ্রাম ৯৪.৩৩ শতাংশ, জলেশ্বর ৯৪.৩১ শতাংশ, মানকাচর ৯৪.০৮ শতাংশ এবং লাহারিঘাট ৯৩.৪৪ শতাংশ।
শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি সাড়া
কামরূপ মহানগর এলাকায় ভোটের হার তুলনামূলক কম ছিল। বিকেল ৫টা পর্যন্ত দিমোরিয়ায় ভোট পড়ে ৮০.৫২ শতাংশ, দিসপুরে ৭৩.৯৮ শতাংশ, গুয়াহাটি সেন্ট্রালে ৭৫.২৩ শতাংশ, জলুকবারিতে ৮০.৮৩ শতাংশ এবং নিউ গুয়াহাটিতে ৭১.২৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে কামরূপ মহানগরে ভোটের হার দাঁড়ায় প্রায় ৭৬.৪১ শতাংশ। এর আগে দুপুর ৩টা পর্যন্ত সেখানে মোট ভোট পড়েছিল ৬৫.৩০ শতাংশ। এতে স্পষ্ট, গ্রামীণ এলাকার তুলনায় শহুরে কেন্দ্রে ভোটের গতি কিছুটা কম ছিল।

নারীদের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা
ভোট দিতে আসা বহু নারী ভোটার নারী আসন সংরক্ষণ বিলকে স্বাগত জানান। তাদের আশা, এই উদ্যোগের ফলে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে এবং তারা নিজেদের কণ্ঠ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবেন। কয়েকজন নারী ভোটার বলেন, উন্নয়ন ও সমঅধিকারের পথে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও সৌহার্দ্য
যোরহাট আসনে মুখোমুখি লড়াইয়ে থাকা বিজেপি প্রার্থী হিতেন্দ্রনাথ গোস্বামী ও কংগ্রেস প্রার্থী গৌরব গগৈ ভোট দেওয়ার পর একসঙ্গে চা পান করতে দেখা যায়। তীব্র নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও এই দৃশ্য রাজনৈতিক সৌজন্যের একটি আলাদা বার্তা দেয়।
ভোটকেন্দ্রে ভিডিও নিয়ে অভিযোগ
কার্বি আংলং জেলার ডিফু আসনের একটি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ভোটপ্রক্রিয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় প্রশাসন অভিযোগ দায়ের করেছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। ভোটকেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল ফোন নেওয়া নিষিদ্ধ থাকায় ঘটনাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

সার্বিক চিত্র
দিনভর কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা সামনে এলেও সামগ্রিকভাবে আসামে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। বেশি ভোটার উপস্থিতি, নারী ভোটারদের আগ্রহ, গ্রামীণ এলাকায় শক্তিশালী সাড়া এবং কড়া নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে আসামের এবারের নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এক পর্ব হয়ে উঠেছে। এখন নজর ৪ মে’র গণনা ও ফলাফলের দিকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















