ইরানের বিরুদ্ধে বড় সামরিক পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এগোল, সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে দেখা যায় সিদ্ধান্তটি একদিনে হয়নি। হোয়াইট হাউসের একের পর এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক প্রবৃত্তি, সামরিক ঝুঁকি, গোয়েন্দা সংস্থার সতর্কতা এবং ইসরায়েলের জোরালো চাপ—সব একসঙ্গে বিচার করেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছান, যা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারকেও নাড়িয়ে দেয়।
হোয়াইট হাউসের গোপন বৈঠকে কী ছিল
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ওয়াশিংটনে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সামনে এমন একটি চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ হামলাকে প্রায় নিশ্চিত সাফল্যের পথ হিসেবে দেখানো হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দ্রুত ভেঙে দেওয়া সম্ভব, শাসকগোষ্ঠীকে দুর্বল করা সম্ভব, এমনকি দেশটির ভেতরে ক্ষমতার পালাবদলের পথও তৈরি হতে পারে। ওই উপস্থাপনা ট্রাম্পের ওপর স্পষ্ট প্রভাব ফেলে এবং তিনি পরিকল্পনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে শুরু করেন।

গোয়েন্দা বিশ্লেষণে দেখা দিল ভিন্ন ছবি
তবে পরের বৈঠকেই মার্কিন গোয়েন্দা মহল ইসরায়েলের উপস্থাপনার বড় অংশ নিয়ে সংশয় জানায়। তাদের মূল্যায়ন ছিল, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে আঘাত করা বা সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা কিছুটা সম্ভব হলেও শাসন পরিবর্তনের যে চিত্র দেখানো হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। অর্থাৎ দ্রুত সামরিক সাফল্য মিললেও রাজনৈতিক ফল একই গতিতে আসবে—এমন নিশ্চয়তা ছিল না। এই সতর্কতা সত্ত্বেও ট্রাম্পের আগ্রহ কমেনি। বরং তিনি মূল লক্ষ্যকে সীমিত করে সামরিক ফল নিশ্চিত করার দিকেই ঝুঁকেছেন।
ট্রাম্পের ভাবনা কোথায় আলাদা ছিল
এই পুরো পর্বে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট। তিনি ইরানকে দীর্ঘদিনের বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেছেন এবং মনে করেছেন, সুযোগ পেলে তার সামরিক শক্তি ও পারমাণবিক পথ দুটোকেই একসঙ্গে আঘাত করা দরকার। তার আশপাশের সবাই একই রকম ভাবেননি। কেউ কেউ কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন, কেউ সীমিত হামলার কথা বলেছেন, আবার কেউ সরাসরি বড় যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তুলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত অবস্থানই প্রাধান্য পায়।

সবচেয়ে বড় আপত্তি কোথা থেকে এসেছিল
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে সবচেয়ে কড়া সংশয় এসেছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে। তার আশঙ্কা ছিল, ইরানের সঙ্গে বড় যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল সামরিক ও আর্থিক চাপে পড়বে, মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা বাড়বে, আর দেশের ভেতরেও এর রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট তৈরি হলে জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে—এই শঙ্কাও তিনি সামনে আনেন। সামরিক শীর্ষ পর্যায় থেকেও অস্ত্রভান্ডার দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়। কিন্তু আপত্তিগুলো শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি।

শেষ বৈঠক, শেষ অনুমোদন
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে হোয়াইট হাউসে আরেকটি চূড়ান্ত বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত প্রায় সবাই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। কেউ বলেন লক্ষ্য যদি শাসন পরিবর্তন হয়, তবে ঝুঁকি অনেক বেশি। কেউ বলেন লক্ষ্য যদি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দুর্বল করা হয়, তবে তা অর্জনযোগ্য। ট্রাম্প সবার কথা শোনার পর বলেন, এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পরদিন নির্ধারিত সময়সীমার ঠিক আগে তিনি সামরিক অভিযান অনুমোদন করেন। এর মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বড় সংঘাতের পথে হাঁটে।
এ সিদ্ধান্তের বড় তাৎপর্য কী
এই ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, যুদ্ধের মতো বিশাল সিদ্ধান্তেও আনুষ্ঠানিক গোয়েন্দা সতর্কতা, সামরিক হিসাব আর রাজনৈতিক ঝুঁকির সঙ্গে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও প্রবৃত্তি কতটা শক্তভাবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট করে যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ভাবনা এবং ট্রাম্পের ইরান-দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে গভীর মিল ছিল। ফলে আলোচনার টেবিলে সন্দেহ থাকলেও সিদ্ধান্তের মুহূর্তে যুদ্ধপন্থী অবস্থানই জিতে যায়।

এখনকার বাস্তবতা
এই সিদ্ধান্তের পরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে দুই পক্ষ একটি অস্থায়ী দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও এর ব্যাখ্যা, প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে এখনো তীব্র অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এই বিরতিকে আরও নড়বড়ে করে তুলেছে। ফলে যে সিদ্ধান্ত ফেব্রুয়ারিতে নেওয়া হয়েছিল, তার অভিঘাত এখনো পুরো অঞ্চল বহন করছে।
বিকল্প শিরোনাম ১: ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত, হোয়াইট হাউসের গোপন বৈঠকের ভেতরের গল্প
বিকল্প শিরোনাম ২: নেতানিয়াহুর চাপ, গোয়েন্দা সতর্কতা, তারপরও যুদ্ধপথে ট্রাম্প
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















