ঢাকার পুরান শহরের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী সাইদুল হক এখনো চাকরি খুঁজছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করলেও সংসারের খরচ চালাতে তাঁকে নির্ভর করতে হচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে পড়ানো এবং স্ত্রীর আয়ের ওপর। তাঁদের সংসারে এখনো সন্তান নেই। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বিদ্যুৎ ও রান্নার গ্যাসের বাড়তি ব্যয় সামলাতে গিয়ে এরই মধ্যে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
সাইদুলের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানো কতটা কঠিন হয়ে উঠছে। চার মাস আগে প্রিপেইড বিদ্যুতের জন্য ১ হাজার টাকা খরচ করলে প্রায় ৩৫ দিন চলত। এখন সেই টাকা দিয়ে তিন সপ্তাহও পার করা কঠিন। একই সময়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ২৫০ টাকায় পৌঁছেছে। নিত্যব্যবহার্য প্রসাধনসামগ্রী ও পরিচ্ছন্নতার পণ্যে দুই মাসে তাঁদের ব্যয় ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। ফলে আগে যে ব্র্যান্ডের পণ্য কিনতেন, এখন তার বদলে কম দামের স্থানীয় পণ্য ব্যবহারের কথা ভাবছেন তাঁরা।
সাইদুলের অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক হিসাব নয়। আয় সীমিত থাকলে বাজারে প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধিই সংসারের অন্য কোনো খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত সামনে আনে। খাবার, যাতায়াত, বিদ্যুৎ, রান্নার জ্বালানি কিংবা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পণ্য—সব খাতের ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে পরিবারকে শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনের তালিকাই ছোট করতে হয়।
আয় বাড়ে না, খরচ বাড়ে প্রতিদিন
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৭.২২ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ৭.০২ শতাংশ। অর্থাৎ, খাদ্যপণ্যের দামের চাপ নতুন করে বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতির হার কমা বা বাড়ার পরিসংখ্যানের বাইরে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো, মাসের আয় দিয়ে আগের মতো বাজার করা যাচ্ছে কি না। চাল, ডাল, ডিম, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল ও সবজির মতো পণ্য কিনতে গিয়ে পরিবারের বাজেটের বড় অংশ শেষ হয়ে গেলে চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়িভাড়া কিংবা জরুরি সঞ্চয়ের জন্য অর্থ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৫ সালের জীবনমান জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকার ৫১.৯১ শতাংশ, শহরাঞ্চলের ৪০.১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২.১১ শতাংশ পরিবার মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে, গড় মাসিক ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা।
এই ব্যবধান দেখায়, অনেক পরিবারের সমস্যা শুধু বাজারদর বেশি হওয়া নয়; নিয়মিত আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে না পারাও বড় সংকট। ধার করে সংসার চালালে পরবর্তী মাসের আয়ের একটি অংশ আগের ঋণ শোধে চলে যায়। ফলে সামান্য নতুন ব্যয়ও পরিবারকে আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়লে চাপ ছড়ায় পুরো বাজারে
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু মোটরসাইকেল, বাস কিংবা পণ্যবাহী ট্রাকের মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষিপণ্য ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য উৎপাদনস্থল থেকে পাইকারি বাজারে এবং সেখান থেকে খুচরা দোকানে পৌঁছাতে পরিবহন প্রয়োজন। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে সেই চাপ যুক্ত হয়। শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ ভোক্তার ওপর পড়তে পারে।
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সরকার ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায়। অক্টোবরে দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারিত ছিল।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর রাজধানীর বাজারে সবজি, ডিম, মাছ, মুরগি, আটা ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রতিটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে শুধু জ্বালানির দামকে দায়ী করা যায় না। উৎপাদন, সরবরাহ, মজুত, আমদানি ব্যয় এবং বাজারের প্রতিযোগিতাও দামের ওপর প্রভাব ফেলে।
বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও চাঁদাবাজির বাড়তি বোঝা
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারি মূল্যতালিকা প্রকাশ বা খুচরা দোকানে অভিযান যথেষ্ট নয়। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পণ্য কীভাবে যাচ্ছে, প্রতিটি পর্যায়ে কত ব্যয় ও মুনাফা যুক্ত হচ্ছে এবং কোথায় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে—তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
বেসরকারি গবেষণায় সরবরাহে ঘাটতি, ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ এবং মজুতদারিকে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন বাজারে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম, গরুর মাংস, রুই মাছ ও মুরগির সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে অনুসন্ধানে এসব সমস্যার চিত্র উঠে এসেছে।
সরকার বাজার তদারকির কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছে। অতিরিক্ত দাম আদায়, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অন্যান্য অনিয়মের বিরুদ্ধে জেলা পর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। তবে বাজারে অনিয়ম শনাক্ত ও শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং অভিযানগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করাও জরুরি।
এর সঙ্গে চাঁদাবাজির অভিযোগ যুক্ত হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতা উভয়েই চাপে পড়েন। ঢাকার ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর চাঁদাবাজি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে গাবতলীর এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর মাসিক ১২ হাজার টাকা দোকানভাড়া ও অন্যান্য বিলের বাইরে তিনটি স্থানীয় গোষ্ঠীকে ৮ হাজার টাকা দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে এক চায়ের দোকানির মাসে ৫ হাজার টাকা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দেওয়ার তথ্যও রয়েছে। প্রতিশোধের আশঙ্কায় প্রতিবেদনে তাঁদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশ ঢাকায় ১ হাজার ২০০ জন সন্দেহভাজন চাঁদাবাজকে শনাক্ত করেছে বলেও জানানো হয়েছে।
দোকান চালাতে এ ধরনের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হলে ব্যবসায়ীর পরিচালন ব্যয় বাড়ে। সেই ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য চাঁদাবাজিই দায়ী—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার তথ্য প্রয়োজন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ চাঁদাবাজি, জমি দখল ও রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহারের অভিযোগে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে কার্যকর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত হিসাব মেলাতে হয় পরিবারকেই
বাজারে দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের পরিবার সাধারণত একসঙ্গে সব খরচ বাড়াতে পারে না। কোথাও খাবারের বৈচিত্র্য কমে, কোথাও সস্তা পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়ে, আবার কোথাও ঋণ নিয়ে মাসের শেষ পর্যন্ত চলতে হয়। সাইদুল হকের পরিবার যেমন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যের বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বিকল্প খুঁজছে, তেমনি অনেক পরিবারকেই আয় অপরিবর্তিত রেখে ব্যয়ের নতুন হিসাব করতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দায়িত্ব শুধু মূল্যস্ফীতির হার প্রকাশ বা বাজারে অভিযান পরিচালনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা, অস্বাভাবিক মুনাফা ও মজুতদারি প্রতিরোধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পর্যবেক্ষণ এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ, মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান অর্থনীতির একটি চিত্র তুলে ধরে, কিন্তু একটি পরিবারের বাস্তব অবস্থা বোঝা যায় মাস শেষে হাতে কত টাকা থাকে, কতটা ধার করতে হয় এবং কোন প্রয়োজনটি বাদ দিতে হয়—সেই হিসাব থেকে।












