০৮:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের হাজতির মৃত্যু, ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস বিজেপির ‘কুইক ফিক্স’ মন্ত্রীর বিদায়: ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করবে ধানমন্ডির সুধা সদনে ঝুলন্ত অবস্থায় তরুণের মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক অবরোধ আইসিইউতে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার: আইসিডিডিআর,বি গবেষণায় উদ্বেগ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদারের আহ্বান নতুন মার্কিন শুল্ক ব্যবস্থায় পোশাক রপ্তানিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ বর্ষার সন্ধ্যায় রুনা লায়লার সুরের জাদু, মুগ্ধ দর্শক ট্রাম্পের নতুন শুল্কে ৪৭০ পণ্যে ছাড়, বাণিজ্যনীতিতে বড় ভারসাম্যের চেষ্টা তাইওয়ান প্রণালিতে চীনা হেলিকপ্টারের নজিরবিহীন উড়ান, নতুন যুদ্ধকৌশলের ইঙ্গিত? হাংঝৌতে খাবারের নতুন বিপ্লব, ‘খাদ্য মরুভূমি’ থেকে এশিয়ার রসনাবিলাসের নতুন ঠিকানা

ভারতে নিষিদ্ধ শিখ মানবাধিকারকর্মীর সিনেমা, পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে বসছে ‘গোপন সিনেমা হল

ভারতে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও থেমে নেই শিখ মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরাকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘সতলুজ’। প্রেক্ষাগৃহ ও প্রচলিত প্রদর্শনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পাঞ্জাবের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ নিজেরাই আয়োজন করছেন সিনেমা প্রদর্শনের। গ্রামের চত্বর, শিখ উপাসনালয়ের আঙিনা, খোলা মাঠ কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল—সবই এখন পরিণত হচ্ছে অস্থায়ী সিনেমা হলে।

নিষেধাজ্ঞার পরই বদলে গেল প্রদর্শনের পথ

ভারতে মুক্তির পর মাত্র দুই দিনেরও কম সময়ের মধ্যে ‘সতলুজ’ অনলাইন সম্প্রচার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে সিনেমাটি প্রায় তিন বছর ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। সিনেমাটির আগের নাম ছিল ‘পাঞ্জাব পঁচানব্বই’।

সিনেমাটিতে তুলে ধরা হয়েছে পাঞ্জাবের অশান্ত সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরার জীবন ও কাজ। তিনি নিখোঁজ মানুষদের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন এবং অভিযোগ করেছিলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিখোঁজ বা নিহত বহু মানুষের মরদেহ গোপনে দাহ করা হয়েছে।

সিনেমাটির নির্মাতাদের কাছে বহু পরিবর্তন ও কাটছাঁটের দাবি ওঠে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে ঘটনা, ব্যক্তি ও স্থান শনাক্ত করা যায়—এমন বেশ কিছু তথ্য বদলে দেওয়ার কথাও ছিল। নির্মাতারা তা মানতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি সীমিত সময়ের জন্য সম্প্রচারে এলেও দ্রুতই ভারতজুড়ে এর প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সিনেমাটিকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতেই এটি নতুন দর্শক খুঁজে পেয়েছে।

গ্রামের চত্বরে শত শত মানুষের ভিড়

ফিরোজপুর জেলার মাহিয়ান ওয়ালা কালান গ্রামের একটি রাতের দৃশ্যই এর বড় উদাহরণ। স্থানীয় শিখ উপাসনালয়ের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামের মানুষকে সিনেমা দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাত সাড়ে আটটার দিকে গ্রামের চত্বরে জড়ো হন শত শত মানুষ।

India's banned Sikh activist film finds audience in Punjab villages -  Nikkei Asia

শিশু থেকে প্রবীণ, তরুণ থেকে পুরো পরিবার—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে খোলা জায়গাটিই হয়ে ওঠে অস্থায়ী সিনেমা হল। একটি পর্দা, প্রদর্শনযন্ত্র ও শব্দব্যবস্থার সাহায্যে গ্রামের মানুষ নিজেরাই আয়োজন করেন পুরো প্রদর্শনের।

স্থানীয় তরুণদের একটি দল নিজেদের মধ্যে টাকা তুলে এই আয়োজন করে। প্রদর্শনযন্ত্র ও শব্দব্যবস্থা ভাড়া নেওয়া, বসার ব্যবস্থা করা এবং দর্শকদের জন্য খাবারের আয়োজন—সবকিছুই তারা নিজেদের উদ্যোগে সম্পন্ন করেন।

