০২:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
চাকার ঘর, পথে পরিবার: আরামে ঘোরা যাবে, তবে না জেনে উঠলেই বাড়বে বিপদ ঝুঁকির নেশায় বদলে যাওয়া সময়, ‘আমি পারি’ মানসিকতার উত্থান আর নৈতিকতার হারিয়ে যাওয়া দিশা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হতেই একের পর এক মৃত্যু, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য ইডাহো ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘর্ষে নতুন শঙ্কা, যুদ্ধবিরতি কি আদৌ হবে, আবার অস্থির তেলের বাজার হুথি নেতার চোখে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি, তেহরানের জন্য ‘বড় বিজয়’ ডিএসই-সিএসইতে সপ্তাহের শেষ লেনদেনে বড় দরপতন, সূচকে তীব্র পতন চাষাড়ায় সশস্ত্র দুই পক্ষের গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ দুই শিক্ষার্থী তুরাগের বস্তিতে আগুন, নিয়ন্ত্রণে আনতে পাঁচ ইউনিটের চেষ্টা লেবানন ঘিরে যুদ্ধবিরতির টানাপোড়েন ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় কমছে বিশ্ব অর্থনীতির গতি: আইএমএফের সতর্কবার্তা

ঝুঁকির নেশায় বদলে যাওয়া সময়, ‘আমি পারি’ মানসিকতার উত্থান আর নৈতিকতার হারিয়ে যাওয়া দিশা

আমাদের সময়টা যেন অদ্ভুত এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে এখন এমন এক মানসিকতার জয়জয়কার, যেখানে মনে করা হচ্ছে—চাইলেই সব সম্ভব, নিয়ম মানা দুর্বলতার লক্ষণ, আর দ্রুত সিদ্ধান্তই সাফল্যের একমাত্র রাস্তা। জীবন, কাজ, সম্পর্ক, পেশা, এমনকি ভবিষ্যৎ—সবকিছু যেন এক ধরনের ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। এই নতুন ভাবনার কেন্দ্রে আছে এমন এক বিশ্বাস, যা মানুষকে বলছে, থেমে থাকো না, অপেক্ষা করো না, পরিস্থিতির কাছে মাথা নত করো না—নিজেই পথ বানাও, নিজেই নিয়ম লেখো, নিজেই নিজের ভাগ্য তৈরি করো। কিন্তু এই ঝলমলে আহ্বানের আড়ালেই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। সবকিছু করার ক্ষমতা থাকলেই কি মানুষ সঠিক পথে থাকে, নাকি কাজের পাশাপাশি দরকার তার নৈতিক অর্থও।

সময়ের নতুন মন্ত্র: থেমে নয়, ভেঙে এগিয়ে যাও

কিছুদিন আগেও সাফল্যের চেনা সংজ্ঞা ছিল অপেক্ষাকৃত স্থির। মানুষ ধীরে ধীরে এগোবে, পড়াশোনা করবে, চাকরি করবে, সঞ্চয় গড়বে, অভিজ্ঞতা বাড়াবে, তারপর বড় সিদ্ধান্ত নেবে। জীবনকে একটি দীর্ঘপথের যাত্রা হিসেবে ভাবা হতো, যেখানে ধৈর্য, সংযম আর প্রস্তুতির মূল্য ছিল সবচেয়ে বেশি। এখন সেই ছবিটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

নতুন প্রজন্মের এক বড় অংশের কাছে আজ জীবনের পুরোনো ছক আর তেমন আকর্ষণীয় নয়। বরং আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে এমন এক মানসিকতার প্রতি, যা বলে—অপেক্ষা করার কিছু নেই, যোগ্যতার সার্টিফিকেটেরও দরকার নেই, অনুমতিরও প্রয়োজন নেই; নিজের সাহস, গতি আর সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। চাকরি ছেড়ে নতুন কিছু শুরু করা, অচেনা শহরে চলে যাওয়া, বহুদিনের বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে পড়া, এমনকি প্রচলিত সাফল্যের পথকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করাও এখন অনেকের চোখে আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।

