০৫:১০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
রংপুরে চিনাবাদাম চাষে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাম্পার ফলন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সংস্কার অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের মতো অপরিহার্য যুদ্ধবিরতির পর রুশ তেলে নিষেধাজ্ঞা পুনঃআরোপের দাবি জেলেনস্কির বগুড়ায় ভুয়া ভোটের ভিডিও ভাইরাল, প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন বলে জানিয়েছে বাংলাফ্যাক্ট অস্ট্রেলিয়ার স্পিকারের ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সফর, ১২৫ বছরে প্রথম বিশ্বব্যাংক: বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশ, টানা তৃতীয় বছর দারিদ্র্য বাড়ছে ফার্মগেটে বাস-সিএনজি সংঘর্ষে চালক নিহত, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ ঢাকায় ২৪ ঘণ্টায় চার লাশ উদ্ধার, একজন ঝুলন্ত অবস্থায় মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপন বিল পাস, দান সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল সংসদে শ্রম আইন সংশোধনী বিল পাস, ছাঁটাই ক্ষতিপূরণ ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারে বড় পরিবর্তন

আমেরিকার ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন “সোনালি যুগ”-এর কথা বলেছেন। আপাতত সংঘাত থেমে আছে। হোয়াইট হাউসের আচরণ অনিশ্চিত হওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা কঠিন, তবু অন্তত এই মুহূর্তে লড়াই আবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু না-ও হতে পারে।

এই বিরতিটাই বড় বিষয়। দীর্ঘ যুদ্ধ শুধু অঞ্চলের জন্য নয়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করত ওয়াশিংটনের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন যতই কড়া ভাষায় কথা বলুক, দীর্ঘ অনিশ্চয়তা আর কৌশলগত ঝুঁকি নিয়ে তারা কখনোই স্বস্তিতে ছিল না। হুমকি দেওয়া এক বিষয়, আর সেই হুমকি ব্যর্থ হলে তার পরিণতি বহন করা আরেক বিষয়।

যুদ্ধবিরতির শর্ত এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, এমনও হতে পারে যে সব বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটেছে।

শুরুর দিকে যে বড় বড় লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, তার কোনোটিই পূরণ হয়নি। ট্রাম্পের উচ্চকিত “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ”-এর দাবি এখন কৌশলগত নীতির চেয়ে রাজনৈতিক নাটক বলেই বেশি মনে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাটকীয়তার আড়ালে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক বাস্তববাদী পথই বেছে নিয়েছে—চাপ দিয়ে ফল না এলে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সরে আসা ভালো।

Ceasefire Illusion - The Statesman

যুদ্ধবিরতির আগে উত্তপ্ত ভাষা ব্যবহারও ছিল একটি রাজনৈতিক কৌশল। এতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যেন ভয়াবহ বিপর্যয় আসন্ন। ফলে সংঘাতের সামান্য বিরতিকেও পরে স্বস্তি ও সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয়। এখন হোয়াইট হাউস সেই সংযমকেই বিজয় হিসেবে দেখাতে চাইবে।

এই সংঘাত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চলমান পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এটি সেই পরিবর্তনের শেষ ধাপ নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াইয়েরও শেষ অধ্যায় নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, ইরান টিকে থাকার ক্ষমতা দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি অভিযানের মূল ধারণা ছিল, যথেষ্ট শক্তিশালী আঘাত হানতে পারলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে হয় ভেঙে ফেলা যাবে, নয়তো নতি স্বীকারে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু ইরান সেই ধারণাকেই দুর্বল করে দিয়েছে।

প্রচলিত সামরিক মানদণ্ডে ইরানের জবাব হয়তো খুব চমকপ্রদ ছিল না, কিন্তু তা কার্যকর ছিল। তারা উত্তেজনার ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে এবং বুঝিয়ে দিয়েছে, সংঘাত বাড়লে তার মূল্য শুধু সামরিক লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিপক্ষকে শুধু ইরানের প্রতিশোধ নয়, পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকেও হিসাবের মধ্যে আনতে হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | USA News | USA news today | কালবেলা

এখানেই মূল পার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সহনশীলতার সীমা রয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে ইতিহাস বলছে, সেই সহনশীলতা তুলনায় অনেক বেশি।

ইরানপন্থী জোটও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিশীল প্রমাণিত হয়েছে। গত দুই বছরে ইসরায়েল তাদের মারাত্মক ক্ষতি করলেও লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে ইরানঘনিষ্ঠ শক্তিগুলো এখনও কৌশলগত বাস্তবতা। তারা প্রত্যক্ষভাবে নাও নামুক, কিন্তু উত্তেজনা বাড়িয়ে আক্রমণকারীদের সব সময় চাপের মধ্যে রেখেছে।

