শান্তিনিকেতনের শান্ত পরিবেশে, যেখানে শিল্প, স্মৃতি ও ইতিহাস পাশাপাশি অবস্থান করে, সেখানেই উঠে এসেছে এক অস্বাভাবিক ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় ৮৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সুপ্রবুদ্ধ সেন হঠাৎই নিজেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে দেখতে পেলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর ৮২ বছর বয়সী স্ত্রী দীপা সেন এবং ৫২ বছর ধরে কাজ করা গৃহকর্মী চক্রধর নায়েকের নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে ঘটনাটি একটি সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি বলে মনে হলেও, সুপ্রবুদ্ধ সেনের পরিচয় এটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। তিনি নন্দলাল বসুর নাতি—ভারতীয় আধুনিক শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং ভারতীয় সংবিধানের অলংকরণে যাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে।
নন্দলাল বসু শান্তিনিকেতনে তাঁর দলসহ সংবিধানের মূল পাণ্ডুলিপিতে শিল্পরূপ দিয়েছিলেন। তাঁর শিল্পে ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছিল। সেই ব্যক্তির নাতি আজ সেই সংবিধান নির্মিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন—এতে এক ধরনের গভীর বিদ্রূপ ফুটে উঠেছে।
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রবুদ্ধ সেন শান্ত স্বরে বলেন, সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় কর্মকর্তারা তাঁর বাড়িতে এসে নথি চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর মাধ্যমিক পরীক্ষার সনদ এবং পাসপোর্ট দেখিয়েছিলেন। কিন্তু কর্মকর্তারা জানান, তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই বয়সে পাসপোর্ট নবায়নের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একবার সরকার পাসপোর্ট দেওয়ার অর্থ কি নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়?
তিনি আরও বলেন, ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি একই ঠিকানায় ভোট দিয়ে আসছেন। কিন্তু এখন তাঁকে জানানো হচ্ছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই। এটি তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং বিভ্রান্তিকর।
এই ঘটনা শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং প্রায় তিন দশকের নাগরিক অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় একটি বড় ধাক্কা। এটি ভোটার তালিকার তথ্যের নির্ভুলতা এবং যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

এই পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন নন্দলাল বসুর উত্তরাধিকারকে সামনে রাখা হয়। তাঁর শিল্পকর্ম শুধু অলংকরণ ছিল না, বরং নাগরিকত্ব, ঐতিহ্য এবং জাতির ধারাবাহিকতার প্রতীক ছিল। সেই উত্তরাধিকারের একজন সদস্যকে আজ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হচ্ছে—এটি প্রশাসনিক ত্রুটির মানবিক দিকটিকে স্পষ্ট করে।
বর্তমানে সুপ্রবুদ্ধ সেন একটি অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছেন। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এ ধরনের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। তবে তাঁর বয়সে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া কঠিন বলেই মনে করছেন তিনি। যদিও তাঁর সন্তানরা তাঁকে বিষয়টি এগিয়ে নিতে উৎসাহ দিচ্ছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন নিজ থেকেই এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবে।
এদিকে, এই সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটও সামনে আসছে। পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় সর্বোচ্চ আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মালদায় ভোটার তালিকা সংশোধনের দায়িত্বে থাকা বিচারিক কর্মকর্তাদের ঘেরাও করার অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনায় আদালত কঠোর অবস্থান নেয় এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে জাতীয় তদন্ত সংস্থাকে দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। এটি স্পষ্ট করে যে বিষয়টি শুধুমাত্র স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ঘটনার মূল অভিযুক্ত আইনজীবী ও সাবেক প্রার্থী মোফাকরুল ইসলামকে বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা জানান, তিনি ওই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে একদিকে সুপ্রবুদ্ধ সেনের মতো বহু মানুষ নথি যাচাইয়ের জটিলতায় পড়ছেন, অন্যদিকে পুরো প্রক্রিয়া বিচারিক পর্যবেক্ষণের মুখে পড়েছে।
সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকার এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল, তা এখন উল্টো প্রবেশাধিকার, নির্ভুলতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
শান্তিনিকেতনে এটি একজন প্রবীণ নাগরিকের স্বীকৃতির লড়াই, আর মালদায় এটি বিচার বিভাগের নিরাপত্তার প্রশ্ন। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে চাপের মুখে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
অর্কময় দত্ত মজুমদার 



