এই ভাবনাকে তাই কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির ভাষা হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এক ধরনের জীবনদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এখানে স্থিরতা নয়, গতি বড় কথা। নিয়ম মানা নয়, নিয়ম প্রশ্ন করা বড় কথা। অপেক্ষা নয়, ঝুঁকি নেওয়াই যেন সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত গুণ।

Opinion | All the Worst People Seem to Want to Be 'High Agency' - The New  York Times

কেন এই মানসিকতা এখন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে

এই প্রবণতার পেছনে কেবল ফ্যাশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত অনিশ্চয়তা। মানুষ দেখছে, বহু বছরের পরিশ্রম সবসময় নিশ্চিন্ত জীবন এনে দেয় না। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেকে কাজ পাচ্ছে না। কাজ পেলেও স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা নেই। বাড়ির দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে। পরিশ্রম আর প্রাপ্তির সম্পর্কও ক্রমশ অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় ধীরে এগোনোর পুরোনো উপদেশ অনেকের কাছেই ফাঁপা শোনায়। যখন দীর্ঘ পরিকল্পনাও অনিশ্চিত, তখন অনেকেই ভাবছেন—তাহলে ঝুঁকিই বা নেব না কেন। যখন নিশ্চিত পথে চলেও নিরাপত্তা মিলছে না, তখন অনিশ্চিত পথে দ্রুত দৌড়ানোর মধ্যেই যেন এক ধরনের মানসিক মুক্তি পাওয়া যায়।

এই কারণেই নতুন এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা আজ এত সহজে মানুষের ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছে। এটি শুধু সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেয় না, এটি হতাশ মানুষকে ক্ষমতার অনুভূতিও দেয়। বলে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, শেষ কথা এখনও তোমার।

ক্ষমতার ভাষা, কিন্তু সবার জন্য সমান নয়

তবু এই দর্শনের ভিত যতই শক্তিশালী বলে মনে হোক, এর মধ্যে একটি বড় অসমতা লুকিয়ে আছে। বাস্তবে সব মানুষ একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করে না। কারও হাতে সঞ্চয় আছে, পারিবারিক নিরাপত্তা আছে, ব্যর্থ হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর অবকাশ আছে। আবার এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের জন্য একটি ভুল সিদ্ধান্তই পুরো জীবনকে টলিয়ে দিতে পারে।

তাই ঝুঁকি নেওয়ার পরামর্শ শুনতে যত আকর্ষণীয়, বাস্তবে তা সবার জন্য সমান প্রযোজ্য নয়। যে মানুষ খারাপ ঋণ, অনিশ্চিত আয় আর সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে বেঁচে আছেন, তার জন্য হঠাৎ বড় ঝুঁকি নেওয়া রোমাঞ্চ নয়, বরং বিপদও হতে পারে। এখানেই নতুন এই মানসিকতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি মানুষকে শক্তিশালী হওয়ার ভাষা দিলেও অনেক সময় সামাজিক বাস্তবতার জটিলতাকে আড়াল করে ফেলে।

অর্থাৎ, ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু সেই ইচ্ছাশক্তি কখন কার্যকর হবে, কে তা কাজে লাগাতে পারবে, আর কার পক্ষে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে—এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে পুরো আলোচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

Opinion | All the Worst People Seem to Want to Be 'High Agency' | Raman Frey

সাহস, আত্মবিশ্বাস আর নৈতিকতার সূক্ষ্ম ফারাক

নতুন এই চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো, এটি কর্মকে মহিমান্বিত করে, কিন্তু কর্মের নৈতিক উদ্দেশ্যকে প্রায়ই পাশ কাটিয়ে যায়। কিছু করা, দ্রুত করা, দেরি না করা—এসবকে গুণ হিসেবে সামনে আনা হয়। কিন্তু কী করা হচ্ছে, কেন করা হচ্ছে, তার সামাজিক ফল কী হতে পারে, অন্যের ওপর তার প্রভাব কতটা—এসব প্রশ্ন অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।

