০৯:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
লোবিতো করিডর থেকে নতুন বিশ্বব্যবস্থা: খনিজের সঙ্গে এখন ডেটারও লড়াই ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা ৮৮০ বাগেরহাট হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সে আগুন, চালক আহত; পুড়ল ৯ মোটরসাইকেল মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যেই পরীক্ষা ফেডপ্রধান ওয়ারশের ‘গানের মাহাত্ম্য গায়কের চেয়েও বড়’: নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে উষা উত্থুপ মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যেই পরীক্ষা হবে ফেডপ্রধান ওয়ারশের নেতৃত্ব গালফের ভারতীয় প্রবাসীরা এখন শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না, গড়ছেন বৈশ্বিক সম্পদ পর্দাহীন গারমিন সিরকা: তথ্য দেবে, কিন্তু মনোযোগ কেড়ে নেবে না ড্রোন হামলা বন্ধ না হলে জাওয়িয়া তেল শোধনাগার বন্ধের হুঁশিয়ারি লিবিয়ার তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর: অন্তত তিস্তা চুক্তি তো আশা করতে পারে বাংলাদেশ

মেরি গ্রের লড়াই: পরিসংখ্যান ও আইনের সমন্বয়ে কীভাবে বদলানো যায় মানবাধিকার রক্ষার লড়াই

  • Sarakhon Report
  • ১০:০০:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
  • 32

ওয়াশিংটনে অবস্থিত আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মেরি গ্রে শুধু একজন গণিতবিদ বা পরিসংখ্যানবিদ নন; তিনি একই সঙ্গে একজন আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রবল সমর্থক। তাঁর কর্মজীবন দেখিয়ে দেয়, কখনও কখনও একটি সমস্যার সমাধান একটি মাত্র বিদ্যা দিয়ে সম্ভব হয় না। বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা গণহত্যার মতো জটিল বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে হলে সংখ্যার নির্ভুলতা এবং আইনের শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হয়।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নারী, বর্ণ ও বয়সভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবন ও কাজ প্রমাণ করে, গবেষণার সর্বোচ্চ মূল্য তখনই, যখন তা মানুষের অধিকার রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।

বিমূর্ত গণিত থেকে বাস্তব জীবনের প্রশ্নে

মেরি গ্রের একাডেমিক যাত্রার শুরু ছিল বিমূর্ত গণিত দিয়ে। ১৯৬৭ সালে তিনি এ বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল তাত্ত্বিক গবেষণার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলে সমাজে তাঁর অবদান সীমিত থেকে যাবে।

এই উপলব্ধির পর তিনি পরিসংখ্যানের দিকে মনোযোগ দেন। কারণ বাস্তব জীবনের অনেক বড় প্রশ্ন—নিয়োগে বৈষম্য হচ্ছে কি না, সরকারি সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমান কি না, কিংবা কোনো নির্যাতনের প্রকৃত পরিসর কতটা—এসবের উত্তর অনুভূতি দিয়ে নয়, তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমেই খুঁজে বের করতে হয়।

সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা—যেখানে গণিত আর কেবল সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভাষায় রূপ নেয়।

একটি অবসরভাতা নীতিই বদলে দিল তাঁর জীবন

মেরি গ্রের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে নিজের অবসরকালীন সুবিধা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। তিনি লক্ষ্য করেন, একই পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় এবং একই বয়সে অবসর নেওয়া একজন পুরুষ ও একজন নারী সমান সুবিধা পাচ্ছেন না। পুরুষদের মাসিক ভাতা নারীদের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।

বীমা প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা ছিল, নারীরা গড়ে বেশি দিন বেঁচে থাকেন, তাই দীর্ঘমেয়াদে তারা সমান সুবিধা পাবেন।

কিন্তু গ্রে এই যুক্তি মেনে নেননি। তাঁর মতে, গড় আয়ুর তথ্য দিয়ে কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। একটি জনগোষ্ঠীর গড় বৈশিষ্ট্যকে প্রতিটি ব্যক্তির ওপর প্রয়োগ করা বৈজ্ঞানিকভাবেও ভুল।

প্রতিষ্ঠানটি যখন তাঁকে জানায় যে তিনি আইন বোঝেন না, তখন তিনি প্রতিবাদ করার ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি আইন পড়েন, ১৯৭৯ সালে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে আইনজীবী হিসেবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন।

আদালতে জয় এনে দেয় পরিসংখ্যান

পরবর্তীতে একটি ঐতিহাসিক মামলায় মেরি গ্রে ও অর্থনীতিবিদ বারবারা বার্গম্যান গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন।

