জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাইকারি ও খুচরা—দুই স্তরেই ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ইতোমধ্যে দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি কমিশনের কাছে তাদের প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
বিইআরসি সূত্র বলছে, বিদ্যুৎ বিভাগের নীতিগত অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি কমিশনে পাঠানো হয়। এরপর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ের মূল্য কাঠামো তৈরি করে। সেই কাঠামোর ভিত্তিতে বিতরণ কোম্পানিগুলো খুচরা পর্যায়ে নতুন দর নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, প্রস্তাবগুলো আমলে নিয়ে কমিশন ইতোমধ্যে কারিগরি মূল্যায়ন শুরু করেছে। গণশুনানির মাধ্যমে সব পক্ষের মতামত ও প্রস্তাবের যৌক্তিকতা যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কতটা বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম
প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব খুচরা পর্যায়েও পড়বে। ব্যবহারভেদে বিভিন্ন স্তরে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৭০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
তবে ‘লাইফলাইন’ গ্রাহকদের আপাতত বাড়তি চাপের বাইরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। যারা মাসে ৭০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তারা এই সুবিধার আওতায় থাকতে পারেন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এতে প্রায় ৬৩ শতাংশ গ্রাহক সুরক্ষিত থাকবেন। বাকি ৩৭ শতাংশ গ্রাহকের ওপর নতুন মূল্যবৃদ্ধির চাপ পড়বে।
এ ছাড়া পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সঞ্চালন চার্জও প্রতি ইউনিটে অতিরিক্ত ১৬ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
ভর্তুকির চাপ ও উৎপাদন ব্যয়
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে, যাদের বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। তবে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্য ও সেবার মূল্যেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে খরচ হয়, গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা মূল্যের তুলনায় তা গড়ে প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপ বাড়ার পেছনে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এলএনজি, কয়লা ও তেলের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।
এর পাশাপাশি, অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার না হলেও চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।
আগেও বেড়েছে বিদ্যুতের দাম
সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ৫ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে গড়ে ৮ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ৮ টাকা ৯৫ পয়সা এবং পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা।
এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেছেন, শুধু ঘাটতির অজুহাতে বারবার দাম বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তার মতে, বিদ্যুৎ খাতে অদক্ষতা ও অতিরিক্ত ব্যয় কমানো গেলে ভর্তুকির চাপ অনেকটাই হ্রাস করা সম্ভব।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি
মে মাসে গণশুনানির পর বিদ্যুতের নতুন দাম নির্ধারণের পথে সরকার, ইউনিটে বাড়তে পারে সর্বোচ্চ দেড় টাকা।
বিদ্যুতের দাম আবার বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। আগামী ২০ ও ২১ মে গণশুনানির পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্প খাতের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















