ফোনের পর্দায় শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত যুদ্ধ। টেলিভিশনের খবর নয়, এই লড়াই চলছে সামাজিক মাধ্যমে, আর কেন্দ্রবিন্দু—আপনার খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের পরিমাণ।
যারা অনলাইনে খুব সক্রিয় নন, তাদের জন্য সংক্ষেপে বলা যায়—১ এপ্রিল, সুপরিচিত পুষ্টিবিদ রুজুতা দিবেকর একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি তার অনুসারীদের উদ্দেশে বলেন, যারা সন্তানদের পরামর্শে খাদ্যতালিকায় বেশি প্রোটিন যোগ করতে চাইছেন, তারা যেন সেই পরামর্শ আপাতত উপেক্ষা করেন। প্রোটিন, কোলাজেন, ক্রিয়েটিন, ওমেগা-৩ কিংবা প্রিবায়োটিক—এসব নিয়ে সন্তানদের কথায় গুরুত্ব না দিতে বলেন তিনি, যতদিন না তারা নিজেরা নিয়মিত রান্না করছেন। শেষে তিনি বলেন, “সে তো এখনও শিশু, বড় হতে দাও।”
এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোড়ন তোলে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি লক্ষাধিক মানুষ দেখেন এবং হাজার হাজারবার শেয়ার হয়। ফলে দিবেকরের জনপ্রিয়তা ও প্রভাব আরও বেড়ে যায়।
পাল্টা প্রতিক্রিয়া
তবে এই ভিডিও প্রকাশের পরপরই শুরু হয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া। চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, ফিটনেস প্রশিক্ষকসহ অনেকেই নিজেদের মতামত জানাতে শুরু করেন। টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মিনি মাথুর মন্তব্য করেন, নারীদের পুষ্টিগত চাহিদাকে শেষ স্থানে রাখা মানে তাদের কয়েক দশক পিছিয়ে দেওয়া। তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে আলোচনা হওয়া উচিত।
মজা নয়, গুরুতর বিষয়
পুষ্টিবিদ নন্দিতা আয়ার বলেন, প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন এটি হয়তো এপ্রিল ফুলের মজা। কিন্তু পরে তিনি নিজের ভিডিওতে দিবেকরের বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে অগ্রাহ্য করা ঠিক নয় এবং তার বক্তব্যকে সমর্থন করতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার উদাহরণ দেন।

আয়ারের মতে, সামাজিক মাধ্যমে সহজ সমাধান বা আকর্ষণীয় ভিডিও সবসময় বেশি জনপ্রিয় হয়। কিন্তু জটিল ও বিশ্লেষণধর্মী পরামর্শ সেভাবে গুরুত্ব পায় না। ভারতের মতো দেশে, যেখানে অপুষ্টি থেকে স্থূলতা—দুই সমস্যাই বিদ্যমান, সেখানে এই প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের উদ্বেগ
হায়দরাবাদের জাতীয় পুষ্টি ইনস্টিটিউট এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বলেন, সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এমন পরামর্শ দেন, যাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। ফলে রোগীরা বিভ্রান্ত হন এবং অপ্রয়োজনীয় খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতে শুরু করেন।
তিনি আরও বলেন, শুধু প্রোটিন খেলে ওজন কমে না। সুষম খাদ্য, শারীরিক পরিশ্রম এবং অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি কমানো—এসব একসঙ্গে প্রয়োজন।
তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন
রুজুতা দিবেকরের নিজস্ব শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার অনেক পরামর্শ সাধারণ জ্ঞান, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা এবং আধুনিক ধারণার মিশ্রণ। ফলে তার অনুসারীদের মধ্যে তার প্রতি আস্থা তৈরি হয়েছে।
তবে তার সমালোচকদের প্রায়ই ‘দেশবিরোধী’ বা ‘ঐতিহ্যবিরোধী’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যা বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সমাধানের পথে
পুষ্টি সচেতনতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি বৃহৎ সমীক্ষার মাধ্যমে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিগত সমস্যা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বছরের শেষে এই তথ্য নীতিনির্ধারণে কাজে লাগবে।
ততদিন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া তথ্য যাচাই করা জরুরি। আর যদি তা কঠিন হয়, তাহলে অন্তত কাদের অনুসরণ করছেন, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
সুমনা মুখার্জি 


