তরুণদের উদ্যোগে ছড়িয়ে পড়ছে প্রদর্শন

শিখ সংগঠন মিসাল সতলুজের সাধারণ সম্পাদক দেবিন্দর সিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকায় গ্রামের তরুণ, উপাসনালয় পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো নিজেদের উদ্যোগে সিনেমাটির প্রদর্শনের ব্যবস্থা করছে।

কখনো গ্রামের চত্বরে, কখনো উপাসনালয়ের আঙিনায়, আবার কখনো খোলা মাঠে বসছে দর্শকদের আসর। কোথাও বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলও ব্যবহার করা হচ্ছে সিনেমা দেখানোর জন্য।

এভাবে পাঞ্জাবজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক প্রদর্শন নেটওয়ার্ক। শুধু পাঞ্জাবেই কয়েক শ প্রদর্শনী হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী শিখদের মধ্যেও সিনেমাটি দেখানোর উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে।

পুরোনো ক্ষত আবার সামনে আনছে সিনেমাটি

সিনেমাটির প্রতি মানুষের আগ্রহের বড় কারণ শুধু যশবন্ত সিং খালরার জীবন নয়, বরং পাঞ্জাবের সেই অস্থির সময়ের স্মৃতিও। আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে পাঞ্জাবের সহিংসতা, পুলিশি অভিযান, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের ফিরে না পাওয়ার যন্ত্রণা বহু পরিবার এখনো বহন করছে।

৭৮ বছর বয়সী সুরিন্দর কৌরও এমন একজন দর্শক। শারীরিক কষ্ট থাকা সত্ত্বেও তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিনেমাটি দেখতে আসেন। তার মতে, কিছু গল্প একা শোনার জন্য নয়। এমন ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছানো দরকার।

যশবন্ত সিং খালরা নিখোঁজ মানুষদের বিষয়ে সত্য সামনে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের জীবন হারিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে তাকে অপহরণ করা হয়। পরে তদন্তে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাকে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসে।

গ্রামবাসীদের অনেকের কাছে তাই সিনেমাটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়। এটি তাদের কাছে অতীতের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের কথা এবং সত্য জানার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গল্প।

India's banned Sikh activist film finds audience in Punjab villages

শুধু শিখদের নয়, অন্য সম্প্রদায়ের দর্শকরাও দেখছেন

সিনেমাটির প্রদর্শন ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। এটি শুধু শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পাঞ্জাবের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও সিনেমাটি দেখছেন বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপর্বানন্দ ঝা মনে করেন, অনেক দর্শক সিনেমাটিকে শুধু একটি সম্প্রদায়ের ক্ষোভ হিসেবে দেখছেন না। বরং তারা এটিকে মানুষের জীবনের এক গভীর ট্র্যাজেডি ও মানবিকতার প্রশ্ন হিসেবে গ্রহণ করছেন।

এ কারণেই নিষেধাজ্ঞার পরও সিনেমাটির প্রতি আগ্রহ কমেনি। বরং অনেক মানুষের কাছে এটি অতীতের কঠিন অধ্যায় নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

ইতিহাস ভুলে না যাওয়ার বার্তা

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মী লক্ষ্মী মূর্তির মতে, সিনেমাটি মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে কারণ এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি এবং ইতিহাসের অস্বস্তিকর অধ্যায়গুলো কীভাবে মনে রাখা হবে—সেই প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে।

পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতে রাতের আঁধারে অস্থায়ী পর্দায় সিনেমা দেখার এই আয়োজন তাই শুধু বিনোদনের ঘটনা নয়। এটি স্মৃতি, ইতিহাস, মানবাধিকার এবং সত্য জানার আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক সামাজিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা সিনেমাটির প্রচলিত প্রদর্শনের পথ বন্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের আগ্রহকে থামাতে পারেনি। বরং গ্রামের চত্বর থেকে খোলা মাঠ—নতুন নতুন জায়গায় সিনেমাটি পৌঁছে দিয়ে দর্শকরাই যেন বলে দিচ্ছেন, কিছু গল্প পর্দা থেকে সরিয়ে দিলেও মানুষের স্মৃতি থেকে সরিয়ে দেওয়া সহজ নয়।

