অস্ট্রেলিয়ার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হেলেন হেইনসকে গাড়িচাপা দিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগে গ্রেপ্তার এক ব্যক্তি আদালতে হাজির হয়েছেন। বুধবার আদালতে হাজির করা ৪৩ বছর বয়সী ব্রেন্ডান নুজেন্টের বিরুদ্ধে তিনটি ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে কেন এই হামলা চালানো হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। তদন্তে সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশও যুক্ত হয়েছে।
সোমবার মেলবোর্নের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ওয়াঙ্গারাট্টা শহরে নিজের নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে হামলার শিকার হন হেলেন হেইনস। অভিযোগ অনুযায়ী, নুজেন্ট গাড়ি নিয়ে তাঁকে দুবার ধাক্কা দেন। এতে তাঁর একটি পা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কেটে ফেলতে হয়েছে। গুরুতর আহত এই সংসদ সদস্য এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষ অভিযুক্তকে আটকে রাখেন। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। বুধবার আদালতে প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, নুজেন্টের বিরুদ্ধে বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালিয়ে গুরুতর আঘাত করা, ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর শারীরিক ক্ষতি করা এবং একজন সরকারি কর্মকর্তার ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া গাঁজা চাষ ও গাঁজা রাখার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
আদালতে অভিযুক্তের আইনজীবী জানান, নুজেন্ট বিরল স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত। তাঁর নাম ইডিওপ্যাথিক ট্রান্সভার্স মাইলাইটিস। এ ছাড়া তিনি মস্তিষ্কে আঘাতজনিত সমস্যার চিকিৎসাও নিচ্ছেন। আইনজীবী আদালতকে আরও জানান, তাঁর মক্কেলের কিছু মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উদ্বেগ রয়েছে এবং এর আগে কখনো তাঁকে কারাগারে থাকতে হয়নি।
বুধবারের শুনানিতে অভিযুক্তের পক্ষে জামিনের আবেদন করা হয়নি। ফলে মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি।
হামলার উদ্দেশ্য এখনো অজানা
পুলিশের ধারণা, হেইনসকে লক্ষ্য করেই হামলাটি চালানো হয়েছে। তবে ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। অস্ট্রেলীয় ফেডারেল পুলিশের কমিশনার ক্রিসি ব্যারেট জানিয়েছেন, হেইনসের ওপর এমন হামলার আশঙ্কা নির্দেশ করে, এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য পুলিশের কাছে ছিল না। অভিযুক্তের কাছ থেকেও আসন্ন হামলার বিষয়ে কোনো আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি।
ভিক্টোরিয়া রাজ্য পুলিশের প্রধান মাইক বুশ জানিয়েছেন, হেইনসের সঙ্গে অভিযুক্তের আগে সরাসরি যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হামলার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল, তা তদন্তের অন্যতম প্রধান বিষয়।
অভিযুক্তের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি বুশ। বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন বলে তিনি এড়িয়ে যান। তদন্তে সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশসহ একাধিক সংস্থা কাজ করছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বুধবার ঘটনাটিকে স্পষ্টতই সহিংস হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর আগে তিনি দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশে বাড়তে থাকা তীব্র বিভাজন ও আক্রমণাত্মক বিতর্কের প্রসঙ্গও তুলেছিলেন।
তিনি বলেন, এক প্রজন্ম আগের তুলনায় বিশ্ব এখন আরও বিপজ্জনক ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এ ধরনের ঘটনা সেই বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
অস্ট্রেলিয়ায় রাজনীতিকদের ওপর সহিংস হামলা তুলনামূলকভাবে বিরল। দেশটির সংসদ সদস্য, রাজ্য পর্যায়ের নেতারা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীরাও সাধারণত বড় ধরনের নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়াই কেনাকাটা, কফি পান কিংবা বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক মেরুকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনক বক্তব্য এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে হুমকি বাড়ায় তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনীতিকদের সুরক্ষা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের সহজ যোগাযোগের সুযোগ বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কে এই হেলেন হেইনস
হেলেন হেইনস রাজনীতিতে আসার আগে নার্সিং, ধাত্রীবিদ্যা ও শিক্ষাক্ষেত্রে কাজ করেছেন। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার ইন্ডি আসন থেকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০২২ ও ২০২৫ সালের নির্বাচনেও আসনটি ধরে রাখেন।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক এলাকায় আবাসনসংকটের মতো বিষয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। তাঁর ওপর এই হামলার পর অস্ট্রেলিয়ায় রাজনীতিকদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।












