সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ‘অপুর ত্রয়ী’ দেখে মুগ্ধ বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান। নিউইয়র্কে চলচ্চিত্র সংগ্রহশালার একটি বিশেষ আয়োজনে রায়ের সিনেমা হাতে তুলে নিয়ে তিনি সত্যজিৎ রায়কে ‘ভারতের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতা’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
নোলানের মুগ্ধতায় সত্যজিৎ রায়
‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডানকার্ক’ ও ‘ওপেনহাইমার’-এর মতো আলোচিত সিনেমার নির্মাতা নোলান সম্প্রতি নিউইয়র্কে চলচ্চিত্রের বিখ্যাত সংগ্রহশালায় যান। সেখানে বিভিন্ন সিনেমা দেখার সময় তাঁর হাতে উঠে আসে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর ত্রয়ী’।
রায়ের এই সৃষ্টির প্রথম সিনেমা ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে নোলান বলেন, এটি অসাধারণ একটি চলচ্চিত্র, যা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তিনি জানান, ত্রয়ীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় সিনেমা এখনো দেখা হয়নি। তাই পুরো গল্প শেষ করার জন্য বাকি দুই সিনেমা দেখার ব্যাপারে তিনি বেশ আগ্রহী।
বাংলার গল্প থেকে বিশ্বজনীন আবেদন
১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পথের পাঁচালী’ দিয়ে শুরু হয় ‘অপুর ত্রয়ী’। এরপর ১৯৫৬ সালে ‘অপরাজিত’ এবং ১৯৫৯ সালে ‘অপুর সংসার’ দিয়ে পূর্ণতা পায় এই অনন্য চলচ্চিত্রযাত্রা।
তিন সিনেমায় গ্রামবাংলার শৈশব থেকে শুরু করে অপু নামের এক মানুষের বড় হয়ে ওঠার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। শৈশব, পরিবার, স্বপ্ন, হারানোর বেদনা, জীবনের সংগ্রাম ও সময়ের পরিবর্তন—সবকিছুকে খুব সাধারণ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন সত্যজিৎ রায়।
স্থানীয় জীবনের এমন গল্পকে তিনি এমনভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন, যা দেশ ও সংস্কৃতির সীমা পেরিয়ে বিশ্বের দর্শকের কাছেও গভীরভাবে পৌঁছে যায়।

বিশ্ব চলচ্চিত্রে রায়ের অনন্য অবস্থান
সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘শ্রেষ্ঠ মানবিক দলিল’ পুরস্কার অর্জন করে। ‘অপরাজিত’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পায় গোল্ডেন লায়ন। তাঁর চলচ্চিত্র ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও স্বীকৃতি পেয়েছে।
রায়ের সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ জীবনের ছোট ছোট ঘটনাকে গভীর আবেগ ও শক্তিশালী দৃশ্যভাষার মাধ্যমে তুলে ধরা। তাঁর গল্পে বড় কোনো আয়োজন না থাকলেও মানুষের অনুভূতি, সম্পর্ক ও জীবনের বাস্তবতা দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ তৈরি করেছে।
নোলানের প্রশংসায় নতুন করে আলোচনায় রায়
নোলান নিজে সময়, স্মৃতি, কল্পনা ও বিশাল পরিসরের গল্প বলার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। অন্যদিকে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ছিল অনেক বেশি সংযত, মানবিক এবং মানুষের প্রতিদিনের জীবনের কাছাকাছি। চলচ্চিত্র নির্মাণের ধরনে দুজনের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকলেও মানুষের অনুভূতিকে শক্তিশালীভাবে পর্দায় তুলে ধরার জায়গায় তাঁদের কাজের মধ্যে গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
এ কারণেই নোলানের মতো বিশ্বখ্যাত নির্মাতার মুখে সত্যজিৎ রায়ের প্রশংসা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আরও তাৎপর্যের বিষয়, রায়ের ত্রয়ীর শেষ দুই সিনেমা এখনো না দেখা নোলান নতুন করে সেই গল্পের বাকি অংশ আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার আবেদন যে সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়নি, নোলানের এই মন্তব্য যেন তারই আরেকটি বড় স্বীকৃতি। বাংলা চলচ্চিত্রের এক কিংবদন্তির সৃষ্টি আজও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কৌতূহলী করে তুলছে।
সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর ত্রয়ী’ নিয়ে ক্রিস্টোফার নোলানের প্রশংসা আবারও বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাঙালি নির্মাতার অনন্য উত্তরাধিকারকে সামনে এনেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















