মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব যেসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা মেনে চলছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক মার্কিন বিমানবাহিনী সচিব ফ্র্যাঙ্ক কেন্ডাল। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশকে শুধু ‘নীতি নির্ধারণের বিষয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ সামরিক কর্মকর্তাদের নেই। সংবিধানের প্রতি তাঁদের শপথই তাদের দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ করে।
১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের মতামতধর্মী নিবন্ধে কেন্ডাল লিখেছেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্ব পরিস্থিতি মোকাবিলায় মূলত দুটি পথ বেছে নিয়েছে—অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো এবং নিজেদের দায়িত্বকে কেবল প্রেসিডেন্টের নির্দেশ বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।
তিনি সম্প্রতি একটি সামরিক অবসর অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, সেখানে বর্তমান ও সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি থাকলেও পরিবেশটি ছিল ‘অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক’। তাঁর ভাষ্য, সবাই যেন এমনভাবে আচরণ করছিলেন, যেন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।
সামরিক দায়িত্ব বনাম নীতিগত সিদ্ধান্ত
কেন্ডালের সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির এক বক্তব্যে কেইন সামরিক বাহিনীর ‘কী করতে পারে’ এবং ‘কী করা উচিত’—এই দুই প্রশ্নের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যের কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমটি সামরিক বিষয়; দ্বিতীয়টি নীতিনির্ধারণের পর্যায়ের বিষয়।
কেন্ডাল মনে করেন, বিষয়টি এত সরল নয়। তাঁর মতে, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের শুধু কোনো নির্দেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা জানালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোনো নির্দেশ নৈতিক, আইনসম্মত ও সাংবিধানিক কি না, সে বিষয়েও তাঁদের পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন কেন্ডাল। তাঁর নিবন্ধে সমুদ্রপথে মাদক ব্যবসার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে হত্যার অভিযোগ, আরেক রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধ শুরুর মতো ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় নেতৃত্বের অনুরোধ বা সম্মতি ছাড়াই ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলোতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়েও তিনি সতর্ক করেছেন।
সংবিধানের শপথই চূড়ান্ত দায়িত্ব
কেন্ডাল বলেন, সামরিক কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান রক্ষা ও প্রতিরক্ষার শপথ নেন। তাই তাঁদের দায়িত্ব শুধু সামরিক সক্ষমতা নিয়ে মত দেওয়া নয়; প্রয়োজনে কোন কাজ করা উচিত এবং কোন কাজ করা উচিত নয়, সে বিষয়েও অবস্থান নিতে হবে।
তাঁর দাবি, অনেক নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হলেও পদ হারানো, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় প্রকাশ্যে আপত্তি জানাতে ভয় পাচ্ছেন।
কেন্ডাল আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে জেনারেল চার্লস কিউ. ব্রাউন জুনিয়রকে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেন। তাঁর মতে, ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্বাধীন ও অকপট পরামর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য ও নির্দেশ পালনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সামরিক আইনজীবীদের নিয়েও প্রশ্ন
কেন্ডালের অভিযোগ, প্রশাসন শীর্ষ সামরিক আইনজীবীদের জায়গায় এমন ব্যক্তিদের বসিয়েছে, যারা নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের পক্ষে আইনি যুক্তি দাঁড় করাতে প্রস্তুত। তাঁর মতে, এর ফলে প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা বাস্তবায়নে সামরিক ও আইনি কাঠামোর প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন সামরিক নেতারা বলেও সতর্ক করেছেন কেন্ডাল। বিশেষ করে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেনা ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান অনিশ্চিত। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে ‘স্বাভাবিকতার ভান’, নীতি ও সামরিক দায়িত্বের কৃত্রিম বিভাজন কিংবা আইনজীবীদের দেওয়া ব্যাখ্যা—কোনোটিই সামরিক নেতৃত্বকে তাঁদের সাংবিধানিক শপথ ও নৈতিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত করতে পারবে না।
কেন্ডাল ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী সচিব ছিলেন।
ট্রাম্প ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে সাবেক বিমানবাহিনী সচিব ফ্র্যাঙ্ক কেন্ডালের সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। তাঁর মতে, সংবিধানের শপথের কারণে বেআইনি বা অনৈতিক নির্দেশের বিরুদ্ধে সামরিক নেতৃত্বকে অবস্থান নিতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















