পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস—দুই শিবিরের ইশতেহারেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে চাকরির প্রতিশ্রুতি, বিশেষ করে যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের বিষয়টি। রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং কাজের খোঁজে বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে দুই পক্ষই নিজেদের নির্বাচনী অঙ্গীকারে চাকরিকে প্রধান জায়গায় রেখেছে।
প্রতি পরিবারে চাকরির প্রতিশ্রুতি
শনিবার প্রকাশিত বামফ্রন্টের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় এলে প্রতিটি পরিবারে অন্তত একটি স্থায়ী চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ধর্মীয় মেরুকরণ বা মন্দির-মসজিদের রাজনীতির বদলে মানুষের বাস্তব সমস্যাকেই তারা গুরুত্ব দিতে চায়।
বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেন, শহরের দরিদ্র মানুষের জন্য ১০০ দিনের কাজের নিশ্চয়তা এবং গ্রামীণ দরিদ্রদের জন্য ২০০ দিনের কাজের ব্যবস্থা করা হবে। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শিল্পায়নকেও তারা বড় অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। ইশতেহারে ভারী ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ, নতুন সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার পার্ক স্থাপনের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

সরকারি শূন্যপদ পূরণের অঙ্গীকার
মঙ্গলবার প্রকাশিত কংগ্রেসের ইশতেহারে বলা হয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সব খালি সরকারি পদ পূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই ইশতেহার প্রকাশ করেন।
কংগ্রেসের ঘোষণায় ‘যুব সম্মান’ নামে একটি পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। এর আওতায় নতুন উদ্যোগ বা নবীন ব্যবসা শুরু করতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু সরকারি চাকরি নয়, নতুন প্রযুক্তি ও উদ্যোগভিত্তিক কর্মসংস্থানের দিকেও নজর দেওয়ার বার্তা দিয়েছে দলটি।
নির্বাচনের কেন্দ্রে কেন চাকরি
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চাকরি যে অন্যতম বড় প্রশ্ন, তা এখন প্রায় স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও ঘোষণা করেছেন, তাঁর দল ক্ষমতায় এলে রাজ্য সরকারি কর্মীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন চালু করা হবে। পাশাপাশি নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে যারা চাকরি পাওয়ার সুযোগ হারিয়েছেন, তাদের জন্য বয়সে ছাড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যেই রাজ্য থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কাজের খোঁজে অন্যত্র চলে গেছেন। বলা হচ্ছে, প্রায় দশ লক্ষ শ্রমিক রাজ্য ছেড়েছেন মূলত কর্মসংস্থানের অভাবে। ফলে চাকরির প্রশ্ন এখন শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তব সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

ভাতা বনাম কর্মসংস্থান
ভোট ঘোষণার ঠিক আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বাংলার যুব সাথী’ প্রকল্প চালুর ঘোষণা দেন। এই প্রকল্পে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী বেকার যুবকদের মাসে ১,৫০০ টাকা করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মাসিক এই সহায়তা পেতে প্রায় ৮০ লক্ষ যুবক-যুবতী আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন।
তবে শাসকদলের ‘দশ প্রতিশ্রুতি’ভিত্তিক ইশতেহারে নগদ সহায়তার নানা প্রকল্পের কথা থাকলেও চাকরি নিয়ে স্পষ্ট কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নেই। এই জায়গাতেই বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস নিজেদের আলাদা করে তুলে ধরতে চাইছে। তারা বোঝাতে চাইছে, কেবল ভাতা নয়, স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করাই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল প্রতিশ্রুতি।

নারী ও স্বাস্থ্য নিয়ে কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতি
কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের জন্য ‘পাঁচ গ্যারান্টি’ ঘোষণা করেছে। সেখানে নারীদের জন্য ‘দুর্গা সম্মান’ নামে মাসে ২,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি অনেকটাই শাসকদলের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের অনুরূপ, যেখানে মহিলাদের মাসে ১,৫০০ টাকা দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যখাতেও কংগ্রেস ‘বিধান স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ নামে একটি প্রকল্পের কথা বলেছে। এই প্রকল্পে প্রতিটি পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিমা দেওয়ার আশ্বাস রয়েছে। এটিও অনেকের কাছে শাসকদলের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বা অনুরূপ পরিকল্পনা বলে মনে হচ্ছে।
রাজনৈতিক বার্তার ভেতরের লড়াই
এই ইশতেহারগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে এখন লড়াইটা শুধু দল বনাম দল নয়, বরং প্রতিশ্রুতির ধরন নিয়েও। একদিকে রয়েছে নগদ সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষার রাজনীতি, অন্যদিকে রয়েছে চাকরি, শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি।
বামফ্রন্ট চেষ্টা করছে নিজেদের বাস্তব সমস্যাভিত্তিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে। কংগ্রেসও চাকরি, নতুন উদ্যোগ, প্রযুক্তি ও সামাজিক সুরক্ষার মিশ্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে চাইছে। সব মিলিয়ে এ কথা পরিষ্কার যে, এবারের নির্বাচনে কর্মসংস্থানই অন্যতম প্রধান নির্ধারক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















