বাংলাদেশে যক্ষ্মা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, আর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা এখন শিশু। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশে যক্ষ্মা রোগী শনাক্তের হার কমছে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই পতন আরও বেশি। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, শনাক্ত কমে যাওয়া মানেই রোগ কমে যাওয়া নয়; বরং এটি সেবা ও নজরদারির দুর্বলতার ইঙ্গিত।
শিশুদের মধ্যে বিপজ্জনক সংকেত
সাধারণভাবে দেশে মোট যক্ষ্মা রোগীর প্রায় ১০ শতাংশ শিশু হওয়ার কথা থাকলেও এখন শনাক্ত হচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে শিশু রোগী শনাক্ত নেমে এসেছে মাত্র ২ হাজার ৯৯৫-এ, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম। এই পতন বিশেষজ্ঞদের মতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এতে বোঝা যায় অনেক শিশু রোগী শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শিশুদের ক্ষেত্রে যক্ষ্মা দ্রুত শনাক্ত না হলে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। তাই শিশুদের জন্য আলাদা গুরুত্ব দিয়ে স্ক্রিনিং ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

শনাক্ত কমছে, কিন্তু ঝুঁকি বাড়ছে
দেশে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে জাতীয় কেস নোটিফিকেশন রেট নেমে এসেছে ১৬৯-এ, যা আগের দুই বছরের তুলনায় কম। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি প্রকৃতপক্ষে রোগ কমার লক্ষণ নয়; বরং শনাক্তকরণ ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতির ইঙ্গিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি লাখে প্রায় ১২১ জন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয় এবং বছরে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ এই রোগে ভোগেন। বছরে প্রায় ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এই রোগে।
অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় সংকট
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে বড় ধাক্কা এসেছে অর্থায়ন ও প্রশাসনিক জটিলতায়। দীর্ঘদিনের অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওষুধ ও কিট কেনায় ধীরগতি দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় ওষুধের মজুত শেষ হয়ে গেছে এবং ল্যাব কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া জনবল সংকট, মাঠপর্যায়ের দুর্বলতা এবং রিপোর্টিং ঘাটতির কারণে রোগী শনাক্তে ভাটা পড়েছে, যা ভবিষ্যতে সংক্রমণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক সতর্কতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, যক্ষ্মা এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। সংস্থাটি বলছে, দ্রুত শনাক্ত, পূর্ণ চিকিৎসা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে রোগী খোঁজা—এই তিনটি পদক্ষেপই যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো উচ্চ ঝুঁকির দেশগুলোতে এই কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে স্ক্রিনিং বাড়ানো, শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে শনাক্ত করা, ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
দীর্ঘদিনের সাফল্যের পর যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এখন নতুন করে চাপে পড়েছে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















