যুক্তরাষ্ট্রে সারা বছর ডে-লাইট সেভিংস টাইম বা দিনের আলো সাশ্রয়ী সময় চালু রাখার প্রস্তাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শীতকালে দিনের আলো ফোটার আগেই অনেক শিশুকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হতে হবে। এতে সড়ক দুর্ঘটনায়, বিশেষ করে পথচারী শিশুদের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি অঙ্গরাজ্যের ১৬ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮৬ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজিতে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বছরে দুইবার ঘড়ির সময় পরিবর্তনের যে নিয়ম চালু রয়েছে, তার বদলে সারা বছর ডে-লাইট সেভিংস টাইম রাখা হলে ওই ১৪টি অঙ্গরাজ্যেই প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ৩৫ কোটি ৬০ লাখ স্কুলযাত্রা হবে সূর্যোদয়ের আগে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে হিসাব করলে এ সংখ্যা বছরে ২০০ কোটির বেশি হতে পারে।
অন্ধকারে স্কুলযাত্রায় বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
গবেষকেরা ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণঘাতী সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। বিশেষভাবে স্কুল চলাকালীন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে ঘটে যাওয়া ১০ হাজারের বেশি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা পরীক্ষা করা হয়।
এতে দেখা যায়, সূর্যোদয়ের আগের দুর্ঘটনায় পথচারী জড়িত থাকার আশঙ্কা সূর্যোদয়ের পরের দুর্ঘটনার তুলনায় ৭৭ শতাংশ বেশি। ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। অন্ধকারে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় তাদের পথচারী হিসেবে জড়িত থাকার আশঙ্কা দিনের আলোর সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ধকারে চালকদের পক্ষে রাস্তার পথচারীদের দেখতে অসুবিধা হয়। শিশুদের উচ্চতা তুলনামূলক কম হওয়ায় তাদের শনাক্ত করাও কঠিন। স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তা পার হওয়া কিংবা বাসস্টপে অপেক্ষা করার সময় তারা বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ে।
এ ছাড়া ছোট শিশুরা গাড়ির গতি ও দূরত্ব ঠিকভাবে বুঝতে সব সময় সক্ষম হয় না। কিশোর চালকদের ক্ষেত্রেও অভিজ্ঞতার অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কেন ডে-লাইট সেভিংস টাইম নিয়ে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে মার্চের দ্বিতীয় রোববার ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয়। নভেম্বরের প্রথম রোববার তা আবার এক ঘণ্টা পিছিয়ে আনা হয়। গরমের সময় সন্ধ্যায় বেশি আলো পাওয়ার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
যাঁরা সারা বছর ডে-লাইট সেভিংস টাইম রাখার পক্ষে, তাঁদের যুক্তি হলো এতে বছরে দুবার ঘড়ির সময় পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না। পাশাপাশি শীতকালেও সন্ধ্যায় বেশি সময় আলো থাকবে। এতে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উপকৃত হতে পারে। সন্ধ্যায় বাইরে হাঁটা, ব্যায়াম ও বিনোদনের সুযোগও বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে গত জুলাইয়ে পাস হওয়া সানশাইন প্রোটেকশন অ্যাক্টে সারা বছর এই সময়ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। তবে আইনটি কার্যকর হলে শীতকালে সূর্যোদয়ও এক ঘণ্টা পিছিয়ে যাবে। ফলে সকালে স্কুল ও কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় অন্ধকার বেশি সময় ধরে থাকবে।
অন্যদিকে স্থায়ীভাবে স্ট্যান্ডার্ড টাইম চালুর পক্ষেও মত রয়েছে। এতে শীতকালের প্রচলিত সময় সারা বছর বজায় থাকবে এবং সকালে তুলনামূলক বেশি আলো পাওয়া যাবে।
ঘুম ও শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ নিয়ে কাজ করা কয়েকটি চিকিৎসাবিষয়ক সংগঠন স্থায়ী স্ট্যান্ডার্ড টাইমের পক্ষে। তাদের যুক্তি, সকালের প্রাকৃতিক আলো মানুষের শরীরের জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি ঘুম, সজাগ থাকা এবং শরীরের অন্যান্য স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, সব শিশু সমানভাবে এই ঝুঁকির মুখে পড়বে না। নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা তুলনামূলক বেশি বিপদে পড়তে পারে। কারণ, তাদের অনেককে স্কুলের সকালের খাবার কর্মসূচিতে অংশ নিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই বাড়ি থেকে বের হতে হয়। আবার এসব পরিবারের শিশুদের হেঁটে বা গণপরিবহনে স্কুলে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি সরাসরি কোনো পরীক্ষামূলক গবেষণা নয়। ঘড়ির সময় পরিবর্তন করে দুর্ঘটনার সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। বরং স্কুলের সময়সূচি, সূর্যোদয়ের হিসাব এবং অতীতের দুর্ঘটনার তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়েছে। দেশজুড়ে হিসাব করার সময় সকাল ৮টায় স্কুল শুরু হওয়ার অনুমানও ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি এক নয়।
সময় পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুদের মানিয়ে নেওয়ার উপায়
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ঘড়ির সময় পরিবর্তনের কয়েক দিন আগে থেকেই শিশুদের ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিনে ছোটখাটো পরিবর্তন আনা উচিত। সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়ার আগে প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিনিট করে ঘুমানোর সময় পিছিয়ে দিলে শিশুদের মানিয়ে নিতে সুবিধা হতে পারে। খাবার, গোসল ও সন্ধ্যার অন্যান্য কাজের সময়ও ধীরে ধীরে পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শিশুদের প্রাকৃতিক আলোতে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দিনের বেলায় বাইরে খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমও রাতে ভালো ঘুমে সহায়তা করে। ঘুমানোর আগে মোবাইল, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন পর্দা থেকে দূরে রাখাও জরুরি।
এ ছাড়া শীতকালে সন্ধ্যা দ্রুত নামায় স্কুল থেকে ফেরার সময় শিশুদের নিরাপত্তায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। হাঁটা বা সাইকেল চালানোর সময় প্রতিফলকযুক্ত পোশাক পরা, সাইকেলে আলো ব্যবহার করা এবং নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। সম্ভব হলে শিশুদের দলবদ্ধভাবে বা বড়দের সঙ্গে যাতায়াত করাও নিরাপদ।
সময় পরিবর্তনের মূল বিতর্ক তাই শুধু সন্ধ্যায় বেশি আলো পাওয়া নয়। দিনের আলো সকাল না সন্ধ্যায় পাওয়া মানুষের জন্য বেশি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত, সেই প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে।