একসময় যে শব্দগুলোকে আমরা মূল্যবান বলে ভাবতাম—সাহস, বিবেক, নৈতিক দৃঢ়তা, দায়িত্ববোধ—সেগুলোর জায়গা যেন এখন কেবল কার্যক্ষমতা দখল করে নিচ্ছে। ফলে এমন এক সময় তৈরি হচ্ছে, যেখানে মানুষ কাজকে বিচার করছে তার গতি দিয়ে, উদ্দেশ্য দিয়ে নয়। অথচ কাজের প্রকৃত মূল্য তো সেখানেই, যেখানে তা শুধু ব্যক্তিগত লাভে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বৃহত্তর কল্যাণের দিকেও তাকায়।

এই কারণেই ‘আমি পারি’ ধরনের চেতনা যতই তীক্ষ্ণ ও প্রাণবন্ত শোনাক, তার ভেতরে একটি বিপজ্জনক ফাঁক রয়ে যায়। কারণ ক্ষমতা আছে মানেই যে তা সঠিক কাজে ব্যবহৃত হবে, এমন তো নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি এবং ন্যায়ের বোধ এক জিনিস নয়। একটিতে গতি আছে, অন্যটিতে দিশা আছে। আর দিশাহীন গতি শেষ পর্যন্ত ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষের নতুন উৎকণ্ঠা

এই মানসিকতার পেছনে প্রযুক্তির প্রভাবও প্রবল। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। মানুষ এখন আশঙ্কা করছে, যেসব কাজ এতদিন দক্ষতা হিসেবে মূল্য পেয়েছে, তার বড় অংশই যন্ত্রের হাতে চলে যেতে পারে। এই ভয় থেকেই অনেকের কাছে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তক্ষমতা, দ্রুত অভিযোজন এবং নিজে কিছু শুরু করার মানসিকতা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

কিন্তু এখানেও এক ধরনের গভীর বিদ্রূপ আছে। মানুষ যে গুণকে নিজের শেষ আশ্রয় ভাবছে, সেই কাজ করবার ক্ষমতাকেই এখন যন্ত্রের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যন্ত্রও কাজ করছে, নির্দেশ পালন করছে, একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে। অর্থাৎ কেবল কাজ করতে পারা, দ্রুত সাড়া দিতে পারা, অবিরাম সক্রিয় থাকা—এসবই যদি শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে মানুষ আর যন্ত্রের ফারাক কোথায় দাঁড়াবে?

মানুষকে আলাদা করে শুধু তার কর্মক্ষমতা নয়। মানুষকে আলাদা করে তার বিবেক, তার মূল্যবোধ, তার অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচার ক্ষমতা, তার ভালো-মন্দ বিচার করার শক্তি। তাই প্রযুক্তির যুগে মানুষের আসল শক্তি শুধু সক্রিয়তা নয়, বরং সঠিক উদ্দেশ্যে সক্রিয় হওয়া।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আসলেই মানুষের বিকল্প হতে পারে?

অস্থির সময়ের মানসিকতা কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ

আজকের সমাজে দ্রুত সাফল্যের গল্প, হঠাৎ উত্থানের কাহিনি, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের রোমাঞ্চ—এসব এত বেশি প্রচারিত হচ্ছে যে, ধৈর্যশীল জীবন ক্রমশ অনাকর্ষণীয় হয়ে পড়ছে। স্থিরতা যেন পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ, ভাবনা যেন সময় নষ্ট, আর সতর্কতা যেন দুর্বলতার আরেক নাম। এই সামাজিক আবহ মানুষকে এমন এক দৌড়ে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে গন্তব্যের চেয়ে গতি বড় হয়ে উঠছে।

কিন্তু সমাজ যদি শুধু ব্যক্তিগত ঝাঁপিয়ে পড়াকে পুরস্কৃত করতে থাকে, তাহলে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ তখন নিজের সাফল্যের দিকে তাকায়, কিন্তু সেই সাফল্যের সামাজিক মূল্য নিয়ে ভাবতে চায় না। এতে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, নাগরিক দায়িত্ব—সবকিছুর ভেতরে ধীরে ধীরে ভাঙন তৈরি হতে পারে। কারণ একটি সমাজ শুধু সাহসী ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব, আস্থা এবং সংযমের ওপরও।

