মধ্যপ্রাচ্যে এক মাসেরও বেশি সময় পর নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এর প্রভাবে মঙ্গলবার এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে উত্তেজনা
সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি দ্বীপে রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই অস্ত্রব্যবস্থা হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর পর ইরান জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সব ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা হয়েছে।
এই সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে ইতোমধ্যে জাহাজ চলাচল কমেছে। এর আগে এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে জ্বালানি ও সমুদ্রপথে পরিবহন করা পণ্যের খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তেলের বাজারে ঊর্ধ্বগতি
আন্তর্জাতিক বাজারে মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ০.৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ২৩ ডলারে উঠেছে। এর আগের দিনই দাম বেড়েছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দামও ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৬ দশমিক ৬২ ডলারে পৌঁছেছে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি এখনো ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। বাড়তি জ্বালানি ব্যয় পরিবারগুলোর বাজেট ও ভোক্তা আস্থায় চাপ তৈরি করছে।
এশিয়ার বাজারে মিশ্র চিত্র
মঙ্গলবার হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ০.৯ শতাংশ কমে ২৫ হাজার ৩৩২ দশমিক ১০ পয়েন্টে নেমেছে। সাংহাই কম্পোজিট প্রায় অপরিবর্তিত থেকে ৩ হাজার ৯৮৫ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে ছিল।
অন্যদিকে টোকিওর নিক্কেই ২২৫ সূচক ০.২ শতাংশ বেড়ে ৬৬ হাজার ৪২০ দশমিক ২৬ পয়েন্টে ওঠে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি ০.২ শতাংশের বেশি বেড়ে ৬ হাজার ৮৩৫ দশমিক ৫১ পয়েন্টে পৌঁছায়। অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক ০.১ শতাংশ কমেছে। তাইওয়ানের তাইএক্স ০.২ শতাংশ এবং ভারতের সেনসেক্স ০.৩ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচকও ০.১ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
ওয়াল স্ট্রিটে আগস্টে পতন
আগস্টের শেষ কার্যদিবসে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ারসূচকগুলোও নিম্নমুখী ছিল। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কমেছে ০.৩ শতাংশ, ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ ০.৭ শতাংশ এবং নাসডাক কম্পোজিট ০.১ শতাংশ কমেছে।

তবে তেলের দাম বাড়ায় জ্বালানি খাতের কয়েকটি কোম্পানি লাভ করেছে। এক্সন মবিলের শেয়ার ২.৭ শতাংশ এবং শেভরনের শেয়ার ২.১ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইন নিয়ে উদ্বেগে এডিসন ইন্টারন্যাশনালের শেয়ার ২৩.১ শতাংশ এবং পিজিঅ্যান্ডইর শেয়ার ২০.১ শতাংশ কমেছে।
সুদের হার নিয়ে ফেডের সামনে চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ও শ্রমবাজারের পরিস্থিতি ফেডারেল রিজার্ভের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তুলছে। দুই বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার সোমবার ৪.৩৪ শতাংশে ছিল। ২০২৬ সালের শুরুতে এটি ছিল প্রায় ৩.৫০ শতাংশ। ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও শুক্রবারের ৪.৭৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪.৭৫ শতাংশ হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের নতুন তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আগস্টের কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান প্রকাশ হওয়ার কথা। জুলাইয়ে মার্কিন শ্রমবাজার অপ্রত্যাশিতভাবে দুর্বল হয়ে ২৩ হাজার কর্মসংস্থান কমেছিল। সরকারি সংশোধিত তথ্যে মে ও জুন মিলিয়ে আগের হিসাবের তুলনায় আরও ১ লাখ ৩ হাজার কম কর্মসংস্থান সৃষ্টির তথ্য পাওয়া গেছে।
এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হলে শ্রমবাজার আরও দুর্বল হতে পারে, আবার সুদের হার কমালে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা কঠিন হতে পারে—এমন দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবারের শুরুতে ডলারের বিপরীতে জাপানি ইয়েনের দর কমে এক ডলারে ১৫৯ দশমিক ৯৪ ইয়েনে দাঁড়ায়, যা আগের ১৫৯ দশমিক ৭৪ ইয়েনের তুলনায় বেশি। ইউরোর দরও সামান্য কমে ১ ইউরোতে ১ দশমিক ১৬০৪ ডলারে নেমেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















