কলকাতা ও আশপাশের জেলাগুলিতে বিধানসভা নির্বাচনে নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার কৌশল নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি বাস্তবতা—দল যে তিন তরুণ মুখকে প্রার্থী করেছে, তারা সবাই দলের প্রভাবশালী নেতাদের সন্তান। ফলে এই নির্বাচন হয়ে উঠেছে উত্তরাধিকার ও যোগ্যতার পরীক্ষার মঞ্চ।
প্রজন্ম বদলের বার্তা, কিন্তু চ্যালেঞ্জ বড়
দলের তরফে মানিকতলা, উত্তরপাড়া ও পানিহাটি আসনে তিন তরুণ প্রার্থীকে দাঁড় করানো হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন শ্রেয়া পান্ডে, সির্সন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তীর্থঙ্কর ঘোষ। তিনজনই রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে এলেও এবার তাঁদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের পালা।
মানিকতলায় পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
কলকাতার মানিকতলা আসনে প্রার্থী হয়েছেন ৪২ বছর বয়সী শ্রেয়া পান্ডে। তিনি প্রয়াত মন্ত্রী সাধন পান্ডের কন্যা। তাঁর মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে জয়ী হন শ্রেয়ার মা সুপ্তি পান্ডে। ফলে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই আসনে পান্ডে পরিবারের প্রভাব রয়েছে।
শ্রেয়া নিজেকে এই এলাকার ‘মেয়ে’ বলে পরিচয় দিলেও তিনি জানেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহজ নয়। তাঁর প্রতিপক্ষ তপস রায়, যিনি আগে তৃণমূলেরই নেতা ছিলেন এবং পরে বিজেপিতে যোগ দেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে শ্রেয়া বলেন, ছোটবেলা থেকে তিনি তপস রায়কে ‘কাকা’ বলে ডাকেন। তবে তপস রায়ের মতে, এটি ব্যক্তির লড়াই নয়, বরং দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘর্ষ।
উত্তরপাড়ায় মর্যাদার লড়াই
হুগলির উত্তরপাড়ায় তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী আইনজীবী সির্সন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে এবং কলকাতা হাই কোর্টে আইন পেশায় যুক্ত।
এই আসনটি তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হলেও এবার তিনি মুখোমুখি হয়েছেন সিপিআই(এম)-এর জনপ্রিয় নেতা মীনাক্ষী মুখার্জির। মাঠপর্যায়ের আন্দোলনের মাধ্যমে নিজের জায়গা তৈরি করা মীনাক্ষীর প্রচার ইতিমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। পাশাপাশি বিজেপির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডো দীপাঞ্জন চক্রবর্তী, ফলে এখানে ত্রিমুখী লড়াই তৈরি হয়েছে।

সির্সন্যা বলেন, আদালতে বাবার সঙ্গে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে, তবে রাজনীতিতে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক অন্যরকম। অনেকেই তাঁকে তাঁর বাবার পরিচয়ের কারণে চেনেন, যা এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পানিহাটিতে আবেগ ও রাজনীতির সংঘর্ষ
উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি আসনে প্রার্থী হয়েছেন তীর্থঙ্কর ঘোষ, যিনি তৃণমূলের প্রধান হুইপ নির্মল ঘোষের ছেলে। এখানে নির্বাচন শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, আবেগের দিক থেকেও তা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন সেই চিকিৎসকের মা, যিনি ২০২৪ সালের আগস্টে কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে যৌন নিপীড়নের পর খুন হন। তিনি ভোটারদের কাছে আবেগঘন আবেদন জানিয়ে তৃণমূলকে পরাজিত করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ঘটনার জন্য তৃণমূল নেতাদের দায়ী করেছেন।
এই প্রসঙ্গে তীর্থঙ্কর ঘোষ প্রচারে এড়িয়ে চলছেন সরাসরি মন্তব্য। তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়া তাঁদের মূল লক্ষ্য এবং পানিহাটি তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই থাকবে।
নতুন প্রজন্মের সামনে বড় পরীক্ষা
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও দলের অভিজ্ঞ নেতাদের ওপর নির্ভর করলেও এই নির্বাচন তরুণ প্রার্থীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। ‘নেপো বেবি’ তকমা কাটিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক দক্ষতা প্রমাণ করাই এখন তাঁদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এই নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে—পারিবারিক উত্তরাধিকার কতটা কার্যকর, আর নতুন প্রজন্ম কতটা নিজের শক্তিতে রাজনীতির ময়দানে জায়গা করে নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















