মণিপুরের দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত সংঘাত আবারও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। এপ্রিলের শুরুতে বিষ্ণুপুর জেলার একটি মেইতেই অধ্যুষিত গ্রামে রকেট হামলার পর নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজ্যে। গত তিন বছর ধরে চলা মেইতেই-কুকি সংঘাত এবার নাগা অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকাকেও টেনে আনছে সহিংসতার কেন্দ্রে, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
৭ এপ্রিল ভোরের আগে বিষ্ণুপুরের ত্রংলাওবি গ্রামে দুটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। গ্রামের পাশের পাহাড়ি অঞ্চল কুকি-জো নিয়ন্ত্রিত এলাকা হিসেবে পরিচিত। হামলায় কর্তব্যরত এক বিএসএফ সদস্যের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘুমন্ত অবস্থায় নিহত হয় তার পাঁচ বছরের ছেলে ও পাঁচ মাস বয়সী মেয়ে। গুরুতর আহত হন ওই জওয়ানের মা।
এই ঘটনার পর ইম্ফল উপত্যকাজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। রাস্তায় টায়ার জ্বালানো, নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটে। পরবর্তী পাল্টা অভিযানে আরও তিন মেইতেই নিহত হন।
নতুন করে উত্তপ্ত রাজনীতি
ফেব্রুয়ারিতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইউমনাম খেমচন্দ সিংয়ের শপথের পর কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। বিজেপি নেতৃত্ব আশা করেছিল, তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী ভাবমূর্তির এই মেইতেই নেতাকে সামনে এনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। মন্ত্রিসভায় কুকি ও নাগা প্রতিনিধিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নেমচা কিপগেন ও লোসি দিখোকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা দিতে।
কিন্তু বাস্তবে সহিংসতা কমার বদলে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৩ সালের সংঘাত মূলত মেইতেই ও কুকিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার নাগা অধ্যুষিত এলাকাও সংঘাতের আওতায় চলে আসছে।

ফেব্রুয়ারিতে উখরুলে এক তাংখুল নাগা ব্যক্তির ওপর হামলার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। পরে সন্দেহভাজন কুকি জঙ্গি ও নাগা গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় তিনজন নিহত হন। এতে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে সংঘাতের মানচিত্র আরও বিস্তৃত হতে পারে।
অবরোধ, বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা সংকট
৭ থেকে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ছিল এক বাস্তুচ্যুত সাত বছরের শিশুর মৃত্যুও। জাতীয় মহাসড়কে যানবাহনে আগুন দেওয়া হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সাধারণ মানুষ তল্লাশি করে এবং এক পুলিশ কনস্টেবলকে নিজের সহকর্মীদের ওপর পাথর নিক্ষেপের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
মেইতেই নারীদের নেতৃত্বে সাত দিনের অবরোধ কর্মসূচি পুরো উপত্যকাকে অচল করে দেয়। একই সময়ে কুকি ও নাগা গোষ্ঠীগুলিও পাহাড়ি এলাকায় পৃথক অবরোধ পালন করে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মুখ্যমন্ত্রী খেমচন্দ বিভিন্ন এলাকায় সফর করেছেন, নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তার সফরও বাধার মুখে পড়েছে। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা তার রাস্তা আটকে দিলে তাকে হেলিকপ্টারে যাতায়াত করতে হয়।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দায়িত্বে প্রায় ৮,৫০০ সিআরপিএফ সদস্য সরিয়ে নেওয়ায় মণিপুরে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল বলে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা চলছে। পরে কেন্দ্রীয় সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত সশস্ত্র ইউনিট ও মাইন-প্রতিরোধী যান মোতায়েনের পরিকল্পনা নেয়।
অবিশ্বাসের দেয়াল আরও উঁচু
মেইতেই সংগঠনগুলো ত্রংলাওবি হামলাকে “যুদ্ধ ঘোষণা” হিসেবে দেখছে। তারা কুকি-জো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি বাতিল এবং মিয়ানমার থেকে আসা “অবৈধ চিন-কুকি”দের শনাক্তে আসামের মতো এনআরসি দাবি করছে।
অন্যদিকে কুকি সংগঠনগুলিও এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তাদের গ্রামগুলোতে হামলাকে “স্পষ্ট যুদ্ধ ঘোষণা” বলে অভিহিত করেছে। দুই পক্ষের কেউই এখন নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না। সম্প্রতি এক আসাম রাইফেলস কনভয়ও বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার মুখে পড়ে।
সব মিলিয়ে মণিপুরে আপাত শান্তির আবরণ আবার ভেঙে পড়েছে। জাতিগত বিভাজনের কাঁটাতার আরও গভীর হচ্ছে, আর তার সঙ্গে বাড়ছে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