তাঁদের মূল যুক্তি ছিল পরিসংখ্যানভিত্তিক। পুরুষ ও নারীর মৃত্যুর সম্ভাব্য বয়স বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখান, দুই গোষ্ঠীর বণ্টনে বিশাল অংশজুড়ে মিল রয়েছে। অর্থাৎ কেবল নারী হওয়ার কারণে কেউ নিশ্চিতভাবে পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচবেন—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এই বিশ্লেষণ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টকে বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যে অবসর সুবিধায় লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য বৈধ হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত আদালত সেই বৈষম্যমূলক নীতি অবৈধ ঘোষণা করে।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, সঠিকভাবে ব্যবহৃত পরিসংখ্যান কেবল গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ন্যায়বিচারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

মানবাধিকার তদন্তে সংখ্যার ভূমিকা

মেরি গ্রের কাজ আদালতের গণ্ডিতেও থেমে থাকেনি। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাতে গণহত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সংঘাতের ঘটনাগুলো তথ্যভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কতটা বিস্তৃত, কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রমাণ কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে—এসব ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং স্ট্যাটিস্টিকস উইদাউট বর্ডার্সের মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন।

সমতার জন্য সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ

মেরি গ্রে শুধু আদালত বা গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ১৯৭১ সালে তিনি অ্যাসোসিয়েশন ফর উইমেন ইন ম্যাথমেটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। সেই সময় গণিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, পেশাগত নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পরে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সংগঠনটি সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশেষ অবদানের জন্য ‘মেরি অ্যান্ড আলফি গ্রে অ্যাওয়ার্ড ফর সোশ্যাল জাস্টিস’ প্রবর্তন করে।

নেতৃত্বের আরেকটি শিক্ষা

সহকর্মীদের বর্ণনায় মেরি গ্রে ছিলেন লক্ষ্যনিষ্ঠ, ধৈর্যশীল এবং সমঝোতামূলক নেতৃত্বের প্রতীক। নারী অধিকার সংগঠন উইমেনস ইকুইটি অ্যাকশন লিগে কাজ করার সময় তিনি মতবিরোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু অকারণ বিতর্কে সংগঠনকে স্থবির হতে দেননি।

তিনি জানতেন, একটি সংগঠনের কাজ শুধু আলোচনা করা নয়; শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এগিয়ে যাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের পৃথিবীর জন্য বড় শিক্ষা

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, নজরদারি প্রযুক্তি, শরণার্থী সংকট কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো জটিল সমস্যার সমাধান একক কোনো শাস্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

ডেটা আমাদের সত্যের প্রমাণ দেয়, কিন্তু সেই সত্যকে ন্যায়বিচারে রূপ দিতে প্রয়োজন আইন। আবার আইনকে কার্যকর করতে দরকার তথ্যভিত্তিক যুক্তি।

মেরি গ্রের কর্মজীবন আমাদের সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়। গণিত, পরিসংখ্যান ও আইন—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, জ্ঞানের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা মানুষের অধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহৃত হয়।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

লোবিতো করিডর থেকে নতুন বিশ্বব্যবস্থা: খনিজের সঙ্গে এখন ডেটারও লড়াই

মেরি গ্রের লড়াই: পরিসংখ্যান ও আইনের সমন্বয়ে কীভাবে বদলানো যায় মানবাধিকার রক্ষার লড়াই

১০:০০:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

ওয়াশিংটনে অবস্থিত আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মেরি গ্রে শুধু একজন গণিতবিদ বা পরিসংখ্যানবিদ নন; তিনি একই সঙ্গে একজন আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রবল সমর্থক। তাঁর কর্মজীবন দেখিয়ে দেয়, কখনও কখনও একটি সমস্যার সমাধান একটি মাত্র বিদ্যা দিয়ে সম্ভব হয় না। বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা গণহত্যার মতো জটিল বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে হলে সংখ্যার নির্ভুলতা এবং আইনের শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হয়।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নারী, বর্ণ ও বয়সভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবন ও কাজ প্রমাণ করে, গবেষণার সর্বোচ্চ মূল্য তখনই, যখন তা মানুষের অধিকার রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।

বিমূর্ত গণিত থেকে বাস্তব জীবনের প্রশ্নে

মেরি গ্রের একাডেমিক যাত্রার শুরু ছিল বিমূর্ত গণিত দিয়ে। ১৯৬৭ সালে তিনি এ বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল তাত্ত্বিক গবেষণার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলে সমাজে তাঁর অবদান সীমিত থেকে যাবে।

এই উপলব্ধির পর তিনি পরিসংখ্যানের দিকে মনোযোগ দেন। কারণ বাস্তব জীবনের অনেক বড় প্রশ্ন—নিয়োগে বৈষম্য হচ্ছে কি না, সরকারি সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমান কি না, কিংবা কোনো নির্যাতনের প্রকৃত পরিসর কতটা—এসবের উত্তর অনুভূতি দিয়ে নয়, তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমেই খুঁজে বের করতে হয়।

সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা—যেখানে গণিত আর কেবল সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভাষায় রূপ নেয়।

একটি অবসরভাতা নীতিই বদলে দিল তাঁর জীবন

মেরি গ্রের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে নিজের অবসরকালীন সুবিধা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে। তিনি লক্ষ্য করেন, একই পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় এবং একই বয়সে অবসর নেওয়া একজন পুরুষ ও একজন নারী সমান সুবিধা পাচ্ছেন না। পুরুষদের মাসিক ভাতা নারীদের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।

বীমা প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা ছিল, নারীরা গড়ে বেশি দিন বেঁচে থাকেন, তাই দীর্ঘমেয়াদে তারা সমান সুবিধা পাবেন।

কিন্তু গ্রে এই যুক্তি মেনে নেননি। তাঁর মতে, গড় আয়ুর তথ্য দিয়ে কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। একটি জনগোষ্ঠীর গড় বৈশিষ্ট্যকে প্রতিটি ব্যক্তির ওপর প্রয়োগ করা বৈজ্ঞানিকভাবেও ভুল।

প্রতিষ্ঠানটি যখন তাঁকে জানায় যে তিনি আইন বোঝেন না, তখন তিনি প্রতিবাদ করার ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি আইন পড়েন, ১৯৭৯ সালে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে আইনজীবী হিসেবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন।

আদালতে জয় এনে দেয় পরিসংখ্যান

পরবর্তীতে একটি ঐতিহাসিক মামলায় মেরি গ্রে ও অর্থনীতিবিদ বারবারা বার্গম্যান গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন।

তাঁদের মূল যুক্তি ছিল পরিসংখ্যানভিত্তিক। পুরুষ ও নারীর মৃত্যুর সম্ভাব্য বয়স বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখান, দুই গোষ্ঠীর বণ্টনে বিশাল অংশজুড়ে মিল রয়েছে। অর্থাৎ কেবল নারী হওয়ার কারণে কেউ নিশ্চিতভাবে পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচবেন—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এই বিশ্লেষণ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টকে বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যে অবসর সুবিধায় লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য বৈধ হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত আদালত সেই বৈষম্যমূলক নীতি অবৈধ ঘোষণা করে।

এই ঘটনা প্রমাণ করে, সঠিকভাবে ব্যবহৃত পরিসংখ্যান কেবল গবেষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ন্যায়বিচারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

মানবাধিকার তদন্তে সংখ্যার ভূমিকা

মেরি গ্রের কাজ আদালতের গণ্ডিতেও থেমে থাকেনি। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাতে গণহত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সংঘাতের ঘটনাগুলো তথ্যভিত্তিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কতটা বিস্তৃত, কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রমাণ কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে—এসব ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং স্ট্যাটিস্টিকস উইদাউট বর্ডার্সের মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন।

সমতার জন্য সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ

মেরি গ্রে শুধু আদালত বা গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ১৯৭১ সালে তিনি অ্যাসোসিয়েশন ফর উইমেন ইন ম্যাথমেটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। সেই সময় গণিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, পেশাগত নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পরে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সংগঠনটি সামাজিক ন্যায়বিচারে বিশেষ অবদানের জন্য ‘মেরি অ্যান্ড আলফি গ্রে অ্যাওয়ার্ড ফর সোশ্যাল জাস্টিস’ প্রবর্তন করে।

নেতৃত্বের আরেকটি শিক্ষা

সহকর্মীদের বর্ণনায় মেরি গ্রে ছিলেন লক্ষ্যনিষ্ঠ, ধৈর্যশীল এবং সমঝোতামূলক নেতৃত্বের প্রতীক। নারী অধিকার সংগঠন উইমেনস ইকুইটি অ্যাকশন লিগে কাজ করার সময় তিনি মতবিরোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু অকারণ বিতর্কে সংগঠনকে স্থবির হতে দেননি।

তিনি জানতেন, একটি সংগঠনের কাজ শুধু আলোচনা করা নয়; শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এগিয়ে যাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের পৃথিবীর জন্য বড় শিক্ষা

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, নজরদারি প্রযুক্তি, শরণার্থী সংকট কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো জটিল সমস্যার সমাধান একক কোনো শাস্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

ডেটা আমাদের সত্যের প্রমাণ দেয়, কিন্তু সেই সত্যকে ন্যায়বিচারে রূপ দিতে প্রয়োজন আইন। আবার আইনকে কার্যকর করতে দরকার তথ্যভিত্তিক যুক্তি।

মেরি গ্রের কর্মজীবন আমাদের সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়। গণিত, পরিসংখ্যান ও আইন—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, জ্ঞানের প্রকৃত শক্তি তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা মানুষের অধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহৃত হয়।