ভারতের পাঞ্জাবে নিষিদ্ধ সিনেমা ‘সতলুজ’ ঘিরে গ্রামে গ্রামে অস্থায়ী প্রদর্শনী হচ্ছে। যশবন্ত সিং খালরার জীবন ও মানবাধিকার সংগ্রামের গল্প দেখতে ভিড় করছেন মানুষ।

জনপ্রিয় সংবাদ

সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের হাজতির মৃত্যু, ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস

ভারতে নিষিদ্ধ শিখ মানবাধিকারকর্মীর সিনেমা, পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে বসছে ‘গোপন সিনেমা হল

০৬:৩১:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

ভারতে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও থেমে নেই শিখ মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরাকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘সতলুজ’। প্রেক্ষাগৃহ ও প্রচলিত প্রদর্শনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পাঞ্জাবের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ নিজেরাই আয়োজন করছেন সিনেমা প্রদর্শনের। গ্রামের চত্বর, শিখ উপাসনালয়ের আঙিনা, খোলা মাঠ কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানস্থল—সবই এখন পরিণত হচ্ছে অস্থায়ী সিনেমা হলে।

নিষেধাজ্ঞার পরই বদলে গেল প্রদর্শনের পথ

ভারতে মুক্তির পর মাত্র দুই দিনেরও কম সময়ের মধ্যে ‘সতলুজ’ অনলাইন সম্প্রচার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে সিনেমাটি প্রায় তিন বছর ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। সিনেমাটির আগের নাম ছিল ‘পাঞ্জাব পঁচানব্বই’।

সিনেমাটিতে তুলে ধরা হয়েছে পাঞ্জাবের অশান্ত সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরার জীবন ও কাজ। তিনি নিখোঁজ মানুষদের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন এবং অভিযোগ করেছিলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিখোঁজ বা নিহত বহু মানুষের মরদেহ গোপনে দাহ করা হয়েছে।

সিনেমাটির নির্মাতাদের কাছে বহু পরিবর্তন ও কাটছাঁটের দাবি ওঠে। এসব পরিবর্তনের মধ্যে ঘটনা, ব্যক্তি ও স্থান শনাক্ত করা যায়—এমন বেশ কিছু তথ্য বদলে দেওয়ার কথাও ছিল। নির্মাতারা তা মানতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি সীমিত সময়ের জন্য সম্প্রচারে এলেও দ্রুতই ভারতজুড়ে এর প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সিনেমাটিকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতেই এটি নতুন দর্শক খুঁজে পেয়েছে।

গ্রামের চত্বরে শত শত মানুষের ভিড়

ফিরোজপুর জেলার মাহিয়ান ওয়ালা কালান গ্রামের একটি রাতের দৃশ্যই এর বড় উদাহরণ। স্থানীয় শিখ উপাসনালয়ের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামের মানুষকে সিনেমা দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাত সাড়ে আটটার দিকে গ্রামের চত্বরে জড়ো হন শত শত মানুষ।

India's banned Sikh activist film finds audience in Punjab villages -  Nikkei Asia

শিশু থেকে প্রবীণ, তরুণ থেকে পুরো পরিবার—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে খোলা জায়গাটিই হয়ে ওঠে অস্থায়ী সিনেমা হল। একটি পর্দা, প্রদর্শনযন্ত্র ও শব্দব্যবস্থার সাহায্যে গ্রামের মানুষ নিজেরাই আয়োজন করেন পুরো প্রদর্শনের।

স্থানীয় তরুণদের একটি দল নিজেদের মধ্যে টাকা তুলে এই আয়োজন করে। প্রদর্শনযন্ত্র ও শব্দব্যবস্থা ভাড়া নেওয়া, বসার ব্যবস্থা করা এবং দর্শকদের জন্য খাবারের আয়োজন—সবকিছুই তারা নিজেদের উদ্যোগে সম্পন্ন করেন।

তরুণদের উদ্যোগে ছড়িয়ে পড়ছে প্রদর্শন

শিখ সংগঠন মিসাল সতলুজের সাধারণ সম্পাদক দেবিন্দর সিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকায় গ্রামের তরুণ, উপাসনালয় পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো নিজেদের উদ্যোগে সিনেমাটির প্রদর্শনের ব্যবস্থা করছে।

