আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাকিস্তানের বিমান হামলায় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় শোক, ক্ষোভ এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিহতদের স্বজনরা দাবি করছেন, সেখানে কোনো সামরিক ঘাঁটি ছিল না, চিকিৎসাধীন সাধারণ মানুষই হামলার শিকার হয়েছেন। দুই মাস পেরিয়ে গেলেও অনেক পরিবার এখনও জানে না তাদের প্রিয়জনের কবর কোথায়।
ভয়াবহ সেই রাত
গত মার্চে কাবুল-জালালাবাদ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত পুনর্বাসন কেন্দ্রে একাধিক বোমা হামলা চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের পর পুরো এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে আগুনে পুড়ে বা দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে মারা যান। চিকিৎসক ও কর্মীরা আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে ভয়াবহ দৃশ্যের মুখোমুখি হন।

জাতিসংঘের হিসাবে অন্তত ২৬৯ জন নিহত হয়েছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অনেক মরদেহ এতটাই ক্ষতবিক্ষত ছিল যে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। নিহতদের একটি বড় অংশকে গণকবরে দাফন করা হয়েছে।
স্বজন হারানোর বেদনা
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তাদের স্বজনেরা সেখানে চিকিৎসার জন্য ভর্তি ছিলেন। কেউ ছিলেন মাদকাসক্তি থেকে ফিরে নতুন জীবন শুরু করার আশায়, কেউ আবার কেন্দ্রটির রান্নাঘর বা প্রশাসনিক কাজে কর্মরত ছিলেন।
এক নারী জানান, তার ভাই মাত্র কয়েকদিন আগে চিকিৎসার জন্য কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছিলেন। হামলার পর শুধু দেহের একটি অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। জন্মদাগ দেখে তিনি ভাইকে শনাক্ত করেন। আরেক ব্যক্তি বলেন, চার দিন ধরে হাসপাতাল ও মর্গ ঘুরে শেষ পর্যন্ত পোড়া কাপড় দেখে ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করতে হয়েছে।
পাকিস্তানের দাবি নিয়ে বিতর্ক

পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা কোনো হাসপাতাল বা বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি। তাদের বক্তব্য, সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবকাঠামো ছিল। তবে নিহতদের পরিবার, স্থানীয় চিকিৎসক এবং মানবাধিকারকর্মীরা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা বলছেন, এটি বহু বছর ধরে পরিচিত একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ঘটনাকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্তের দাবি তুলেছে। আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসনও আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
সীমান্ত উত্তেজনা বাড়ছে
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চলছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করছে, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে জঙ্গিগোষ্ঠী পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করছে। এই সংঘাতের মধ্যেই পুনর্বাসন কেন্দ্রে হামলার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২১ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আফগানিস্তানে যে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, এই হামলা সেই স্থিতিশীলতায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আবারও অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
ন্যায়বিচারের অপেক্ষা
নিহতদের পরিবারের অনেকেই মনে করেন, তাদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হবে। তবুও তারা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছেন। স্বজন হারানোর বেদনার সঙ্গে এখন তাদের বড় প্রশ্ন— কেন একটি চিকিৎসাকেন্দ্রকে লক্ষ্য করা হলো?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