ফলে ইরানের প্রভাব নিস্ক্রিয় করার বৃহত্তর পরিকল্পনাই উল্টো ফল দিয়েছে। ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি। কোনো সমঝোতা ইরানের শর্তে হতে হবে—তেহরানের এই দাবির মধ্যে দর-কষাকষির কৌশল থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যে মাত্রায় ইরানের প্রভাব কমে যাবে ভেবেছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি।

এখন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা এড়ানোর উপায় নেই। আসল প্রশ্ন হলো, ইরান নিজে কী চায়।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়ানোর তাদের আগের কৌশল অঞ্চলটির বহু সংকটকে আরও জটিল করেছে। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে—ইরানের লক্ষ্য আসলে কী, এবং সে লক্ষ্য পূরণে তারা কতদূর যেতে প্রস্তুত? একই সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরেও নতুন এক পর্যায় শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা আরও বেশি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের দিকে সরে যাচ্ছে। সেই নেতৃত্বকে এখন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য করতে হবে।

যুদ্ধবিরতির পর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের নতুন ঘোষণা

অঞ্চলজুড়ে এর প্রভাবও গভীর।

উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো একটি কঠিন শিক্ষা পেয়েছে। পুরোনো সেই স্বস্তিদায়ক সমীকরণে আর ফেরা যাবে না, যেখানে অর্থ ও আনুগত্যের বিনিময়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি ওয়াশিংটনের হাতে ছেড়ে দেওয়া যেত। শীতল যুদ্ধের পর থেকে যে ব্যবস্থার ওপর এই অঞ্চল অনেকটা দাঁড়িয়ে ছিল, তা এখন গুরুতরভাবে নড়ে গেছে।

প্রকাশ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো হয়তো খুব নাটকীয় কিছু করবে না। কিন্তু নীরবে তারা নতুন নিরাপত্তা ভরসা ও নতুন অংশীদার খোঁজার কাজ জোরদার করবে। তাদের হিসাব-নিকাশে চীন, দক্ষিণ এশিয়া, রাশিয়া এবং কিছুটা কম মাত্রায় পশ্চিম ইউরোপের গুরুত্ব বাড়বে।

এর মানে এই নয় যে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের প্রাধান্য মেনে নেবে। পারস্য উপসাগরে তেহরানের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব বা হরমুজ প্রণালিতে শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তারা মেনে নেবে না। ফলে তাদের নীতি আরও জটিল হবে—যেখানে সম্ভব ইরানকে নিয়ন্ত্রণ, আর যেখানে প্রয়োজন সেখানে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা।

অন্যদিকে ইসরায়েলও তার ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। বিজয়ের কথা যত জোরেই বলা হোক, মূল কৌশলগত বাস্তবতা বদলায়নি। ইরান এখনও একটি নির্ধারক উপাদান। তাকে সরানো যায়নি, এমনকি ইসরায়েলের প্রকৃত নিরাপত্তাবোধ ফেরাতে পারে—এমন মাত্রায়ও দুর্বল করা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাব এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। ট্রাম্পের আত্মপ্রশংসা ইতোমধ্যেই কিছুটা ফাঁপা শোনাচ্ছে। তবে অনেক কিছু নির্ভর করবে অর্থনীতির ওপর। তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকলে হোয়াইট হাউস দ্রুত এই অধ্যায় পেরিয়ে যেতে চাইবে এবং বলবে, ট্রাম্পের নেতৃত্বেই বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে। এতে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের লাভ হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পূর্ণ  করেছেন। | ডিডি নিউজ অন এয়ার

তবু ট্রাম্পের একটি প্রবৃত্তি আছে, যা তার সমালোচকেরা প্রায়ই খাটো করে দেখেন—তিনি ধাক্কা সামলে নিয়ে ঘটনাকে নতুনভাবে তুলে ধরতে পারেন।

কিন্তু বড় উপসংহারটি ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিরাট শক্তিধর। তার সামরিক উপস্থিতি, আর্থিক প্রভাব এবং বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা এখনও প্রবল। কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। আমেরিকা এখনও প্রভাব ফেলতে পারে, তবে যেকোনো মূল্যে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে না।

এই শিক্ষা এখন শুধু তেহরানেই নয়, আরও বহু জায়গায় পৌঁছে গেছে। মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয়েই নিজেদের মতো করে এই ঘটনার অর্থ বের করবে। ইরান হয়তো একটি বিশেষ ক্ষেত্র, কিন্তু একটি নজির ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে অন্য এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। সেখানে বলপ্রয়োগ আগের মতো চূড়ান্ত নির্ধারক নয়, আর আমেরিকার সর্বশক্তিমান ভূমিকা নিয়ে পুরোনো ধারণাগুলো ক্রমেই অচল হয়ে পড়ছে। ট্রাম্প হয়তো উদারপন্থী আমেরিকান নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বদলে যুক্তরাষ্ট্র-প্রাধান্যভিত্তিক আরেক ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গড়তে চান। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের ঘটনা অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্ব এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যা আর পুরোপুরি ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

