রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রেখে কলা চাষের এক বিকল্প পদ্ধতি গড়ে তুলেছেন অস্ট্রেলিয়ার কৃষক ফ্রাঙ্ক সিয়াক্কা। প্রায় ২৮ বছর ধরে এই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করার পর তাঁর খামারে উৎপাদিত লাল ডগাযুক্ত কলা এবার জাপানের বাজারে প্রবেশ করেছে। ‘ইকোগ্যানিক’ নামে পরিচিত এই চাষপদ্ধতিতে মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্যকে উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় ইনিসফেইলে অবস্থিত প্যাসিফিক কোস্ট ইকো ব্যানানাস খামারে এই কলা উৎপাদিত হয়। কলার ডগায় খাদ্যোপযোগী লাল মোমের প্রলেপ দেওয়া হয়, যা ইকোগ্যানিক পদ্ধতিতে উৎপাদনের পরিচয় বহন করে। উৎপাদকদের দাবি, এই কলা সাধারণ কলার তুলনায় বেশি মিষ্টি এবং দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
রাসায়নিকনির্ভর চাষ থেকে বিকল্প পদ্ধতি
১৯৯৮ সালে প্রচলিত পদ্ধতিতে কলা চাষ করতে গিয়ে মাটির স্বাস্থ্য অবনতি এবং পোকামাকড়ের সমস্যা বাড়তে দেখেন ফ্রাঙ্ক সিয়াক্কা। দীর্ঘদিন রাসায়নিক ব্যবহারের ওপর নির্ভরতার কারণে তিনি বিকল্প চাষপদ্ধতি তৈরির উদ্যোগ নেন।
ইকোগ্যানিক পদ্ধতিতে শুধু রাসায়নিক উপকরণের বদলে জৈব উপকরণ ব্যবহার করাই লক্ষ্য নয়। বরং খামারের বাস্তুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ, জীববৈচিত্র্য পরিমাপ এবং চাষের কারণে পরিবেশে কী প্রভাব পড়ছে, তা নিয়মিত যাচাই করা হয়। প্রতি দুই সপ্তাহে একজন কীটতত্ত্ববিদ খামারে এসে তথ্য সংগ্রহ করেন। আগাছা, ছত্রাক, মাটির অণুজীব এবং অন্যান্য জীবের অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
সিয়াক্কার মতে, চাষের প্রতিটি অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ প্রকৃতিকে নতুন ভারসাম্য তৈরির চাপে ফেলে। তাই উৎপাদনব্যবস্থায় এমন ভারসাম্য গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য, যাতে পোকামাকড় ও রোগবালাই বড় ধরনের ক্ষতি করতে না পারে।
উৎপাদন কম, তবে খরচও কম
প্রচলিত পদ্ধতি থেকে ইকোগ্যানিকে রূপান্তর সহজ ছিল না। প্রথম কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল বলে জানান সিয়াক্কা। কীটনাশক ও মাইটনাশক বন্ধ করার পর খামারের বাস্তুতন্ত্রকে নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সময় লেগেছে।
এই পদ্ধতিতে কলা পরিপক্ব হতে বেশি সময় নেয় এবং উৎপাদনের পরিমাণ প্রচলিত শিল্পের গড় উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ। তবে বাণিজ্যিক সার ও রাসায়নিক চিকিৎসার উপকরণ কিনতে না হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমে। পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য শক্তিশালী হওয়ায় প্রচলিত খামারগুলোতে দেখা দেওয়া পোকামাকড় ও রোগের কারণে ক্ষতির ঝুঁকিও কমেছে বলে সিয়াক্কার দাবি।
কুইন্সল্যান্ডের কৃষি ও মৎস্য বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক টনি প্যাটিসনও খামারটিতে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাটির খাদ্যজাল ও কার্বন পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকায় পরজীবী ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে। ধীরে বেড়ে ওঠা ফলের মধ্যে শর্করা ও স্বাদের বৈশিষ্ট্যও ভালোভাবে বিকশিত হতে পারে।
জাপানের বাজারে নতুন সম্ভাবনা
নিজেদের দেশের বাজারের পাশাপাশি হংকং ও সিঙ্গাপুরে কলা সরবরাহের পর সিয়াক্কার প্রতিষ্ঠান এবার জাপানে রপ্তানি শুরু করেছে। মে মাসে পরীক্ষামূলক চালান পাঠানো হয় এবং সেপ্টেম্বরে দেশটিতে ব্যাপক বিতরণ শুরু হয়।
বিশ্ব সমন্বিত বাণিজ্য সমাধান ডেটাবেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাপান প্রায় ১২ লাখ টন কলা আমদানি করেছে। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ এসেছে ফিলিপাইন থেকে। প্যাসিফিক কোস্ট ইকো ব্যানানাসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডায়ান সিয়াক্কার মতে, জাপানের বাজারে শুধু কলার প্রতি নয়, উৎপাদনপদ্ধতি, গুণমান এবং পণ্যের পেছনের গল্পের প্রতিও আগ্রহ রয়েছে।
তবে ইকোগ্যানিক পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে বাজারে ভালো দামের নিশ্চয়তা জরুরি। টনি প্যাটিসনের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইন, লাওস ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু কলাচাষি বিকল্প পদ্ধতিতে আগ্রহ দেখালেও উৎপাদনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও চুক্তির কারণে দ্রুত পরিবর্তন কঠিন। ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব পণ্যের জন্য বেশি দাম দিতে রাজি হলে অন্য কৃষকেরাও এই পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত হবেন।












