এসআইআরে বাদ পড়া ভোটার নিয়ে চিন্তা শুধু তৃণমূলের নয়, বিজেপিরও৷ অনেক নাম বাদ পড়েছে মতুয়া এলাকায়৷
খসড়া ভোটার তালিকা ও বিচারাধীন মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে৷ বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর আগে রাজ্যে ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ৷ এখন এই সংখ্যা ৬ কোটি ৭৭ লক্ষ৷
সংখ্যালঘুদের নাম বেশি বাদ পড়েছে, এ কথা যেমন ঠিক, তেমনই শতাংশের হারে মতুয়া অধ্যুষিত জেলায় ভোটাধিকার হারিয়েছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ৷
মতুয়াদের নাম বাদ
বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় বড় সংখ্যায় রয়েছে মতুয়া জনগোষ্ঠী৷ উত্তরবঙ্গের কিছু জায়গায় তাদের উপস্থিতি রয়েছে৷ রাজ্যে ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ৫৫টিতে মতুয়াদের ভোট নির্ণায়ক হয়ে ওঠে৷
বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার বিচারে উত্তর ২৪ পরগনা রয়েছে শীর্ষে৷ খসড়া তালিকা ও বিচারাধীন মিলিয়ে এই জেলায় বাদ পড়েছে সাড়ে ১২ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম৷ একইভাবে শতাংশের বিচারে শীর্ষে রয়েছে নদিয়া জেলা৷ বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ এই জেলায় বাদ পড়েছে৷ মতুয়া অধ্যুষিত উত্তর ২৪ পরগনায় এই হার ৫৫ শতাংশের বেশি৷
৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের নাম রাজ্যজুড়ে বিচারাধীনের তালিকায় ছিল৷ এর মধ্যে অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জন ভোটার৷ এই বাদ পড়া ভোটারদের নিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য জল্পনা বাড়িয়ে তুলেছে৷
জনসভায় অভিষেক দাবি করেছেন, এই ২৭ লক্ষের বেশি ডিলিটেড ভোটারের মধ্যে ১০ লক্ষের বেশি হিন্দু৷ যে সব জেলায় হিন্দুদের সংখ্যা বেশি, সেখানকার এত ভোটার বাদ গেলে, তা বিজেপির পক্ষে দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে৷ ২০২১-এর বিধানসভা ও ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ৫০ শতাংশের বেশি হিন্দু ভোটার বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন৷
তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন সূত্র উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য তুলে ধরা হচ্ছে, তাতে আরো বেশি হিন্দুর বাদ পড়ার কথা বলা হয়েছে৷ এই দাবি অনুযায়ী, সবমিলিয়ে যে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছেন, তার অর্ধেকের বেশি হিন্দু৷ যদিও সরকারিভাবে তৃণমূল এমন কোনো প্রেস বার্তা দেয়নি৷
দাবি কতটা ঠিক
তৃণমূল সরকারিভাবে বিবৃতি না দিলেও অভিষেকের জনসভার বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেননি বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য৷ বরং তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, ‘‘পরিকল্পিতভাবে মতুয়া ও আদিবাসীদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করেছে তৃণমূল৷ এতে কিছুটা হলেও তারা সফল৷’’ বিজেপি আগেও অভিযোগ করেছিল, তৃণমূলপন্থি বিএলও-রা ইচ্ছাকৃতভাবে নাম বাদ দিয়েছেন৷
যদিও অতীতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বনগাঁর বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এসআইআর হলে মতুয়াদের নাম বাদ যেতে পারে৷ তিনি বলেছিলেন, ‘‘এসআইআর আমাদের কোনো সমস্যা নয়৷ ভারত সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য যদি এসআইআর আমাদের মানতে হয়, তাহলে মানব না কেন৷ ৫০ লক্ষ রোহিঙ্গা, অনুপ্রবেশকারীকে বাদ দিতে গিয়ে যদি আমার সম্প্রদায়ের এক লক্ষ মানুষকে ভোটদান থেকে বিরত থাকতে হয়, তাতে কী আসে যায়৷’’
তা সত্ত্বেও বিজেপির দাবি, মতুয়ারা তাদের পাশে থাকবেন৷ সিএএ-র মাধ্যমে ওপার বাংলা থেকে আসা হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছে৷ এর মধ্যে পড়েন মতুয়ারাও৷ ফলে ভোটাধিকার গেলেও তাদের নাগরিকত্ব পাওয়া নিশ্চিত৷ শান্তনু নিজেও অনেকবার সিএএ-র জন্য আবেদন জানাতে মতুয়াদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন৷
হিন্দুপ্রধান জেলায় বাদ
শুধু নদিয়া বা উত্তর ২৪ পরগনা নয়, এমন অনেক জেলায় শতাংশের হারে বড় সংখ্যক বিচারাধীন ভোটার বাদ পড়েছেন, যে জেলাগুলি সংখ্যালঘু প্রধান নয়৷
শতাংশের হারে নদিয়ার পরে সবচেয়ে বেশি মানুষ বাদ পড়েছেন হুগলি জেলায়৷ প্রায় ৭১ শতাংশ৷ এ ছাড়া দক্ষিণবঙ্গের পূর্ব বর্ধমানে ৫৮ শতাংশ, পশ্চিম বর্ধমানে ৫৪ শতাংশ, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৫১ শতাংশ বিচারাধীন ভোটার অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন৷ এই তালিকায় চার নম্বরে রয়েছে উত্তরবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর, যেখানে ৫৮ শতাংশের বেশি ভোটার অযোগ্য৷ প্রথম দশে রয়েছে উত্তরবঙ্গের আর এক জেলা কোচবিহার৷ এখানে প্রায় ৫১ শতাংশ বিচারাধীন ভোটার বাদ পড়েছেন৷
এর মধ্যে নদিয়া ছাড়া দক্ষিণবঙ্গের অন্য জেলাগুলিতে তৃণমূলের দাপট প্রশ্নাতীত৷ উত্তরবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর ও কোচবিহার বিজেপির শক্ত ঘাঁটি৷
মুসলমানরা নিশানায় নয়?