এই জন্যই আজকের সময়কে শুধু উচ্চাভিলাষের সময় বললে ভুল হবে। এটি একইসঙ্গে বিভ্রান্তিরও সময়। এখানে মানুষ স্বাধীন হতে চায়, কিন্তু দিশা হারাচ্ছে। শক্তিশালী হতে চায়, কিন্তু দায়িত্বের ভার নিতে সবসময় প্রস্তুত নয়। সামনে যেতে চায়, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে নিশ্চিত নয়।

শেষ প্রশ্ন: শুধু করার ক্ষমতা, নাকি ভালোভাবে বাঁচার জ্ঞান

সব মিলিয়ে যে ছবিটি স্পষ্ট হয়, তা হলো—আজ আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে মানুষকে বারবার শেখানো হচ্ছে, তোমার ক্ষমতা আছে, তোমার গতি আছে, তুমি চাইলেই সব করতে পারো। এই আহ্বানের মধ্যে অবশ্যই এক ধরনের শক্তি আছে। এটি মানুষকে স্থবিরতা থেকে বের করে আনে, ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, নিজেকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে।

কিন্তু জীবনকে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষমতার পরীক্ষাগার বানিয়ে ফেললে চলবে না। মানুষ কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়ার যন্ত্র নয়। মানুষ এমন এক সত্তা, যে নিজের জীবনের পাশাপাশি অন্যের জীবন, সমাজের ভারসাম্য এবং নৈতিকতার প্রশ্নও বহন করে। তাই কেবল ‘আমি পারি’ বলাই যথেষ্ট নয়। আরও জরুরি হলো, ‘আমি কী করছি’, ‘কেন করছি’, এবং ‘এতে শুধু আমার নয়, অন্যেরও মঙ্গল হচ্ছে কি না’—এই প্রশ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখা।

সময়ের নতুন এই মানসিকতাকে তাই অন্ধভাবে উদযাপন করার আগে থেমে ভাবা দরকার। কারণ ঝুঁকি নেওয়া সবসময় সাহস নয়, দ্রুত এগোনো সবসময় প্রজ্ঞা নয়, আর কার্যক্ষমতা সবসময় নৈতিকতা নয়। শেষ পর্যন্ত মানুষকে টিকিয়ে রাখে শুধু তার দৌড় নয়, তার দিশাও।

জনপ্রিয় সংবাদ

চাকার ঘর, পথে পরিবার: আরামে ঘোরা যাবে, তবে না জেনে উঠলেই বাড়বে বিপদ

ঝুঁকির নেশায় বদলে যাওয়া সময়, ‘আমি পারি’ মানসিকতার উত্থান আর নৈতিকতার হারিয়ে যাওয়া দিশা

০১:০০:৩৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

আমাদের সময়টা যেন অদ্ভুত এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে এখন এমন এক মানসিকতার জয়জয়কার, যেখানে মনে করা হচ্ছে—চাইলেই সব সম্ভব, নিয়ম মানা দুর্বলতার লক্ষণ, আর দ্রুত সিদ্ধান্তই সাফল্যের একমাত্র রাস্তা। জীবন, কাজ, সম্পর্ক, পেশা, এমনকি ভবিষ্যৎ—সবকিছু যেন এক ধরনের ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। এই নতুন ভাবনার কেন্দ্রে আছে এমন এক বিশ্বাস, যা মানুষকে বলছে, থেমে থাকো না, অপেক্ষা করো না, পরিস্থিতির কাছে মাথা নত করো না—নিজেই পথ বানাও, নিজেই নিয়ম লেখো, নিজেই নিজের ভাগ্য তৈরি করো। কিন্তু এই ঝলমলে আহ্বানের আড়ালেই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে আরেকটি জরুরি প্রশ্ন। সবকিছু করার ক্ষমতা থাকলেই কি মানুষ সঠিক পথে থাকে, নাকি কাজের পাশাপাশি দরকার তার নৈতিক অর্থও।

