ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে শুধু প্রসাধনী ব্যবহার করলেই হয় না, খাবারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। রঙিন ফলমূল ও শাকসবজি, বাদাম, বীজ, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং গাঁজানো খাবার ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে, কোলাজেনের ক্ষয় কমাতে এবং বলিরেখার দৃশ্যমানতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে কোলাজেন নামের প্রোটিনের পরিমাণ কমতে থাকে। এই প্রোটিন ত্বকের গঠন ও দৃঢ়তা ধরে রাখতে সাহায্য করে। এর ঘাটতিতে ধীরে ধীরে বলিরেখা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া বায়ুদূষণ, সূর্যের আলো এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রাও ত্বকের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
ত্বকের যত্নে তাই বাইরে থেকে প্রসাধনী ব্যবহারের পাশাপাশি শরীরের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগানোও দরকার। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কয়েক ধরনের খাবার রাখলে ত্বকের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।
রঙিন ফলমূল ও শাকসবজিতে মিলবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
গাজর, টমেটো, ক্যাপসিকাম, আম ও অন্যান্য রঙিন ফলমূল এবং শাকসবজিতে ক্যারোটিনয়েডসহ বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এসব উপাদান দূষণ ও সূর্যের আলো থেকে সৃষ্ট ক্ষতির বিরুদ্ধে ত্বকের কোষকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
গাজর ও টমেটোর মতো খাবারে থাকা বিটা-ক্যারোটিন, লাইকোপিন ও লুটিন ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হতে পারে। ভিটামিন এ ত্বকের কোষের বৃদ্ধি এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ক্যারোটিনয়েড ত্বকের আর্দ্রতা, দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখার প্রক্রিয়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু গবেষণায় এসব উপাদানের সঙ্গে কোলাজেন ও ইলাস্টিনের উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এসব পুষ্টি উপাদান শরীরে ভালোভাবে শোষিত হওয়ার জন্য খাবারের সঙ্গে অল্প পরিমাণ স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখা যেতে পারে। যেমন, টমেটো বা গাজরের সঙ্গে সামান্য জলপাইয়ের তেল খেলে ক্যারোটিনয়েড শোষণে সুবিধা হতে পারে।
আম খাওয়ার পরিমাণেও থাকতে হবে ভারসাম্য
আমে ক্যারোটিনয়েড, ভিটামিন সি এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এসব উপাদান ত্বকের কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, মেনোপজ-পরবর্তী নারীরা ১৬ সপ্তাহ ধরে সপ্তাহে চার দিন ৮৫ গ্রাম করে আম খাওয়ার পর তাঁদের ত্বকের আগে থেকে থাকা বলিরেখার আকার কমেছিল এবং নতুন বলিরেখার সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছিল।
তবে গবেষণাটিতে একটি ভিন্ন ফলও পাওয়া যায়। প্রতিদিন প্রায় ২৫০ গ্রাম আম খাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে বলিরেখা বেড়েছিল। গবেষকেরা ধারণা করেছেন, আমের প্রাকৃতিক চিনির পরিমাণ এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তাই আম উপকারী হলেও অতিরিক্ত খাওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিমিত পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের ফল খাওয়াই ভালো।
ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে
আম, কমলা, মাল্টা, পেয়ারা ও অন্যান্য ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল ত্বকের যত্নে গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এটি ত্বকের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু গবেষণায় ভিটামিন সি গ্রহণের সঙ্গে ত্বকের আর্দ্রতা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত রঞ্জকতার উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ কারণেই ত্বকের যত্নের বিভিন্ন প্রসাধনীতেও ভিটামিন সি ব্যবহার করা হয়।
বাদাম ও বীজে থাকে স্বাস্থ্যকর চর্বি
কাঠবাদাম, আখরোট, হ্যাজেলনাট এবং বিভিন্ন ধরনের বীজ ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। এসব খাবারে থাকা ভিটামিন ই কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। ভিটামিন ই-এর ঘাটতি হলে ক্ষত সারতে দেরি হওয়াসহ ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বাদামে থাকা ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের সুরক্ষাবেষ্টনী শক্তিশালী রাখতে ভূমিকা রাখে। এতে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা সহজ হয়।
একটি ছোট নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে, টানা ১৬ সপ্তাহ বাদাম খাওয়া অংশগ্রহণকারীদের ত্বকে দৃশ্যমান বলিরেখা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে শুধু বাদাম খেলেই বলিরেখা দূর হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই।
প্রতিদিনের খাবারে অল্প পরিমাণ বাদাম ও বীজ রাখা যেতে পারে। সালাদ, ওটস বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে এগুলো যোগ করেও খাওয়া যায়।
অন্ত্রের সুস্থতা ত্বকের ওপরও প্রভাব ফেলে
ত্বকের স্বাস্থ্যের সঙ্গে অন্ত্রের জীবাণুরও সম্পর্ক রয়েছে। উদ্ভিদজাত বিভিন্ন খাবার খেলে অন্ত্রের উপকারী জীবাণু এমন কিছু যৌগ তৈরি করতে পারে, যেগুলোর প্রদাহবিরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
সুস্থ অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সহায়তা করে। এর ফলে ত্বকের কিছু সমস্যার ক্ষেত্রেও উপকার পাওয়া যেতে পারে। সোরিয়াসিসের মতো প্রদাহজনিত ত্বকের সমস্যার সঙ্গে অন্ত্রের জীবাণুর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।
এ জন্য শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট ফল বা সবজি নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদজাত খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। খাদ্যতালিকায় ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণশস্য, বিভিন্ন ধরনের ভেষজ পাতা ও মসলা রাখা যেতে পারে।
গাঁজানো খাবারও হতে পারে উপকারী
দই, কিমচি এবং অন্যান্য গাঁজানো খাবার অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর জন্য সহায়ক হতে পারে। এসব খাবার সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে খেলে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে গাঁজানো খাবার খেলেই ত্বকের সব সমস্যা দূর হবে, এমন নয়। ব্যক্তিভেদে খাবারের প্রভাব আলাদা হতে পারে। তাই খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শুধু খাবার নয়, সূর্য থেকে সুরক্ষাও জরুরি
স্বাস্থ্যকর খাবার ত্বকের পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করলেও সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে না। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির পাশাপাশি দৃশ্যমান আলো ও অবলোহিত বিকিরণও ত্বকের বয়স বাড়ার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। অতিরিক্ত তাপমাত্রাও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই বাইরে যাওয়ার সময় উপযুক্ত সূর্যরোধী প্রসাধনী ব্যবহার, প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় প্রয়োগ এবং ছায়া বা সুরক্ষামূলক পোশাকের আশ্রয় নেওয়া জরুরি।
খাবারের পরিবর্তনে ত্বকে দৃশ্যমান সুফল পেতেও সময় লাগে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের পর পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন বুঝতে আট থেকে দশ সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে, ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখার জন্য কোনো একক খাবারের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই কার্যকর পথ। রঙিন ফলমূল ও শাকসবজি, পরিমিত আম, বাদাম, বীজ, পূর্ণশস্য এবং গাঁজানো খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ এবং সূর্যের আলো থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখলে দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা পাওয়া সম্ভব।