এসআইআরকে মুসলমান বিরোধী তকমা দিয়েছে তৃণমূল৷ ইন্ডিয়া জোটের অন্য দলগুলি এর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে৷ প্রশ্ন তুলেছেন যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্তভূষণের মতো সমাজকর্মী, দেশ বাঁচাও গণমঞ্চের মতো সংগঠন৷ হিন্দুদের নামও যদি বাদ পড়ে তাহলে এদের আশঙ্কা কতটা ঠিক?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘সংবিধানে ৩২৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী যারা ভারতের নাগরিক নন, তারা ভোটার অধিকার পান না এবং এখানে ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই৷ যদি হিন্দুদের কাছেও সঠিক নথিপত্র না থাকে, তবে তারাও ভোটাধিকার হারাবেন৷ বিজেপি যেহেতু সনাতন ধর্মের আদর্শে দেশ গড়ার কথা বলে, তাই ১০ লক্ষ হিন্দু ভোটার বাদ যাওয়ায় তাদের ভোটব্যাংকে কিছুটা ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক৷ তবে এতে হিন্দুদের ক্ষোভ হয়তো খুব বেশি হবে না, কারণ সিএএ বা নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ ও জৈনদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে৷ যারা প্রমাণ করতে পারবেন যে তারা হিন্দু এবং নির্দিষ্ট সময়ের আগে অন্য দেশ থেকে এসেছেন, তারা এই আইনের সুবিধা পাবেন৷’’
বিরোধীদের দাবি প্রসঙ্গে রাজাগোপাল বলেন, ‘‘তৃণমূল কংগ্রেস বারবার প্রচার করার চেষ্টা করছে যে বিজেপি মুসলিম বিরোধী কাজ করছে৷ কিন্তু যখন দেখা যাচ্ছে যে বিপুল সংখ্যক হিন্দুও ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, তখন এই মুসলিম বিরোধী প্রচারের জোর কিছুটা কমে যাচ্ছে৷ এর ফলে বোঝা যাচ্ছে যে নির্বাচন কমিশন ধর্মের ভিত্তিতে নয়, বরং নথিপত্রের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করেছে৷ নাগরিকত্ব এবং ভোটাধিকার সম্পূর্ণ নথিপত্রের বিষয়৷ যার কাছে বৈধ কাগজ নেই, তিনি ভারতের নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন না এবং ভোটাধিকারও পাবেন না৷’’
কমিশন কি নিরপেক্ষ?
হিন্দুদের নাম বাদ যাওয়া মানেই নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছে, এটা মানছেন না সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য৷ তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘এসআইআর মুসলিমদের টার্গেট করেই করা হয়েছে৷ কিন্তু তাতে হিন্দুরা সবসময় বাদ চলে যাবে, এরকম তো ব্যাপার নয়৷ যা সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে, সেই সিস্টেমের কোপে হিন্দুরাও পড়ে গিয়েছে৷ লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি প্রক্রিয়া কার্যকর করা হয়েছে অ্যাপ দিয়ে৷ এর নিয়ম হিন্দুদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে তারাও কোপে পড়ে গিয়েছে৷ বিশেষ করে বেশি পড়েছেন মতুয়া হিন্দুরা৷ যে ভদ্রমহিলার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ করা হয়েছে যে তিনি এই অ্যাপটা করেছেন, তার তৈরি জাঁতাকলে যেমন মুসলমানরা পিষেছেন, তেমনি হিন্দুরাও৷ তাদের জন্য তথাকথিত হিন্দু জাতীয়তাবাদী পার্টি বিজেপি এই বিপদ এনে উপস্থিত করল৷’’
অনেকের মতে, এসআইআর বিজেপির কাছে বুমেরাং হয়েছে৷ সুমনের বক্তব্য, ‘‘এটা একেবারে কোল্যাটেরাল ড্যামেজ৷ এবার বিজেপিকে হিন্দুদের কাছে জবাব দিতে হবে৷ বিজেপি দাবি করেছিল, তারা রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশি মুসলমানদের তাড়াতে চাইছে৷ তাহলে এই যে মতুয়া-সহ হিন্দুরা বাদ পড়েছে, তাদের কী হবে?’’
বিজেপি মুখপাত্র বিমলশঙ্কর নন্দ মতুয়াদের অসুবিধার জন্য তৃণমূলকেই দায়ী করেছেন৷ তিনি ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘ওপার বাংলা থেকে আসা মতুয়াদের সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছিল৷ অনেকে আবেদন করে নাগরিকত্ব পেয়েছেন৷ কিন্তু অনেককে তৃণমূল ভুল বুঝিয়েছে৷ তাই তারা আবেদন করেননি৷ তাদের কিছু সমস্যা হয়েছে৷ কিন্তু তারা যদি সিএএ-র জন্য আবেদন করেন, নাগরিকত্ব পাবেন, ভোটাধিকার পাবেন৷ ভোটার তালিকাতেও তাদের নাম উঠবে৷ এই অংশের মতুয়ারা এখন বুঝতে পারছেন যে তৃণমূল তাদের ভুল বুঝিয়েছে৷ এতে তৃণমূলের সমস্যা হবে, বিজেপির নয়৷
ডিডাব্লিউ ডটকম
পায়েল সামন্ত ভারত 



















