ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘর্ষ নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির কথা সামনে থাকলেও লেবাননে হামলা থামছে না, উল্টো ইসরায়েল আরও আঘাতের ঘোষণা দিয়েছে। এতে যুদ্ধবিরতি আদৌ টিকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে তেলের বাজার।
উত্তর ইসরায়েলের নিরাপত্তার কথা বললেন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার বলেছেন, উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা চলবে। তার এই বক্তব্যে পরিষ্কার, লেবানন ফ্রন্টে এখনই নরম হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না ইসরায়েল।
এর জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এর স্পষ্ট মূল্য দিতে হবে এবং এর কড়া জবাবও আসবে।

যুদ্ধবিরতি নিয়ে বাড়ছে সন্দেহ
ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকা এবং ইরানের পাল্টা হুমকিতে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নির্ধারিত আলোচনাও বাধার মুখে পড়তে পারে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, সপ্তাহান্তে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইসলামাবাদে ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারও থাকতে পারেন। ইরানের পাকিস্তানস্থ রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন, ইরানি প্রতিনিধিদল বৃহস্পতিবার রাতেই ইসলামাবাদে পৌঁছাবে। পরে সেই পোস্ট মুছে ফেলা হয়।
লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় কি না, তীব্র মতভেদ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু ইরান ও মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের দাবি, লেবাননও এই সমঝোতার অংশ।
এই অবস্থায় ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিকেরাও বলছেন, লেবাননকে যুদ্ধবিরতির বাইরে রাখা হলে পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারও একই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
![]()
বেইরুতে হামলার পর ধ্বংসস্তূপ
বুধবারের ভয়াবহ হামলার পর বৃহস্পতিবার সকালে লেবাননের রাজধানী বেইরুতের অনেক এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা যায়। রাস্তায় দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে ছিল গাড়ি, উড়ে গেছে দোকানের সামনের অংশ, ছড়িয়ে ছিল লোহার বাঁকানো রড।
লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বুধবারের হামলায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং এক হাজারেরও বেশি আহত হয়েছেন। গত মাসে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহর নতুন দফার যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ দিন বলে ধরা হচ্ছে।
এক দিনে শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা বুধবার লেবাননে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেমের ব্যক্তিগত সচিব নিহত হয়েছেন বলেও তাদের দাবি।
হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের দিকে রকেট ছুড়েছে এবং ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাবে।

উপসাগরীয় আকাশে সাময়িক স্বস্তি
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় কোনো আকাশপথের হুমকি নেই। অঞ্চলের আরও কয়েকটি দেশ থেকেও নতুন করে হামলার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের সময় এসব দেশ প্রায় প্রতিদিনই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে জট, তেলের দামে আবার চাপ
ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালি সবার জন্য খোলা আছে। তবে জাহাজকে ইরানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে, কারণ সেখানে মাইনসহ কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ এ কথা বলেছেন।
কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক নয়। বিশ্ববাজারে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল ছিল মার্চের শেষ দিকের পর সর্বনিম্ন। আবুধাবির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির প্রধান সুলতান আহমেদ আল জাবেরও বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আসলে পুরোপুরি খোলা নয়। তার ভাষায়, প্রবেশ সীমিত, শর্তসাপেক্ষ এবং নিয়ন্ত্রিত।
এই অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে তেলবাজারে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রাথমিক লেনদেনে প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে পৌঁছায়। যুদ্ধ শুরুর পর একপর্যায়ে তা ১১০ ডলারেরও ওপরে উঠেছিল।

ইরানে শোকমিছিল, প্রকাশ্যে নতুন আলোচনার কাঠামো
ইরানে সরকারি সমর্থকেরা দেশটির দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ৪০তম দিন উপলক্ষে শোকমিছিল করেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হন বলে জানানো হয়েছে। শিয়া ধর্মীয় প্রথায় মৃত্যুর ৪০তম দিন শোক পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
এদিকে ইরান প্রকাশ্যে ১০ দফা আলোচনার একটি কাঠামো প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, এটি যুদ্ধের অবসান নিয়ে আলোচনার ভিত্তি হতে পারে। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আলোচনার ভিত্তির কথা বলেছেন, প্রকাশিত ওই ১০ দফা তার সঙ্গে মেলে না।
বিভিন্ন ফ্রন্টে বাড়ছে নিহতের সংখ্যা
মানবাধিকারভিত্তিক একটি সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১ হাজার ৬৬৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৪৪ জন শিশু।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, ইসরায়েল-হিজবুল্লাহর সর্বশেষ সংঘাতে দেশটিতে ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানের দায়ে উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলে সোমবার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ছিল অন্তত ২০। আর যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ সামনের কয়েকটি দিন
এখন নজর তিনটি বিষয়ের দিকে। লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় আনা যায় কি না, ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘর্ষ আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয় কি না, এবং পাকিস্তানে নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা আদৌ এগোয় কি না।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত নড়বড়ে। লেবাননে হামলা চলতে থাকলে এই সংকট আরও গভীর হবে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















