ফ্রান্সে সাম্প্রতিক দাঙ্গার দৃশ্য দেখে প্রশ্ন উঠছে, এমন পরিস্থিতি কি অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে? প্রশ্নটি অমূলক নয়। কিন্তু এর মধ্যেই অনেকে ভুলে যাচ্ছেন, ২০১১ সালে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরেও একই ধরনের সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাট ঘটেছিল। প্যারিসের রাস্তায় যা দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে লন্ডনের সেই অভিজ্ঞতার মিল এতটাই স্পষ্ট যে দাঙ্গার কারণ খুঁজতে দূরবর্তী রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়ে আইনশৃঙ্খলার ভঙ্গুরতা নিয়ে ভাবা বেশি জরুরি।
দাঙ্গা শুরু হলে রাজনীতিক, ভাষ্যকার ও গবেষকদের মধ্যে এর অন্তর্নিহিত অর্থ খোঁজার প্রবণতা দেখা যায়। কোনো ঘটনা থেকে অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটলে তার সঙ্গে অভিবাসননীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সরকারের ব্যর্থতা কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংকটকে যুক্ত করা হয়। এসব বিষয়ের বাস্তব গুরুত্ব থাকতে পারে। কিন্তু প্রতিটি সহিংস ঘটনাকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখলে একটি মৌলিক সত্য আড়ালে পড়ে যায়: দাঙ্গায় অংশ নেওয়া অনেক মানুষ কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নয়, বরং শাস্তির ঝুঁকি কমে যাওয়া এবং লুটপাটের সুযোগ তৈরি হওয়ায় রাস্তায় নামে।
২০১১ সালের ব্রিটিশ দাঙ্গার দিকে ফিরে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সে সময় বিভিন্ন শহরে তরুণেরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, দোকানপাটে হামলা চালায় এবং প্রায় আড়াই হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে জলকামান ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক চলেছিল। শেষ পর্যন্ত পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
পরে দাঙ্গার পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ ব্যাখ্যা করার বহু চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেসব ব্যাখ্যার কোনোটিই সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। বহু ক্ষেত্রে ঘটনাগুলোর সবচেয়ে সরল ব্যাখ্যাই বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়: পুলিশের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যাওয়ায় দোকান থেকে জুতা, পোশাক, ইলেকট্রনিক পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী চুরি করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

রাজনৈতিক অসন্তোষের উপস্থিতি অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অসন্তোষ থাকা আর সেই অসন্তোষের কারণে লুটপাটে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। কোনো নীতির বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে মানুষ সভা করতে পারে, প্রতিবাদ জানাতে পারে, নির্বাচনে মত প্রকাশ করতে পারে কিংবা যুক্তি দিয়ে অন্যদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে পারে। এসব পথের বদলে সহিংসতা ও চুরিকে বেছে নিলে সেটিকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ বলে ব্যাখ্যা করার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
এখানেই দাঙ্গা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে। কোনো সহিংসতার সময় একটি নির্দিষ্ট দাবি সামনে আসতে পারে, কিন্তু তাতে অংশ নেওয়া প্রত্যেকের উদ্দেশ্য একই হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো ঘটনা প্রথমে ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে; পরে সেই ক্ষোভের আবহে এমন লোকজনও যুক্ত হতে পারে, যাদের প্রধান লক্ষ্য ব্যক্তিগত লাভ।
মার্কিন নগর রাজনীতিবিষয়ক গবেষক এডওয়ার্ড ব্যানফিল্ড তাঁর ১৯৭০ সালের বই ‘দ্য আনহেভেনলি সিটি’-তে শহুরে দাঙ্গার এই দিকটি বিশ্লেষণ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, কোনো একটি ঘটনা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে এবং সেই ক্ষোভ বহু মানুষকে একই সময়ে রাস্তায় নামার উপলক্ষ দিতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ করার ঝুঁকি কমে আসে। একই সঙ্গে লুটপাটের সুযোগ বেড়ে যায়।
একজন ব্যক্তি একা দোকানে ঢুকে চুরি করতে গেলে ধরা পড়ার আশঙ্কা বেশি। কিন্তু বহু মানুষ যখন একযোগে ভাঙচুর ও লুটপাটে নামে, তখন পুলিশ সবার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারে না। বিশৃঙ্খলার মধ্যে অপরাধের ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়ে, আর ব্যক্তিগত লাভের সম্ভাবনা বাড়ে। এভাবে রাজনৈতিক ক্ষোভের প্রাথমিক উপলক্ষ ধীরে ধীরে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যেখানে অপরাধই হয়ে ওঠে প্রধান কর্মকাণ্ড।
ব্রিটেনের ২০১১ সালের দাঙ্গা নিয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘রিডিং দ্য রায়টস’ গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের সাক্ষাৎকার ও ঘটনার বিবরণে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ধারণাটি উঠে এসেছিল। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লোকজনকে একত্র হওয়া, মুখ ঢাকার সরঞ্জাম এবং হাতুড়ি নিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছিল। পুলিশের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়লে আরও মানুষ লুটপাটে উৎসাহিত হয়।