জনপ্রিয় সংবাদ

রংপুরে চিনাবাদাম চাষে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাম্পার ফলন

আমেরিকার ক্ষমতার সীমা স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত

০৩:৩০:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন “সোনালি যুগ”-এর কথা বলেছেন। আপাতত সংঘাত থেমে আছে। হোয়াইট হাউসের আচরণ অনিশ্চিত হওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা কঠিন, তবু অন্তত এই মুহূর্তে লড়াই আবার সঙ্গে সঙ্গে শুরু না-ও হতে পারে।

এই বিরতিটাই বড় বিষয়। দীর্ঘ যুদ্ধ শুধু অঞ্চলের জন্য নয়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করত ওয়াশিংটনের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন যতই কড়া ভাষায় কথা বলুক, দীর্ঘ অনিশ্চয়তা আর কৌশলগত ঝুঁকি নিয়ে তারা কখনোই স্বস্তিতে ছিল না। হুমকি দেওয়া এক বিষয়, আর সেই হুমকি ব্যর্থ হলে তার পরিণতি বহন করা আরেক বিষয়।

যুদ্ধবিরতির শর্ত এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, এমনও হতে পারে যে সব বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটেছে।

শুরুর দিকে যে বড় বড় লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, তার কোনোটিই পূরণ হয়নি। ট্রাম্পের উচ্চকিত “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ”-এর দাবি এখন কৌশলগত নীতির চেয়ে রাজনৈতিক নাটক বলেই বেশি মনে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাটকীয়তার আড়ালে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত তুলনামূলক বাস্তববাদী পথই বেছে নিয়েছে—চাপ দিয়ে ফল না এলে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সরে আসা ভালো।

Ceasefire Illusion - The Statesman

যুদ্ধবিরতির আগে উত্তপ্ত ভাষা ব্যবহারও ছিল একটি রাজনৈতিক কৌশল। এতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল, যেন ভয়াবহ বিপর্যয় আসন্ন। ফলে সংঘাতের সামান্য বিরতিকেও পরে স্বস্তি ও সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয়। এখন হোয়াইট হাউস সেই সংযমকেই বিজয় হিসেবে দেখাতে চাইবে।

এই সংঘাত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চলমান পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে এটি সেই পরিবর্তনের শেষ ধাপ নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াইয়েরও শেষ অধ্যায় নয়।

সবচেয়ে বড় কথা, ইরান টিকে থাকার ক্ষমতা দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি অভিযানের মূল ধারণা ছিল, যথেষ্ট শক্তিশালী আঘাত হানতে পারলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে হয় ভেঙে ফেলা যাবে, নয়তো নতি স্বীকারে বাধ্য করা যাবে। কিন্তু ইরান সেই ধারণাকেই দুর্বল করে দিয়েছে।

প্রচলিত সামরিক মানদণ্ডে ইরানের জবাব হয়তো খুব চমকপ্রদ ছিল না, কিন্তু তা কার্যকর ছিল। তারা উত্তেজনার ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে এবং বুঝিয়ে দিয়েছে, সংঘাত বাড়লে তার মূল্য শুধু সামরিক লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রতিপক্ষকে শুধু ইরানের প্রতিশোধ নয়, পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকেও হিসাবের মধ্যে আনতে হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | USA News | USA news today | কালবেলা

এখানেই মূল পার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সহনশীলতার সীমা রয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে ইতিহাস বলছে, সেই সহনশীলতা তুলনায় অনেক বেশি।

ইরানপন্থী জোটও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিশীল প্রমাণিত হয়েছে। গত দুই বছরে ইসরায়েল তাদের মারাত্মক ক্ষতি করলেও লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে ইরানঘনিষ্ঠ শক্তিগুলো এখনও কৌশলগত বাস্তবতা। তারা প্রত্যক্ষভাবে নাও নামুক, কিন্তু উত্তেজনা বাড়িয়ে আক্রমণকারীদের সব সময় চাপের মধ্যে রেখেছে।

ফলে ইরানের প্রভাব নিস্ক্রিয় করার বৃহত্তর পরিকল্পনাই উল্টো ফল দিয়েছে। ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি। কোনো সমঝোতা ইরানের শর্তে হতে হবে—তেহরানের এই দাবির মধ্যে দর-কষাকষির কৌশল থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যে মাত্রায় ইরানের প্রভাব কমে যাবে ভেবেছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি।