কখনো গ্রামের চত্বরে, কখনো উপাসনালয়ের আঙিনায়, আবার কখনো খোলা মাঠে বসছে দর্শকদের আসর। কোথাও বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলও ব্যবহার করা হচ্ছে সিনেমা দেখানোর জন্য।

এভাবে পাঞ্জাবজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক প্রদর্শন নেটওয়ার্ক। শুধু পাঞ্জাবেই কয়েক শ প্রদর্শনী হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী শিখদের মধ্যেও সিনেমাটি দেখানোর উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়েছে।

পুরোনো ক্ষত আবার সামনে আনছে সিনেমাটি

সিনেমাটির প্রতি মানুষের আগ্রহের বড় কারণ শুধু যশবন্ত সিং খালরার জীবন নয়, বরং পাঞ্জাবের সেই অস্থির সময়ের স্মৃতিও। আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে পাঞ্জাবের সহিংসতা, পুলিশি অভিযান, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের ফিরে না পাওয়ার যন্ত্রণা বহু পরিবার এখনো বহন করছে।

৭৮ বছর বয়সী সুরিন্দর কৌরও এমন একজন দর্শক। শারীরিক কষ্ট থাকা সত্ত্বেও তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিনেমাটি দেখতে আসেন। তার মতে, কিছু গল্প একা শোনার জন্য নয়। এমন ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছেও পৌঁছানো দরকার।

যশবন্ত সিং খালরা নিখোঁজ মানুষদের বিষয়ে সত্য সামনে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের জীবন হারিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে তাকে অপহরণ করা হয়। পরে তদন্তে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাকে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগের বিষয়টি উঠে আসে।

গ্রামবাসীদের অনেকের কাছে তাই সিনেমাটি শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়। এটি তাদের কাছে অতীতের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের কথা এবং সত্য জানার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গল্প।

India's banned Sikh activist film finds audience in Punjab villages

শুধু শিখদের নয়, অন্য সম্প্রদায়ের দর্শকরাও দেখছেন

সিনেমাটির প্রদর্শন ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। এটি শুধু শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পাঞ্জাবের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও সিনেমাটি দেখছেন বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপর্বানন্দ ঝা মনে করেন, অনেক দর্শক সিনেমাটিকে শুধু একটি সম্প্রদায়ের ক্ষোভ হিসেবে দেখছেন না। বরং তারা এটিকে মানুষের জীবনের এক গভীর ট্র্যাজেডি ও মানবিকতার প্রশ্ন হিসেবে গ্রহণ করছেন।

এ কারণেই নিষেধাজ্ঞার পরও সিনেমাটির প্রতি আগ্রহ কমেনি। বরং অনেক মানুষের কাছে এটি অতীতের কঠিন অধ্যায় নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

ইতিহাস ভুলে না যাওয়ার বার্তা

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মী লক্ষ্মী মূর্তির মতে, সিনেমাটি মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে কারণ এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি এবং ইতিহাসের অস্বস্তিকর অধ্যায়গুলো কীভাবে মনে রাখা হবে—সেই প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে।

পাঞ্জাবের গ্রামগুলোতে রাতের আঁধারে অস্থায়ী পর্দায় সিনেমা দেখার এই আয়োজন তাই শুধু বিনোদনের ঘটনা নয়। এটি স্মৃতি, ইতিহাস, মানবাধিকার এবং সত্য জানার আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক সামাজিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা সিনেমাটির প্রচলিত প্রদর্শনের পথ বন্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের আগ্রহকে থামাতে পারেনি। বরং গ্রামের চত্বর থেকে খোলা মাঠ—নতুন নতুন জায়গায় সিনেমাটি পৌঁছে দিয়ে দর্শকরাই যেন বলে দিচ্ছেন, কিছু গল্প পর্দা থেকে সরিয়ে দিলেও মানুষের স্মৃতি থেকে সরিয়ে দেওয়া সহজ নয়।

ভারতের পাঞ্জাবে নিষিদ্ধ সিনেমা ‘সতলুজ’ ঘিরে গ্রামে গ্রামে অস্থায়ী প্রদর্শনী হচ্ছে। যশবন্ত সিং খালরার জীবন ও মানবাধিকার সংগ্রামের গল্প দেখতে ভিড় করছেন মানুষ।