সময়ের নতুন মন্ত্র: থেমে নয়, ভেঙে এগিয়ে যাও

কিছুদিন আগেও সাফল্যের চেনা সংজ্ঞা ছিল অপেক্ষাকৃত স্থির। মানুষ ধীরে ধীরে এগোবে, পড়াশোনা করবে, চাকরি করবে, সঞ্চয় গড়বে, অভিজ্ঞতা বাড়াবে, তারপর বড় সিদ্ধান্ত নেবে। জীবনকে একটি দীর্ঘপথের যাত্রা হিসেবে ভাবা হতো, যেখানে ধৈর্য, সংযম আর প্রস্তুতির মূল্য ছিল সবচেয়ে বেশি। এখন সেই ছবিটা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

নতুন প্রজন্মের এক বড় অংশের কাছে আজ জীবনের পুরোনো ছক আর তেমন আকর্ষণীয় নয়। বরং আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে এমন এক মানসিকতার প্রতি, যা বলে—অপেক্ষা করার কিছু নেই, যোগ্যতার সার্টিফিকেটেরও দরকার নেই, অনুমতিরও প্রয়োজন নেই; নিজের সাহস, গতি আর সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। চাকরি ছেড়ে নতুন কিছু শুরু করা, অচেনা শহরে চলে যাওয়া, বহুদিনের বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে পড়া, এমনকি প্রচলিত সাফল্যের পথকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করাও এখন অনেকের চোখে আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।

এই ভাবনাকে তাই কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির ভাষা হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এক ধরনের জীবনদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এখানে স্থিরতা নয়, গতি বড় কথা। নিয়ম মানা নয়, নিয়ম প্রশ্ন করা বড় কথা। অপেক্ষা নয়, ঝুঁকি নেওয়াই যেন সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত গুণ।

Opinion | All the Worst People Seem to Want to Be 'High Agency' - The New  York Times

কেন এই মানসিকতা এখন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে

এই প্রবণতার পেছনে কেবল ফ্যাশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত অনিশ্চয়তা। মানুষ দেখছে, বহু বছরের পরিশ্রম সবসময় নিশ্চিন্ত জীবন এনে দেয় না। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও অনেকে কাজ পাচ্ছে না। কাজ পেলেও স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা নেই। বাড়ির দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে। পরিশ্রম আর প্রাপ্তির সম্পর্কও ক্রমশ অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় ধীরে এগোনোর পুরোনো উপদেশ অনেকের কাছেই ফাঁপা শোনায়। যখন দীর্ঘ পরিকল্পনাও অনিশ্চিত, তখন অনেকেই ভাবছেন—তাহলে ঝুঁকিই বা নেব না কেন। যখন নিশ্চিত পথে চলেও নিরাপত্তা মিলছে না, তখন অনিশ্চিত পথে দ্রুত দৌড়ানোর মধ্যেই যেন এক ধরনের মানসিক মুক্তি পাওয়া যায়।

এই কারণেই নতুন এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা আজ এত সহজে মানুষের ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছে। এটি শুধু সাফল্যের প্রতিশ্রুতি দেয় না, এটি হতাশ মানুষকে ক্ষমতার অনুভূতিও দেয়। বলে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, শেষ কথা এখনও তোমার।

ক্ষমতার ভাষা, কিন্তু সবার জন্য সমান নয়

তবু এই দর্শনের ভিত যতই শক্তিশালী বলে মনে হোক, এর মধ্যে একটি বড় অসমতা লুকিয়ে আছে। বাস্তবে সব মানুষ একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করে না। কারও হাতে সঞ্চয় আছে, পারিবারিক নিরাপত্তা আছে, ব্যর্থ হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর অবকাশ আছে। আবার এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের জন্য একটি ভুল সিদ্ধান্তই পুরো জীবনকে টলিয়ে দিতে পারে।