এখন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা এড়ানোর উপায় নেই। আসল প্রশ্ন হলো, ইরান নিজে কী চায়।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বাড়ানোর তাদের আগের কৌশল অঞ্চলটির বহু সংকটকে আরও জটিল করেছে। তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে—ইরানের লক্ষ্য আসলে কী, এবং সে লক্ষ্য পূরণে তারা কতদূর যেতে প্রস্তুত? একই সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরেও নতুন এক পর্যায় শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা আরও বেশি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের দিকে সরে যাচ্ছে। সেই নেতৃত্বকে এখন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য করতে হবে।

যুদ্ধবিরতির পর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের নতুন ঘোষণা

অঞ্চলজুড়ে এর প্রভাবও গভীর।

উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো একটি কঠিন শিক্ষা পেয়েছে। পুরোনো সেই স্বস্তিদায়ক সমীকরণে আর ফেরা যাবে না, যেখানে অর্থ ও আনুগত্যের বিনিময়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি ওয়াশিংটনের হাতে ছেড়ে দেওয়া যেত। শীতল যুদ্ধের পর থেকে যে ব্যবস্থার ওপর এই অঞ্চল অনেকটা দাঁড়িয়ে ছিল, তা এখন গুরুতরভাবে নড়ে গেছে।

প্রকাশ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো হয়তো খুব নাটকীয় কিছু করবে না। কিন্তু নীরবে তারা নতুন নিরাপত্তা ভরসা ও নতুন অংশীদার খোঁজার কাজ জোরদার করবে। তাদের হিসাব-নিকাশে চীন, দক্ষিণ এশিয়া, রাশিয়া এবং কিছুটা কম মাত্রায় পশ্চিম ইউরোপের গুরুত্ব বাড়বে।

এর মানে এই নয় যে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের প্রাধান্য মেনে নেবে। পারস্য উপসাগরে তেহরানের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব বা হরমুজ প্রণালিতে শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তারা মেনে নেবে না। ফলে তাদের নীতি আরও জটিল হবে—যেখানে সম্ভব ইরানকে নিয়ন্ত্রণ, আর যেখানে প্রয়োজন সেখানে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা।

অন্যদিকে ইসরায়েলও তার ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। বিজয়ের কথা যত জোরেই বলা হোক, মূল কৌশলগত বাস্তবতা বদলায়নি। ইরান এখনও একটি নির্ধারক উপাদান। তাকে সরানো যায়নি, এমনকি ইসরায়েলের প্রকৃত নিরাপত্তাবোধ ফেরাতে পারে—এমন মাত্রায়ও দুর্বল করা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাব এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। ট্রাম্পের আত্মপ্রশংসা ইতোমধ্যেই কিছুটা ফাঁপা শোনাচ্ছে। তবে অনেক কিছু নির্ভর করবে অর্থনীতির ওপর। তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকলে হোয়াইট হাউস দ্রুত এই অধ্যায় পেরিয়ে যেতে চাইবে এবং বলবে, ট্রাম্পের নেতৃত্বেই বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে। এতে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের লাভ হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পূর্ণ  করেছেন। | ডিডি নিউজ অন এয়ার

তবু ট্রাম্পের একটি প্রবৃত্তি আছে, যা তার সমালোচকেরা প্রায়ই খাটো করে দেখেন—তিনি ধাক্কা সামলে নিয়ে ঘটনাকে নতুনভাবে তুলে ধরতে পারেন।

কিন্তু বড় উপসংহারটি ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিরাট শক্তিধর। তার সামরিক উপস্থিতি, আর্থিক প্রভাব এবং বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা এখনও প্রবল। কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। আমেরিকা এখনও প্রভাব ফেলতে পারে, তবে যেকোনো মূল্যে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে না।

এই শিক্ষা এখন শুধু তেহরানেই নয়, আরও বহু জায়গায় পৌঁছে গেছে। মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয়েই নিজেদের মতো করে এই ঘটনার অর্থ বের করবে। ইরান হয়তো একটি বিশেষ ক্ষেত্র, কিন্তু একটি নজির ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে অন্য এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। সেখানে বলপ্রয়োগ আগের মতো চূড়ান্ত নির্ধারক নয়, আর আমেরিকার সর্বশক্তিমান ভূমিকা নিয়ে পুরোনো ধারণাগুলো ক্রমেই অচল হয়ে পড়ছে। ট্রাম্প হয়তো উদারপন্থী আমেরিকান নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার বদলে যুক্তরাষ্ট্র-প্রাধান্যভিত্তিক আরেক ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গড়তে চান। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের ঘটনা অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্ব এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যা আর পুরোপুরি ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।