দিল্লির সবচেয়ে প্রিয় সবুজ ঠিকানাগুলোর একটি লোধি গার্ডেন বৃহস্পতিবার নব্বই বছরে পা দিল। সকালে হাঁটতে আসা মানুষ, যোগব্যায়ামপ্রেমী, নির্জনতা খোঁজা দর্শনার্থী, তরুণ-তরুণী—সবার কাছেই বহুদিনের প্রিয় এই উদ্যান শুধু একটি পার্ক নয়, বরং ইতিহাস, প্রকৃতি আর নগরজীবনের এক অনন্য মিলনস্থল।
ইতিহাসের ভিতের ওপর গড়া এক সবুজ আশ্রয়
বর্তমান লোধি গার্ডেন ১৯৩৬ সালের ৯ এপ্রিল ‘লেডি উইলিংডন পার্ক’ নামে উদ্বোধন করা হয়েছিল। তৎকালীন গভর্নর জেনারেলের স্ত্রীকে ঘিরেই সেই নামকরণ। এখনো অমৃতা শেরগিল মার্গের দিকের প্রবেশপথে তাঁর নামের চিহ্ন রয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কারণে পার্কটির নাম বদলে রাখা হয় লোধি গার্ডেন। পরে ১৯৬৮ সালে মার্কিন স্থপতি জোসেফ এ স্টেইনের নকশায় এর সৌন্দর্যায়ন নতুনভাবে সাজানো হয়।
শুধু নব্বই বছরের ইতিহাস নয়, এই এলাকার সবুজ ঐতিহ্য আরও অনেক পুরোনো। ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে রচিত বিবরণে এই অঞ্চলকে ‘সমৃদ্ধির উদ্যান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে পঞ্চদশ শতকে সাইয়্যিদ ও লোধি আমলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সমাধি নির্মাণের মধ্য দিয়ে জায়গাটির চরিত্র বদলাতে শুরু করে। তখনই আজকের পরিচিত ঐতিহাসিক কাঠামোগুলোর রূপ গড়ে ওঠে।

স্থাপত্য, স্মৃতি আর সময়ের সহাবস্থান
এখনকার লোধি গার্ডেন চত্বরে রয়েছে চারটি প্রধান স্থাপনা—মোহাম্মদ শাহর সমাধি, বড়া গম্বুজ, শীশ গম্বুজ এবং সিকন্দর শাহর সমাধি। এর সঙ্গে আছে আকবর আমলের একটি সেতু, তিনটি পুকুর, বনসাই উদ্যান, ভেষজ বাগান এবং একটি বড় নার্সারি। ফলে এটি শুধু হাঁটার জায়গা নয়, বরং বহু যুগের স্থাপত্য-ঐতিহ্যকে একসঙ্গে দেখার একটি খোলা জাদুঘরও বটে।
শহর-ইতিহাসবিদদের মতে, এই বাগানে সাইয়্যিদ, লোধি ও মুঘল—এই তিন রাজবংশের স্থাপত্য-ঐতিহ্যের অসাধারণ উপস্থিতি রয়েছে। তবে এর পেছনে আছে উচ্ছেদের ইতিহাসও। বর্তমান উদ্যান গড়ে তুলতে খায়েরপুর গ্রাম উচ্ছেদ করা হয়েছিল, পাশের আরেকটি গ্রামও সরিয়ে দেওয়া হয়। একসময় এই অঞ্চলের ভেতর দিয়ে যমুনার একটি শাখানদী প্রবাহিত হতো, কিন্তু পরবর্তী উন্নয়নকাজে সেই প্রাকৃতিক সংযোগ হারিয়ে যায়।
লোককথা, ক্ষোভ আর পুনর্মিলনের গল্প
খায়েরপুর গ্রামের উচ্ছেদ ঘিরে স্থানীয়ভাবে এক লোককথাও প্রচলিত আছে। বলা হয়, উচ্ছেদে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের অভিশাপের সঙ্গে এক পীরের নাম জড়িয়ে পড়ে, আর সেই কারণেই পার্ক উদ্বোধনের কয়েক দিনের মধ্যেই ব্রিটিশ শাসকেরা লন্ডনে ফিরে যেতে বাধ্য হন। ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা এই ধরনের লোককথা আজও লোধি গার্ডেনকে শুধু একটি পার্কের চেয়ে বেশি কিছু করে তুলেছে।
