বর্ষার আবহে ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন যেন পরিণত হয়েছিল সুরের এক মায়াবী আসরে। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেলেও মঞ্চে রুনা লায়লার কণ্ঠে একের পর এক প্রিয় গান ঝরেছে, আর তাতে মুগ্ধ হয়েছেন কয়েক প্রজন্মের সংগীতপ্রেমী।
প্রায় সাত শত আসনের মিলনায়তনটি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিকিট বিক্রি শুরুর প্রথম দিনেই সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। ফলে অনেক দর্শক চাইলেও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি।
দেশাত্মবোধক গান দিয়ে শুরু
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার কিছু পর মঞ্চে ওঠেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। শুরুতেই ভাষা ও দেশের জন্য আত্মত্যাগকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। এরপর দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যারা’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় একক সংগীতসন্ধ্যা।
এরপর একে একে তিনি গেয়ে শোনান ‘শিল্পী আমি’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায়’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাও না’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’ ও ‘সাধের লাউ’সহ জনপ্রিয় গান।
এদিন প্রথমবার মঞ্চে নজরুলসংগীত ‘ভুলিতে পারি না’ পরিবেশন করেন রুনা লায়লা। দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে প্রায় দেড় ঘণ্টার এই আয়োজনের শেষ গান হিসেবে তিনি পরিবেশন করেন বহুল জনপ্রিয় ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’। সব মিলিয়ে ১১টি গান শোনান তিনি।

ছয় দশকের গানেও অমলিন আবেদন
প্রতিটি গান শেষ হওয়ার পর মিলনায়তনজুড়ে বেজে ওঠে দীর্ঘ করতালি ও উচ্ছ্বাস। বয়স ও সময়ের ব্যবধান ভুলে দর্শকেরা যেন ফিরে যান রুনা লায়লার গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরোনো স্মৃতিতে।
গানের ফাঁকে নিজের দীর্ঘ সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি ও মজার ঘটনা তুলে ধরেন রুনা লায়লা। তাঁর প্রাণবন্ত কথাবার্তা, স্বতঃস্ফূর্ত রসবোধ এবং দর্শকদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ পুরো আয়োজনকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।
‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’ শিরোনামের এই আয়োজনটি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে রুনা লায়লার প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক সংগীতানুষ্ঠান। দীর্ঘ সংগীতজীবনে এই মঞ্চে আগে দুই-তিনবার গান করলেও এবারই প্রথম পূর্ণাঙ্গ একক আয়োজন নিয়ে হাজির হন তিনি।
ছয় বছর বয়সেই শুরু মঞ্চযাত্রা
অনুষ্ঠানে রুনা লায়লা জানান, মাত্র ছয় বছর বয়সে করাচিতে তাঁর প্রথম মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ আসে। একটি অনুষ্ঠানে তাঁর বড় বোন দিনার গান গাওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে বোন অসুস্থ হয়ে পড়ায় ছোট্ট রুনাকে মঞ্চে উঠতে হয়। সেই আকস্মিক ঘটনাই পরে তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনের প্রথম মঞ্চাভিনয় হয়ে ওঠে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার সংগীতজীবন শুরু করেন তিনি। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে সংগীতের সঙ্গে পথচলায় ১০ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছেন এই শিল্পী। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি ও পশতুসহ ১৮টি ভাষায় গান গেয়ে তিনি উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনে নিজের অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন।
সম্মাননা পেলেন কিংবদন্তি শিল্পী
অনুষ্ঠানে সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে রুনা লায়লাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁর হাতে সম্মাননা তুলে দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দীন আহমেদ।
নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, রুনা লায়লার কণ্ঠের গান সময়ের সীমা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। দীর্ঘদিনের সংগীতসাধনা বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মর্যাদাও বাড়িয়েছে।
আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, দেশের বরেণ্য শিল্পীদের যথাযথভাবে সম্মান জানাতে সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই আয়োজন করা হয়েছে।
বন্যাদুর্গতদের জন্য যাবে টিকিটের অর্থ
আয়োজকেরা জানান, অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি থেকে পাওয়া পুরো অর্থ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হবে। এর আগে কিংবদন্তি শিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন ও সৈয়দ আব্দুল হাদীর একক সংগীতানুষ্ঠানও আয়োজন করেছিলেন তাঁরা।
দর্শকদের একজন রাকিবুল ইসলাম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে ছয়টি টিকিট কিনেছিলেন। তাঁর মতে, জীবনের এই পর্যায়েও রুনা লায়লার কণ্ঠ ও প্রাণশক্তি অসাধারণ। দেশীয় কিংবদন্তি শিল্পীদের নিয়ে নিয়মিত এমন আয়োজন হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের সংগীত ঐতিহ্যের প্রতি আরও আগ্রহী হবে।
রাত সোয়া ৯টার দিকে ‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ দিয়ে গান শেষ করেন রুনা লায়লা। তবে সেদিনের আয়োজন শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। বরং বর্ষার এক সন্ধ্যায় কয়েক প্রজন্মের দর্শকের সামনে এটি হয়ে উঠেছে বাংলা গানের এক কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধা জানানোর স্মরণীয় মুহূর্ত।
বর্ষার সন্ধ্যায় রুনা লায়লার কণ্ঠে ছয় দশকের সুর, শিল্পকলা একাডেমির কানায় কানায় পূর্ণ মিলনায়তনে মুগ্ধ দর্শক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















