মধ্যপ্রাচ্যে টানা এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে। শনিবার পাকিস্তানে এই আলোচনা শুরু হয় বলে জানায় ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। দুই দেশের প্রতিনিধিরা যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
আলোচনার ধরন নিয়ে অনিশ্চয়তা
এই আলোচনার প্রকৃতি এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সরাসরি আলোচনা হয়ে থাকলে, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটিই হবে দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মুখোমুখি বৈঠক।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পৃথক বৈঠক
শনিবারের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলাদাভাবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে মূল আলোচনায় অংশ নেন তারা। পাকিস্তান এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, বাড়ছে উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এবং হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
পাঁচ সপ্তাহের এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যদিও আপাতত যুদ্ধবিরতি রয়েছে, তবে তা খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই পরিস্থিতিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সংঘাতের পটভূমি
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এতে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা নিহত হন এবং দেশটির সরকারকে সরানোর আহ্বান জানানো হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান পাল্টা হামলা চালায়, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালীতে অবরোধ আরোপ করে, ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে টানাপোড়েন
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ পারস্য উপসাগরের এই প্রণালী পুনরায় চালু করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। তবে ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা এই প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।
লেবাননে সংঘাতের প্রভাব
লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও এই শান্তি প্রচেষ্টাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ইরান অভিযোগ করেছে, লেবাননে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে হামলা কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৈরুত শহরে বুধবারের পর থেকে বড় কোনো হামলা হয়নি। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে, শনিবারও সেখানে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
পারস্পরিক চাপ ও কূটনৈতিক কৌশল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই দাবি করছে, অন্য পক্ষই সমঝোতায় পৌঁছাতে বেশি আগ্রহী। আলোচনার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই আলোচনা নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং নতুন শর্ত উত্থাপন করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত অভ্যন্তরীণ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে ইরানের অবস্থানকে সমালোচনা করে বলেন, আন্তর্জাতিক জলপথ নিয়ন্ত্রণ করে ইরান বিশ্বকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে তাদের প্রকৃত শক্তি সীমিত।
সার্বিকভাবে, এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত থামানোর ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ তৈরি করলেও, পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