পরে সেই পীরের কবর সংস্কার করা হয় এবং ২০০৯ সালে কাছেই একটি প্রজাপতি সংরক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। স্থানীয়দের একাংশ মনে করেন, এই উদ্যোগ যেন অতীতের ক্ষোভকে শান্তির দিকে নিয়ে গেছে।
![]()
গাছপালার বিশাল ভাণ্ডার
লোধি গার্ডেনকে অনেকেই বৃক্ষপ্রেমীদের স্বর্গ বলেন। এখানে বিদেশি ও দেশীয়—দুই ধরনেরই অসংখ্য বৃক্ষ রয়েছে। রুপালি ওক, ক্যারিবীয় ট্রাম্পেটের মতো বিদেশি গাছের পাশাপাশি আছে মৌলশ্রী, সীতা অশোক, নিম, পলাশসহ নানা দেশীয় প্রজাতি। উদ্যান কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এখানে ২১০ প্রজাতির পাঁচ হাজার চারশরও বেশি গাছ রয়েছে।
বৃক্ষপ্রেমীদের মতে, এখানে রুদ্রাক্ষ, কর্পূর, রোহিদা, দক্ষিণী ম্যাগনোলিয়া, জলপাই, গামার, চন্দন, এমনকি স্বাদুপানির ম্যানগ্রোভও দেখা যায়। বড়া গম্বুজের কাছে একটি ঐতিহ্যবাহী আমগাছ রয়েছে, যদিও সেটি এখন রোগাক্রান্ত। তবু উদ্যানকর্মীরা গাছটিকে যতদিন সম্ভব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। কাছেই একটি পুরোনো রোহিদা গাছকে ঘিরেও লোকবিশ্বাস রয়েছে—অনেকে অসুস্থ শিশুর কাপড় সেখানে ঝুলিয়ে আরোগ্য কামনা করেন।
প্রকৃতির সঙ্গে নতুন সংযোজন
উদ্যানটিতে রয়েছে বিশাল বাঁশঝাড়, ১৯৭০ সালে নির্মিত কাচঘর এবং ১৯৯৬ সালে গড়ে ওঠা জাতীয় বনসাই উদ্যান। সময়ের সঙ্গে এখানে নতুন নতুন সংযোজন হয়েছে—প্রজাপতি উদ্যান, টিউলিপ ঘরসহ আরও নানা আকর্ষণ। তবে দীর্ঘদিনের কর্মীদের মতে, এত পরিবর্তনের পরও লোধি গার্ডেনের মূল সত্তা একই আছে—এটি এখনো শান্তি, প্রকৃতি আর ইতিহাসের এক বিরল মিলনভূমি।
নব্বই বছর উদ্যাপনের আয়োজন
পার্কটির নব্বইতম জন্মদিন উপলক্ষে উদযাপনেরও আয়োজন করা হয়েছে। প্রায় নব্বইজন উদ্যানকর্মীর জন্য মধ্যাহ্নভোজের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি থাকছে আরাবল্লী অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনা সভা। উদ্যান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চারাগাছও বিতরণ করা হবে। এই আয়োজন শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়, বরং লোধি গার্ডেনকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধন, স্মৃতি আর নাগরিক দায়িত্ববোধেরও প্রকাশ।

দিল্লির হৃদয়ে লোধি গার্ডেনের গুরুত্ব
আশি একরজুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যান বহু দশক ধরে দিল্লির নাগরিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে ইতিহাস আছে, প্রকৃতি আছে, লোকবিশ্বাস আছে, আবার প্রতিদিনের নগরজীবনের প্রশান্তিও আছে। চলচ্চিত্রের দৃশ্য থেকে ব্যক্তিগত স্মৃতি—সবকিছুর অংশ হয়ে ওঠা লোধি গার্ডেন নব্বই বছর পূর্তিতে আবার মনে করিয়ে দিল, একটি শহরের প্রাণ শুধু তার সড়ক বা ভবনে নয়, তার সবুজ স্মৃতিতেও বেঁচে থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















