পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে এবার ভোটের মূল আলোচনায় উঠে এসেছে প্রান্তিক মানুষের কল্যাণ, উন্নয়ন, ভাষার স্বীকৃতি এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে বিতর্ক। জেলার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই তফসিলি জাতি ও তফসিলি জনজাতিভুক্ত হওয়ায়, এই অংশের ভোটই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
২৩ এপ্রিল ঝাড়গ্রামে ভোট। ২০২১ সালের নির্বাচনে জেলার চারটি আসনই জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস।
জনসংখ্যার গঠনেই ভোটের সমীকরণ
ঝাড়গ্রাম পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল অঞ্চলের অন্তর্গত। এখানে তফসিলি জাতির মানুষের হার ২০.১৩ শতাংশ এবং তফসিলি জনজাতির হার ২৯.৩২ শতাংশ। দুই গোষ্ঠী মিলিয়ে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ। এর সঙ্গে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
এই বিপুল ভোটভিত্তির কারণেই প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই এই সম্প্রদায়গুলিকে নিজেদের পক্ষে টানতে মরিয়া।
তৃণমূলের প্রতিশ্রুতি
বিনপুরের তৃণমূল প্রার্থী এবং বর্তমান বন ও ক্রেতাসুরক্ষা প্রতিমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা বলেছেন, বনাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য নতুন নিয়ম তৈরি করা দরকার, যাতে তাদের জীবনযাত্রা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে। তাদের উচ্ছেদ না করে বরং বন সম্পর্কে তাদের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে আয় বাড়ানো যায়, সেই পথ খুঁজতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তিনি নিজেও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ায় মাটির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেন, যাতে তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মেলে, শুধু দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে না দাঁড়ায়।
বিজেপির পাল্টা অভিযোগ
অন্যদিকে ঝাড়গ্রামে বিজেপি প্রার্থী লক্ষ্মীকান্ত সাহু অভিযোগ করেছেন, গত ১৫ বছরে তৃণমূল সরকার জেলার তফসিলি জাতি ও জনজাতি মানুষের উন্নয়নে কার্যত কিছুই করেনি।
তাঁর দাবি, এলাকায় বহু মানুষ এখনও পাকা রাস্তা বা পাকা বাড়ির মতো ন্যূনতম সুবিধাও পান না। শহরের কাছাকাছি থাকা মানুষেরই যদি এই অবস্থা হয়, তা হলে গভীর বনাঞ্চলের মানুষের অবস্থা সহজেই বোঝা যায়। তিনি শিল্প স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেকারত্বের সমস্যা মোকাবিলার কথাও বলেছেন।
ভোটারদের সংশয়
তবে সাধারণ মানুষের একাংশ এই সব প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখতে পারছেন না। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বলেন, ভোট আসে, ভোট যায়, কিন্তু প্রান্তিক মানুষেরা শুধু প্রতিশ্রুতির অপেক্ষাতেই থেকে যান। বাস্তবে যত কাজ হয়, তা ঘোষণার তুলনায় খুবই সামান্য।
তিনি আরও বলেন, সাঁওতাল এবং কুর্মিদের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলি যে বিভাজন তৈরি করেছে, তা তাদের আরও প্রান্তিক করে তুলেছে।
স্বনির্ভরতার কথা তৃণমূলের
ঝাড়গ্রাম কেন্দ্রে লক্ষ্মীকান্ত সাহুর বিরুদ্ধে লড়ছেন তৃণমূলের মঙ্গল সোরেন। তাঁর মতে, চাকরির অভাব অবশ্যই একটি সমস্যা, কিন্তু এই অঞ্চলে স্বনিযুক্তি এবং ক্ষুদ্র শিল্পের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষকে তাদের নিজস্ব দক্ষতা কাজে লাগানোর প্রশিক্ষণ দিলে তারা আত্মনির্ভর হতে পারবেন।

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে মতভেদ
আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত মঙ্গল সোরেন বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার দাবি তুলে তারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব বৈচিত্র্য নষ্ট করতে চাইছে।
তাঁর কথায়, ভারতের মতো বহুত্ববাদী দেশে এই ধরনের আইন চাপিয়ে দিলে বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বর্তমান সামাজিক কাঠামো এবং চলতি রীতিনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, তাই এমন আইন সঠিক পথ নয়। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ব্যবস্থা এবং পরিচয়কে সম্মান করা উচিত।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একই সুরে বলেছেন, বিজেপি যদি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে, তা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তফসিলি জনজাতির মানুষ।
অন্যদিকে বিজেপি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করবে। শুক্রবার দলের নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
কুর্মি দাবি ও ভাষার স্বীকৃতি
গোপীবল্লভপুর কেন্দ্রে কুর্মি সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের তফসিলি জনজাতির মর্যাদার দাবি এখনও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। বিজেপি এখানে প্রার্থী করেছে পশ্চিমবঙ্গ কুর্মি সমাজের নেতা রাজেশ মাহাতোকে।
তবে মাহাতো জানিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচনে তিনি বা তাঁর দল কুর্মিদের তফসিলি জনজাতির মর্যাদার দাবিকেই সবচেয়ে সামনে আনছেন না।
তাঁর বক্তব্য, তিনি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে চান না। তবে কুর্মালি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজ করতে চান। পাশাপাশি দীর্ঘদিন উপেক্ষিত মুণ্ডারি ভাষার স্বীকৃতির দাবিকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই দাবি তুলনামূলকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত এবং এর ফলে দুই সম্প্রদায়ই সরকারি স্বীকৃতির পথে এক ধাপ এগোতে পারবে।
শুক্রবার অমিত শাহ বলেছেন, সরকার কুর্মালি ও রাজবংশী ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। তবে একই স্বীকৃতির কথা মুণ্ডারি ভাষার ক্ষেত্রে বলা হয়নি।
মাওবাদী অতীত, উন্নয়নের বর্তমান প্রতিশ্রুতি
মাওবাদী আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস থাকায় এই অঞ্চলে উন্নয়ন এবং কল্যাণমূলক কর্মসূচি দীর্ঘদিন বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী প্রচারে প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন ও সহায়তাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
২৭ মার্চ বিনপুরে প্রচারে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, গত ১২ বছরে বিজেপি বিনপুর বা জামবনির জন্য কী করেছে? আদিবাসী ও তফসিলি মানুষের জন্য কী করেছে? একদিকে মুখ্যমন্ত্রী লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে আদিবাসী ও তফসিলি মানুষকে ১,৭০০ টাকা দিচ্ছেন, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি বাড়ছে নরেন্দ্র মোদির কারণে। তাঁর অভিযোগ, মোদি যা কেড়ে নিচ্ছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি আরও বলেন, ২০১১ সালের আগে এলাকার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে মাওবাদী আতঙ্কে মানুষ ঘর থেকে বেরোতে ভয় পেত। তাঁর দাবি, তৃণমূল সরকারই এই অঞ্চলে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
২৩ এপ্রিল ঝাড়গ্রামে ভোটগ্রহণ হবে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জেলার চারটি আসনই তৃণমূল জিতেছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















