বিশ্বের ঋণবাজারে বিক্রির চাপ আরও তীব্র হয়েছে। জাপানের ১০ বছরের সরকারি বন্ডের সুদের হার মঙ্গলবার ৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ১৯৯৬ সালের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন দেশের দুর্বল রাজস্ব পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বিশ্বজুড়ে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এর ফলে টোকিও, সিডনি, নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন—বিভিন্ন দেশের বন্ডবাজারে সুদের হার দ্রুত বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে আগের চেয়ে দ্রুত সুদের হার বাড়াতে হতে পারে।
জাপানের বন্ডে বড় পরিবর্তন
জাপানের ১০ বছরের সরকারি বন্ডের সুদের হার ৩ শতাংশে ওঠার পাশাপাশি পাঁচ বছরের বন্ডের সুদের হার রেকর্ড ২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। দুই বছরের বন্ডের সুদের হারও ১ দশমিক ৭৯৫ শতাংশে উঠেছে, যা ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
জাপানের এই ঊর্ধ্বমুখী সুদের হার দেশটির অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপানের সরকারি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। সুদের হার বাড়লে সেই বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়বে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বড় ধরনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ঋণ ও বেসরকারি খাতের অর্থ সংগ্রহের চাহিদা একই মূলধনের জন্য প্রতিযোগিতা করায় বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ধরে রাখার জন্য এখন বেশি মুনাফা দাবি করছেন। বাজারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি এবং নতুন বন্ড সরবরাহ নিয়েই উদ্বেগ বেশি দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও সুদের হার বাড়ছে
জাপানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছরের সরকারি বন্ডের সুদের হারও টোকিওর লেনদেনের সময়ে ৪ দশমিক ৭৮৬ শতাংশে উঠেছে। এটি গত বছরের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ।
অস্ট্রেলিয়ার ১০ বছরের বন্ডের সুদের হারও পাঁচ মাসের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা এর একটি কারণ হিসেবে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আচরণ পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে দেখছেন। জাপানে স্থানীয় বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় জাপানি বিনিয়োগকারীরা বিদেশি বন্ডে বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইউরোপেও মঙ্গলবার সকালে বন্ডের সুদের হার বেড়েছে। ইউরো অঞ্চলের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত জার্মানির ১০ বছরের বন্ডের সুদের হার ৩ দশমিক ৩৪ শতাংশে উঠেছে, যা ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ।
বন্ডবাজারে ‘নতুন যুগের’ ইঙ্গিত
জাপানের ১০ বছরের বন্ডের সুদের হার ৩ শতাংশে পৌঁছানোকে বাজারে একটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ কয়েক দশক ধরে জাপানের সরকারি বন্ডকে বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীল ঋণবাজারের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
কিন্তু সুদের হার আরও বাড়লে জাপানের মুদ্রা ধার করে তুলনামূলক বেশি সুদের বিদেশি সম্পদে বিনিয়োগের কৌশল কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে জাপানের সম্পদের দিকে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি সত্যিকারের একটি কাঠামোগত পরিবর্তন। দীর্ঘদিন জাপানের সরকারি বন্ড বিশ্বব্যাপী স্থির আয়ের বিনিয়োগের জন্য এক ধরনের ভিত্তি ছিল। এখন সেই পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়ছে চাপ
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি মাসের বৈঠকে সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন প্রত্যাশা ইতোমধ্যে বাজারে শক্তিশালী হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যেও তুলনামূলক কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতেও স্বল্পমেয়াদে আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বার্ষিক জ্যাকসন হোল সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কঠোর নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে বন্ড বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের চাপ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বাজারে এখন এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় দেরিতে সুদের হার বাড়াচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিনিয়োগও বাড়াচ্ছে ঋণের সরবরাহ
বিশ্বের বন্ডবাজারে চাপের আরেকটি কারণ হলো বিপুল পরিমাণ নতুন ঋণপত্র বাজারে আসা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো ও সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে বড় প্রযুক্তি অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকভাবে অর্থ সংগ্রহ করছে।
এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এবং জাপানের পরবর্তী অর্থবছরের প্রাথমিক বাজেটের জন্য রেকর্ড পরিমাণ অর্থ চাওয়ার সম্ভাবনাও বাজারে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বন্ডের দাম কমলে তার সুদের হার বাড়ে। ফলে একই সময়ে যদি সরকার ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ ঋণপত্র বাজারে ছাড়ে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আরও বেশি সুদ দিতে হতে পারে।
বিশ্বের ঋণবাজারে তাই এখন একসঙ্গে কয়েকটি চাপ কাজ করছে—তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা, বিপুল সরকারি ঋণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বাড়তে থাকা অর্থের চাহিদা। জাপানের ১০ বছরের বন্ডের সুদের হার ৩ শতাংশে পৌঁছানো সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