তাই ঝুঁকি নেওয়ার পরামর্শ শুনতে যত আকর্ষণীয়, বাস্তবে তা সবার জন্য সমান প্রযোজ্য নয়। যে মানুষ খারাপ ঋণ, অনিশ্চিত আয় আর সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে বেঁচে আছেন, তার জন্য হঠাৎ বড় ঝুঁকি নেওয়া রোমাঞ্চ নয়, বরং বিপদও হতে পারে। এখানেই নতুন এই মানসিকতার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটি মানুষকে শক্তিশালী হওয়ার ভাষা দিলেও অনেক সময় সামাজিক বাস্তবতার জটিলতাকে আড়াল করে ফেলে।

অর্থাৎ, ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু সেই ইচ্ছাশক্তি কখন কার্যকর হবে, কে তা কাজে লাগাতে পারবে, আর কার পক্ষে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে—এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে পুরো আলোচনাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

Opinion | All the Worst People Seem to Want to Be 'High Agency' | Raman Frey

সাহস, আত্মবিশ্বাস আর নৈতিকতার সূক্ষ্ম ফারাক

নতুন এই চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো, এটি কর্মকে মহিমান্বিত করে, কিন্তু কর্মের নৈতিক উদ্দেশ্যকে প্রায়ই পাশ কাটিয়ে যায়। কিছু করা, দ্রুত করা, দেরি না করা—এসবকে গুণ হিসেবে সামনে আনা হয়। কিন্তু কী করা হচ্ছে, কেন করা হচ্ছে, তার সামাজিক ফল কী হতে পারে, অন্যের ওপর তার প্রভাব কতটা—এসব প্রশ্ন অনেক সময় অনুপস্থিত থাকে।

একসময় যে শব্দগুলোকে আমরা মূল্যবান বলে ভাবতাম—সাহস, বিবেক, নৈতিক দৃঢ়তা, দায়িত্ববোধ—সেগুলোর জায়গা যেন এখন কেবল কার্যক্ষমতা দখল করে নিচ্ছে। ফলে এমন এক সময় তৈরি হচ্ছে, যেখানে মানুষ কাজকে বিচার করছে তার গতি দিয়ে, উদ্দেশ্য দিয়ে নয়। অথচ কাজের প্রকৃত মূল্য তো সেখানেই, যেখানে তা শুধু ব্যক্তিগত লাভে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বৃহত্তর কল্যাণের দিকেও তাকায়।

এই কারণেই ‘আমি পারি’ ধরনের চেতনা যতই তীক্ষ্ণ ও প্রাণবন্ত শোনাক, তার ভেতরে একটি বিপজ্জনক ফাঁক রয়ে যায়। কারণ ক্ষমতা আছে মানেই যে তা সঠিক কাজে ব্যবহৃত হবে, এমন তো নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি এবং ন্যায়ের বোধ এক জিনিস নয়। একটিতে গতি আছে, অন্যটিতে দিশা আছে। আর দিশাহীন গতি শেষ পর্যন্ত ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষের নতুন উৎকণ্ঠা

এই মানসিকতার পেছনে প্রযুক্তির প্রভাবও প্রবল। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। মানুষ এখন আশঙ্কা করছে, যেসব কাজ এতদিন দক্ষতা হিসেবে মূল্য পেয়েছে, তার বড় অংশই যন্ত্রের হাতে চলে যেতে পারে। এই ভয় থেকেই অনেকের কাছে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তক্ষমতা, দ্রুত অভিযোজন এবং নিজে কিছু শুরু করার মানসিকতা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে।

কিন্তু এখানেও এক ধরনের গভীর বিদ্রূপ আছে। মানুষ যে গুণকে নিজের শেষ আশ্রয় ভাবছে, সেই কাজ করবার ক্ষমতাকেই এখন যন্ত্রের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হচ্ছে। যন্ত্রও কাজ করছে, নির্দেশ পালন করছে, একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে। অর্থাৎ কেবল কাজ করতে পারা, দ্রুত সাড়া দিতে পারা, অবিরাম সক্রিয় থাকা—এসবই যদি শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে মানুষ আর যন্ত্রের ফারাক কোথায় দাঁড়াবে?

