বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে ইলেকট্রনিক সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ জুয়ান অ্যাটকিনস আর নেই। গত ৩১ অক্টোবর মারা গেছেন ডেট্রয়েট টেকনো সংগীতের এই জনক। প্রযুক্তি, ভবিষ্যৎ ও মানবজীবন নিয়ে গভীর আগ্রহকে তিনি রূপ দিয়েছিলেন এক নতুন ধরনের সংগীতে। তাঁর হাত ধরেই জন্ম নিয়েছিল এমন এক সংগীতধারা, যা পরে সারা বিশ্বে পরিচিতি পায় টেকনো নামে।
জুয়ান অ্যাটকিনস ছিলেন ডেট্রয়েট টেকনোর তিন প্রতিষ্ঠাতার একজন। ‘বেলভিল থ্রি’ নামে পরিচিত এই তিন সংগীতশিল্পীর অন্য দুজন হলেন কেভিন সন্ডারসন ও ডেরিক মে। তিনজনই স্কুলজীবনের বন্ধু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অ্যাটকিনস প্রথম কোরগ এমএস-১০ সিনথেসাইজার কিনেছিলেন। অন্য দুজনকে ডিজে হিসেবে কাজ করার কৌশলও শিখিয়েছিলেন তিনি।
রিক ডেভিসের সঙ্গে তাঁর গড়া সংগীতজুটি সাইবোট্রনের কাজ পরবর্তী সময়ে টেকনো সংগীতের ভিত্তি তৈরি করে। শুধু নতুন সংগীত তৈরি করাই নয়, এই ধারার নামও দিয়েছিলেন অ্যাটকিনস। তাঁর সৃজনশীলতা এবং আশপাশের সংগীতশিল্পীদের উৎসাহিত করার ক্ষমতা ইলেকট্রনিক সংগীতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা থেকে নতুন সংগীত
১৯৭০-এর দশকে কিশোর বয়স থেকেই প্রযুক্তি ও মহাকাশ নিয়ে অ্যাটকিনসের আগ্রহ ছিল প্রবল। ডেট্রয়েট থেকে মিশিগানের বেলভিলে যাওয়ার পর নিজের শোবার ঘরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সংগীত তৈরির কাজে সময় কাটাতেন। বিশেষ করে নতুন ধরনের ড্রাম বিট তৈরিতে তাঁর আগ্রহ ছিল।
তাঁর সংগীতচর্চায় বড় প্রভাব রেখেছিল গভীর রাতের রেডিও অনুষ্ঠান ‘দ্য মিডনাইট ফাঙ্ক অ্যাসোসিয়েশন’। চার্লস ‘দ্য ইলেকট্রিফাইং মোজো’ জনসনের উপস্থাপনায় পাঁচ ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে প্রিন্স, মাইকেল জ্যাকসন, পার্লামেন্ট-ফাঙ্কাডেলিক থেকে শুরু করে জাপানের ইয়েলো ম্যাজিক অর্কেস্ট্রা এবং জার্মানির ক্রাফটওয়ার্কের মতো শিল্পীদের গান প্রচারিত হতো।
বিশ্বের বিভিন্ন ধারার সংগীতের সঙ্গে পরিচয় এবং সহজলভ্য হয়ে ওঠা নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন অ্যাটকিনস। বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের বাইরে সাধারণ সংগীতশিল্পীদের হাতেও যখন সিনথেসাইজারের মতো যন্ত্র পৌঁছাতে শুরু করে, তখন তিনি সেই প্রযুক্তিকে সৃজনশীলতার নতুন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন।
মহাকাশ, সময় ভ্রমণ, ভিনগ্রহের প্রাণী এবং ভবিষ্যতের সমাজ ছিল তাঁর কল্পনার বড় অংশ। ‘স্টার ট্রেক’ ও ‘লস্ট ইন স্পেস’-এর মতো টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখতেন নিয়মিত। এইচ পি লাভক্রাফট ও আইজ্যাক আসিমভের বইও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল।
তাঁর চিন্তাজগৎ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল আর্থার সি ক্লার্কের ‘চাইল্ডহুডস এন্ড’ এবং অ্যালভিন টফলারের ‘ফিউচার শক’ ও ‘দ্য থার্ড ওয়েভ’। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর ও শিল্পভিত্তিক সমাজের পর প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সমাজব্যবস্থার ধারণা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।
এই চিন্তার ছাপ পাওয়া যায় তাঁর সংগীতজগতের বিভিন্ন নামেও। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রেকর্ড লেবেলের নাম ‘মেট্রোপ্লেক্স’, যা ভবিষ্যতের বিশাল নগরীর কথা মনে করিয়ে দেয়। আর রিক ডেভিসের সঙ্গে গড়া জুটির নাম ‘সাইবোট্রন’, যার মধ্যে যন্ত্র ও মানুষের সম্পর্কের এক ভবিষ্যৎ কল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তির প্রতি অন্ধ বিশ্বাস নয়
প্রযুক্তি নিয়ে গভীর আগ্রহ থাকলেও অ্যাটকিনস এর সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাঁর বেড়ে ওঠা ডেট্রয়েটে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল শহরটি। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে শিল্পকারখানার অবক্ষয় শহরটির অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে বড় পরিবর্তন আনে।