সেই সময় সহিংসতার মধ্যে রাজনৈতিক স্লোগান শোনা গেলেও লুটপাটের লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত বাস্তব। কেউ জুতার দোকানে হামলা করেছে, কেউ পোশাকের দোকানে ঢুকেছে, কেউ বড় টেলিভিশন চুরি করেছে। এমনকি দাঙ্গার সুযোগ কাজে লাগিয়ে চুরির জন্য লোক ভাড়া করা এবং সহিংসতায় ব্যবহারের সরঞ্জাম বিক্রির মতো ঘটনাও ঘটেছিল। এসব আচরণকে কেবল রাজনৈতিক ক্ষোভের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে অপরাধের স্বতন্ত্র উদ্দেশ্যটি হারিয়ে যায়।
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ দাঙ্গার পেছনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবের কথা বলেছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সে অতিরিক্ত অভিবাসনকে দায়ী করেছেন। দুটি ব্যাখ্যার পেছনেই বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু দাঙ্গার ঘটনাগুলোকে এসব বিতর্কের কোনো একটির সরাসরি ফল হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে আরও সতর্ক হওয়া দরকার।
ইউরোপে ব্যাপক অভিবাসন এবং অভিবাসীদের অনেককে নির্দিষ্ট শহুরে এলাকায় কেন্দ্রীভূত করার নীতি নিয়ে সমালোচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এমন ব্যবস্থায় কোনো কোনো এলাকায় তরুণ পুরুষের সংখ্যা বেশি হয়ে ওঠা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সংহতির সমস্যা তৈরি হওয়া এবং অপরাধের ঝুঁকি বাড়ার মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। আবার কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ক্ষোভও নির্দিষ্ট সময়ে সহিংসতার সূত্রপাত ঘটাতে পারে।
কিন্তু এসব সম্ভাব্য কারণের কোনোটি দিয়েই দাঙ্গার সব দিক ব্যাখ্যা করা যায় না। ফ্রান্সে অভিবাসন নিয়ে বর্তমান বিতর্কের অনেক আগেও দাঙ্গা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে ১৯৬৮ সালেও বড় ধরনের সহিংসতা দেখা গিয়েছিল। ব্রিটেনের ২০১১ সালের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে, একটি দেশের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছাড়াও একই ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। দাঙ্গার ধরন দেশ ও সময়ভেদে বদলালেও পুলিশের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়া, জনতার মধ্যে অপরাধের সুযোগ তৈরি হওয়া এবং দোকানপাটে হামলার পুনরাবৃত্তি একটি পরিচিত চিত্র।
এ কারণে কোনো দাঙ্গার পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট খোঁজা এবং দাঙ্গা মোকাবিলার পদ্ধতি নির্ধারণ—এই দুটি কাজ আলাদা রাখা দরকার। দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য, অভিবাসন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা রাজনৈতিক অসন্তোষের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু রাস্তায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু হলে প্রথম দায়িত্ব হলো জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ বন্ধ করা।

মাখোঁর পক্ষ থেকে তেলের দাম কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে দাঙ্গা থামানোর ধারণা তাই পরিস্থিতির প্রকৃতি সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির ইঙ্গিত দেয়। জ্বালানির মূল্য কোনো জনগোষ্ঠীর অসন্তোষের একটি কারণ হতে পারে, কিন্তু দোকান লুট করা বা সরকারি ভবনে আগুন দেওয়ার তাৎক্ষণিক সমাধান মূল্যছাড়ের মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী কারফিউ, কার্যকর পুলিশি তৎপরতা এবং দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার মতো পদক্ষেপ বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
ব্রিটেনের অভিজ্ঞতা দেখায়, নাগরিকের প্রতিবাদ করার অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃঢ় থাকা সম্ভব। তবে এ জন্য কর্তৃপক্ষকে আগেভাগে প্রস্তুত থাকতে হবে। বিক্ষোভের অধিকার এবং সহিংসতার অনুমতি এক বিষয় নয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে সুরক্ষা দিতে হবে, একই সঙ্গে এমন আইন ও ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা নতুন ধরনের বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় কার্যকর।
আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতাও জরুরি। পরিবেশনীতি নিয়ে আন্দোলনকারী হোক কিংবা অভিবাসনবিরোধী গোষ্ঠী—কোনো পক্ষই সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাটের মাধ্যমে আইনের বাইরে যাওয়ার অধিকার পেতে পারে না। অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নির্ভর করা উচিত আচরণ ও প্রমাণের ওপর, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নয়। দ্রুত পদক্ষেপের পাশাপাশি অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
সভ্য সমাজের শক্তি কেবল তার নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষমতায় নয়, সেই স্বাধীনতার পরিবেশ বজায় রাখার সক্ষমতাতেও নিহিত। রাষ্ট্র যখন রাস্তায় নিজের কর্তৃত্ব হারায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু দোকানদার বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়; সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, জনজীবনের স্বাভাবিকতা এবং আইনের প্রতি আস্থাও।
দাঙ্গাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের একটি চরম রূপ হিসেবে রোমান্টিক করে দেখার প্রবণতা তাই বিপজ্জনক। সহিংসতার পেছনে ক্ষোভ থাকতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষোভ লুটপাটকে বৈধ করে না। যে সমাজ এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে না, সেখানে অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার সুযোগ পায়। দাঙ্গা থামানোর প্রথম শর্ত হলো, একে দাঙ্গা হিসেবেই দেখা—অপরাধকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে না আসা।