মানুষকে আলাদা করে শুধু তার কর্মক্ষমতা নয়। মানুষকে আলাদা করে তার বিবেক, তার মূল্যবোধ, তার অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে বাঁচার ক্ষমতা, তার ভালো-মন্দ বিচার করার শক্তি। তাই প্রযুক্তির যুগে মানুষের আসল শক্তি শুধু সক্রিয়তা নয়, বরং সঠিক উদ্দেশ্যে সক্রিয় হওয়া।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আসলেই মানুষের বিকল্প হতে পারে?

অস্থির সময়ের মানসিকতা কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ

আজকের সমাজে দ্রুত সাফল্যের গল্প, হঠাৎ উত্থানের কাহিনি, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের রোমাঞ্চ—এসব এত বেশি প্রচারিত হচ্ছে যে, ধৈর্যশীল জীবন ক্রমশ অনাকর্ষণীয় হয়ে পড়ছে। স্থিরতা যেন পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ, ভাবনা যেন সময় নষ্ট, আর সতর্কতা যেন দুর্বলতার আরেক নাম। এই সামাজিক আবহ মানুষকে এমন এক দৌড়ে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে গন্তব্যের চেয়ে গতি বড় হয়ে উঠছে।

কিন্তু সমাজ যদি শুধু ব্যক্তিগত ঝাঁপিয়ে পড়াকে পুরস্কৃত করতে থাকে, তাহলে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ তখন নিজের সাফল্যের দিকে তাকায়, কিন্তু সেই সাফল্যের সামাজিক মূল্য নিয়ে ভাবতে চায় না। এতে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, নাগরিক দায়িত্ব—সবকিছুর ভেতরে ধীরে ধীরে ভাঙন তৈরি হতে পারে। কারণ একটি সমাজ শুধু সাহসী ব্যক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব, আস্থা এবং সংযমের ওপরও।

এই জন্যই আজকের সময়কে শুধু উচ্চাভিলাষের সময় বললে ভুল হবে। এটি একইসঙ্গে বিভ্রান্তিরও সময়। এখানে মানুষ স্বাধীন হতে চায়, কিন্তু দিশা হারাচ্ছে। শক্তিশালী হতে চায়, কিন্তু দায়িত্বের ভার নিতে সবসময় প্রস্তুত নয়। সামনে যেতে চায়, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে নিশ্চিত নয়।

শেষ প্রশ্ন: শুধু করার ক্ষমতা, নাকি ভালোভাবে বাঁচার জ্ঞান

সব মিলিয়ে যে ছবিটি স্পষ্ট হয়, তা হলো—আজ আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে মানুষকে বারবার শেখানো হচ্ছে, তোমার ক্ষমতা আছে, তোমার গতি আছে, তুমি চাইলেই সব করতে পারো। এই আহ্বানের মধ্যে অবশ্যই এক ধরনের শক্তি আছে। এটি মানুষকে স্থবিরতা থেকে বের করে আনে, ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়, নিজেকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে।

কিন্তু জীবনকে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষমতার পরীক্ষাগার বানিয়ে ফেললে চলবে না। মানুষ কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়ার যন্ত্র নয়। মানুষ এমন এক সত্তা, যে নিজের জীবনের পাশাপাশি অন্যের জীবন, সমাজের ভারসাম্য এবং নৈতিকতার প্রশ্নও বহন করে। তাই কেবল ‘আমি পারি’ বলাই যথেষ্ট নয়। আরও জরুরি হলো, ‘আমি কী করছি’, ‘কেন করছি’, এবং ‘এতে শুধু আমার নয়, অন্যেরও মঙ্গল হচ্ছে কি না’—এই প্রশ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখা।

সময়ের নতুন এই মানসিকতাকে তাই অন্ধভাবে উদযাপন করার আগে থেমে ভাবা দরকার। কারণ ঝুঁকি নেওয়া সবসময় সাহস নয়, দ্রুত এগোনো সবসময় প্রজ্ঞা নয়, আর কার্যক্ষমতা সবসময় নৈতিকতা নয়। শেষ পর্যন্ত মানুষকে টিকিয়ে রাখে শুধু তার দৌড় নয়, তার দিশাও।