ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ তিন দিনের দাঙ্গা ও লুটপাটে রূপ নেওয়ার পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ১৬ অক্টোবরের সহিংসতায় দেশটিতে তিন হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আড়াই হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হন। চলতি সপ্তাহান্তে আবারও বিক্ষোভ শুরু হলেও কিছু এলাকায় কারফিউ জারি থাকায় অগ্নিসংযোগ ও সম্পদহানির ঘটনা তুলনামূলক কম ছিল।
ফ্রান্সের এই পরিস্থিতি কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; এর প্রভাব ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানেও পড়তে পারে। জাপান টাইমস-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে সাবেক কূটনীতিক ও ফরেন পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট কুনি মিয়াকে ফ্রান্সের বর্তমান অস্থিরতার সঙ্গে অতীতের কয়েকটি বড় বিক্ষোভের তুলনা টেনেছেন। তাঁর মতে, ইতিহাস হুবহু ফিরে না এলেও পুরোনো ঘটনার সঙ্গে নতুন পরিস্থিতির মিল দেখা যেতে পারে।
১৯৬৮ সালের আন্দোলন থেকে বর্তমানের শিক্ষা
ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় গণআন্দোলনগুলোর একটি ছিল ১৯৬৮ সালের মে মাসের বিদ্রোহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবির পাশাপাশি যুদ্ধবিরোধী ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবও আন্দোলনে জায়গা করে নেয়।
দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আড়ালে তরুণদের মধ্যে জমে থাকা হতাশা, অনমনীয় বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থা এবং প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গলের রক্ষণশীল ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এর প্রভাবে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থায় সংস্কার আসে এবং শেষ পর্যন্ত দ্য গল পদত্যাগ করেন।
একই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতেও শিক্ষার্থী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, যা পরে ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও জাপানেও ছড়িয়ে পড়ে। এসব আন্দোলন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, নারীবাদ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করতে ভূমিকা রাখে।
চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবও একই সময় চলছিল। মাও সে তুংয়ের উৎসাহে রেড গার্ডরা বিপ্লবী স্লোগান নিয়ে মাঠে নামে। তবে মিয়াকের মতে, চীনের ওই আন্দোলনকে পশ্চিমা সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার উৎস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মাও তরুণদের বিপ্লবী উদ্দীপনাকে নিজের ক্ষমতা সংহত করা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
২০০৫ থেকে ইয়েলো ভেস্ট: জমে থাকা ক্ষোভ
ফ্রান্সে পরবর্তী বড় অস্থিরতা দেখা দেয় ২০০৫ সালে প্যারিসের উপশহরগুলোতে। অভিবাসী পরিবারের তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব, জাতিগত বৈষম্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সরকারের কঠোর নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ষাটের দশকের আন্দোলনের মতো এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি; বরং দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনা থেকে তৈরি হওয়া স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল।
এই অস্থিরতা ফ্রান্সের অভিবাসীদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার নীতির সীমাবদ্ধতাও সামনে আনে। জাতি বা ধর্ম নির্বিশেষে সমান আচরণের নীতির পরও অভিবাসী সম্প্রদায়ের বাস্তব বৈষম্য দূর করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছিল।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সরকারের প্রস্তাবিত জ্বালানি কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শুরু হয় ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সংগঠিত এই বিক্ষোভে শ্রমিক, নিম্ন আয়ের পরিবার ও স্বনিয়োজিত মানুষ অংশ নেন। বিশেষত গ্রামাঞ্চল, উপশহর ও ছোট শহরের মানুষের কাছে গাড়ি ছিল দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। পরে আন্দোলনটি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে নগরকেন্দ্রিক অভিজাতদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।
২০২৩ সালের পর থেকে অস্থিরতার ধারাবাহিকতা
২০২৩ সালে আলজেরীয় বংশোদ্ভূত এক কিশোর পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর ফ্রান্সে নতুন করে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। একই বছর পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধেও বড় বিক্ষোভ হয়। শিক্ষানীতি নিয়েও জনঅসন্তোষ অব্যাহত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে চলতি মাসের বিক্ষোভকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম; বরং ২০২৩ সাল থেকে চলতে থাকা সামাজিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতা হিসেবেই একে দেখা যায়।
বিশ্বজুড়ে ছড়ানোর আশঙ্কা
ষাট ও সত্তরের দশকের আন্দোলনগুলো মূলত মার্ক্সবাদ, নিউ লেফটের মতো রাজনৈতিক মতাদর্শ, শিক্ষার্থী সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। বর্তমানের অনেক বিক্ষোভে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা সুসংগঠিত কাঠামো নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এগুলোকে দ্রুত ছড়িয়ে দিলেও ক্ষোভ কখনো কখনো লুটপাট, ভাঙচুর ও ভোগ্যপণ্য ধ্বংসের মতো ঘটনায় রূপ নিচ্ছে।
তবে এসব আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত থাকবে—এমন ধারণার সঙ্গে একমত নন মিয়াকে। তাঁর প্রধান উদ্বেগ, ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থী শক্তিগুলো অস্থিরতাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। অতীতের উদারপন্থী শিক্ষার্থী আন্দোলন এবং বর্তমানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতার মিল থাকলেও, বর্তমানের কিছু আন্দোলনে সামাজিক মুক্তির বদলে বিদেশিবিদ্বেষ ও জনতুষ্টিবাদ জায়গা করে নিচ্ছে।
জাপানেও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। দেশটিতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অভিবাসীর সংখ্যা কম হলেও তা স্থায়ী সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না। বৈষম্য বাড়তে থাকলে এবং বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলে জাপানেও একই ধরনের অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
মিয়াকের মতে, ফ্রান্সের বিক্ষোভকে দূরের কোনো দেশের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পরিণতি নির্ভর করতে পারে সামাজিক ক্ষোভ কীভাবে রাজনৈতিক রূপ নেয় এবং কোন শক্তি সেই ক্ষোভকে কাজে লাগায় তার ওপর।