শিল্পসমাজের পতন এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবস্থার উত্থান তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। ১৯৯৬ সালে নির্মিত ‘ইউনিভার্সাল টেকনো’ প্রামাণ্যচিত্রে শিল্পকারখানার অবক্ষয়ে বিপর্যস্ত ডেট্রয়েটের পটভূমিতে তিনি বলেছিলেন, শহরটির শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে প্রযুক্তির জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে। তাঁর মতে, ডেট্রয়েটের বিশেষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ না থাকলে এই ধরনের সংগীতের জন্ম হয়তো অন্য কোনো মার্কিন শহরে সম্ভব হতো না।
ডেট্রয়েটের মেয়র মেরি শেফিল্ড তাঁর মৃত্যুর পর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, আজ বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ যে সংগীতে নাচেন, তার শিকড় জুড়ে আছে অ্যাটকিনস ও তাঁর শহর। ডেট্রয়েটের অবহেলিত এলাকাগুলো থেকেই প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম ও উদ্ভাবনের এই গল্প তৈরি হয়েছে।
ডেট্রয়েট থেকে বার্লিন, তারপর বিশ্বজুড়ে
ডেট্রয়েটের নগরজীবনের সংকট ও পরিবর্তনের মধ্যে জন্ম নেওয়া ডেট্রয়েট টেকনো সংগীত নব্বইয়ের দশকে নতুন আবাস খুঁজে পায় জার্মানির বার্লিনে। বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির পুনর্মিলনের সময় শহরটির সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে এই সংগীত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বার্লিনের বিখ্যাত ক্লাব ও রেকর্ড লেবেল ট্রেজরের প্রতিষ্ঠাতা দিমিত্রি হেগেম্যানের মতে, অ্যাটকিনস, জেফ মিলস ও রবার্ট হুডের মতো মার্কিন সংগীতশিল্পীরা তখনকার পরিবর্তনশীল বার্লিনকে নতুন সংগীতের ভাষা দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, অ্যাটকিনসের সংগীত ছিল স্বাধীনতার সুর।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীত তৈরি ও পরিবেশন করেছেন অ্যাটকিনস। জীবনের শেষ বছরেও আন্তর্জাতিক সংগীতমঞ্চে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০২৬ সালে আমস্টারডাম ড্যান্স ইভেন্টের ৩০তম আয়োজন এবং ডেট্রয়েটের নিজস্ব ইলেকট্রনিক সংগীত উৎসব মুভমেন্টে অংশ নেন।
২০২৩ সালে ২৮ বছর বিরতির পর সাইবোট্রনকে আবার সক্রিয় করেন তিনি। মরিটজ ফন ওসভাল্ডের ভাতিজা লরেন্স ফন ওসভাল্ডের সহযোগিতায় প্রকাশিত হয় ‘মেইনটেইন দ্য গোল্ডেন রেশিও’ ও ‘প্যারালাল শিফট’ নামের দুটি গান। অ্যাটকিনসের কাজের ব্যাপ্তি স্মরণ করে লরেন্স বলেন, মনে হতো তিনি এমন কোনো জায়গায় ভ্রমণ করে এসেছেন, যেখানে অন্য কেউ পৌঁছাতে পারেননি। সেখান থেকে নতুন কিছু নিয়ে ফিরে এসে তা সবাইকে দেখিয়েছেন।
যন্ত্রের ভেতরেও মানুষের অনুভূতি
প্রায় তিন দশক আগে অ্যাটকিনস বুঝতে পেরেছিলেন, বিশ্ব ক্রমেই এমন এক যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে বদলে দেবে। তিনি এই সময়কে বলতেন ‘টেকনো এজ’ বা প্রযুক্তির যুগ।
তবে তাঁর কাছে প্রযুক্তি কখনোই নিজস্ব উদ্দেশ্য ছিল না। বরং মানুষের আবেগ ও সৃজনশীলতাকে নতুনভাবে প্রকাশ করার মাধ্যম ছিল এটি। সিনথেসাইজার ও কিবোর্ডের বিভিন্ন সুবিধা সম্পর্কে বলতে গিয়ে একবার তিনি বলেছিলেন, এসব যন্ত্রে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে সংগীত যতটা সম্ভব মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। ডেট্রয়েটের বিশেষত্বও ছিল সেখানে। প্রযুক্তির সাহায্যে সংগীতের মধ্যে মানুষের আবেগ মিশিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল সেখানকার সংগীতের পরিচয়।
এই দর্শনই জুয়ান অ্যাটকিনসের সংগীতকে আলাদা করেছে। তিনি ভবিষ্যতের শব্দ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু সেই শব্দের কেন্দ্রে রেখেছিলেন মানুষকে। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ডেট্রয়েট টেকনো সংগীতের এক প্রতিষ্ঠাতা হারিয়ে গেলেও বিশ্বসংগীতে তাঁর তৈরি করা ভবিষ্যতের সুর বেঁচে থাকবে।












