ভোটার তালিকা সংশোধনের পর আসামের কাচুটালি গ্রামের বহু মানুষ এখন দ্বিগুণ সংকটে পড়েছেন। আগে সরকারি জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন, আর এখন তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকেও মুছে দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁদের হাতে থাকা ভোটার পরিচয়পত্র কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা—তাঁদের নাগরিকত্বই কি প্রশ্নের মুখে পড়ছে?
ভোটাধিকার হারানোর যন্ত্রণা
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ভোটের দিনে কাচুটালির প্রায় ৩৫০ জন মানুষ দুইটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা আশা করছিলেন, হয়তো শেষ মুহূর্তে তাঁদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু তা আর হয়নি। এই কয়েকশো মানুষ আসলে তিনটি এলাকার দুই হাজারের বেশি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যাঁদের নাম নতুন ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
একই পরিবারের মধ্যে বৈপরীত্যও স্পষ্ট। বাবার নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে গেলেও ছেলের নাম অন্য এলাকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং সে ভোট দিতে পেরেছে। এতে পরিবারগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
রাজনীতি ও বাস্তবতার সংঘর্ষ
অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, শাসক দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে তাঁদের কোনও ক্ষতি হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, উচ্ছেদ অভিযানে তাঁদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে ভোটার তালিকা থেকেও নাম মুছে ফেলা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয়ও তাঁদের রক্ষা করতে পারেনি।
নদীভাঙনে উদ্বাস্তু থেকে ‘অবৈধ’ তকমা
এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ মূলত নদীভাঙনের শিকার। ব্রহ্মপুত্র নদ তাঁদের পূর্বপুরুষের গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁরা অন্য জায়গায় গিয়ে বসতি গড়েন। অনেকেই ১৯৮০-র দশকে জমি কিনে সেখানে বসবাস শুরু করেছিলেন এবং নিয়মিত করও দিয়েছেন। কিন্তু এখন সেই জমির কাগজপত্রকে অকার্যকর বলা হচ্ছে।
বর্তমানে প্রায় ৮০টি পরিবার একটি মসজিদের আশপাশে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। নিজেদের জমি ও ঘর হারিয়ে তাঁরা অনিশ্চিত জীবনে দিন কাটাচ্ছেন।
উচ্ছেদ অভিযান ও সহিংসতা
সরকারি জমি উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাচুটালিতে উচ্ছেদ শুরু হয়। পরে উচ্ছেদ হওয়া মানুষজন ফের জমিতে ঢোকার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ বাধে। পুলিশি গুলিতে দুইজন নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হন। এরপরও উচ্ছেদ অভিযান চলতে থাকে এবং শতাধিক পরিবারকে অস্থায়ী শিবিরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার প্রক্রিয়া
উচ্ছেদের পর অনেকেই একটি নোটিশ পান, যেখানে বলা হয় তাঁরা আর ওই এলাকার ‘বাসিন্দা’ নন, তাই তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হতে পারে। তাঁরা পুনরায় আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক জটিলতায় তাঁরা ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মত
আইনজীবীরা বলছেন, অবৈধ দখলের কারণে কাউকে উচ্ছেদ করা যেতে পারে, কিন্তু তার জন্য তাঁর ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া আইনসঙ্গত নয়। ভোটাধিকার সরাসরি নাগরিকত্বের সঙ্গে যুক্ত। তাই এই ধরনের সিদ্ধান্তকে অন্যায্য বলে মনে করছেন তাঁরা। প্রভাবিত মানুষদের আদালতে যাওয়ার অধিকার থাকলেও দারিদ্র্য ও অশিক্ষার কারণে অনেকেই তা করতে পারছেন না।
ডি-ভোটার আতঙ্ক ও নতুন বাস্তবতা
আসামে আগে থেকেই ‘সন্দেহভাজন ভোটার’ বা ডি-ভোটার নামে একটি শ্রেণি রয়েছে। বহু মানুষ এই তকমার কারণে ভোটাধিকার হারিয়েছেন। তবে কাচুটালির বাসিন্দারা বলছেন, তাঁরা কখনও ডি-ভোটার ছিলেন না। তবুও এখন তাঁদের ‘মুছে ফেলা ভোটার’ হিসেবে নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আশঙ্কা
এই পরিস্থিতিতে বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে—ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে ফেলা কি তাঁদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার প্রথম ধাপ? অনেকেই মনে করছেন, তাঁরা একদিকে গৃহহীন, অন্যদিকে অধিকারহীন হয়ে পড়েছেন। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
তাঁদের আশা, নতুন সরকার এলে হয়তো পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে এবং তাঁদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সেই আশাও অনিশ্চিত হয়ে রয়েছে।
Sarakhon Report 



















