বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা। গত সেপ্টেম্বর শেষে এ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে। অর্থাৎ, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে নতুন ঋণ গ্রহণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব শুধু ব্যাংকিং খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; নতুন বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মানুষের আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকঋণ বেসরকারি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিল্পকারখানা সম্প্রসারণ, নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, কাঁচামাল আমদানি, যন্ত্রপাতি কেনা, উৎপাদন বাড়ানো কিংবা চলতি মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে উদ্যোক্তারা ব্যাংকের ওপর নির্ভর করেন। ঋণপ্রবাহ দীর্ঘ সময় দুর্বল থাকলে এসব কার্যক্রম সংকুচিত হয়। এর ফলে অর্থনীতিতে একদিকে বিনিয়োগ কমে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে। মাত্র দুই বছরের কিছু বেশি সময়ে প্রবৃদ্ধি অর্ধেকেরও নিচে নেমে যাওয়ার এই প্রবণতা অর্থনীতির চাহিদা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অর্থ শুধু ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণ কম হওয়া নয়। এর পেছনে রয়েছে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, দুর্বল বাজারচাহিদা এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা। এসব সমস্যা একে অন্যের প্রভাব বাড়িয়ে অর্থনীতিতে সংকোচনের চাপ তৈরি করছে।
ঋণ কমছে, বাড়ছে বিনিয়োগের স্থবিরতা
ঋণপ্রবাহের এই পতনের পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের চাহিদা কমেছে। দ্বিতীয়ত, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তৃতীয়ত, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার নতুন বিনিয়োগকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত আগস্টে ব্যাংকঋণের গড় সুদহার ছিল ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, ঋণপ্রবৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় অনেক কম। প্রকৃত অর্থে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ সম্প্রসারণ সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুলাইয়ে নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ঋণের ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো। কিন্তু সুদহারের এই পরিবর্তন ঋণের চাহিদা বাড়াতে পারেনি। কারণ, উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণের সুদ কমার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বিনিয়োগ করে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন কি না, প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাবেন কি না এবং ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও দুর্বল বাজারচাহিদা, জ্বালানির ঘাটতি এবং শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়ার বিষয়টি ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা শুধু ঋণ পাচ্ছেন না, এমন নয়; নতুন ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের মতো অনুকূল পরিস্থিতিও দেখছেন না।
এই পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহের ঘাটতি। জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংকের মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন ঋণ অনুমোদনে ব্যাংকগুলো আরও সতর্ক হচ্ছে। ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি বেশি মনে হলে ভালো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পেতে সমস্যায় পড়তে পারে।
ব্যাংকে টাকা আছে, বিনিয়োগে যাচ্ছে না
ঋণপ্রবাহ কমলেও ব্যাংক খাতে অর্থের ঘাটতি নেই। বরং বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য জমা হয়েছে। গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪১ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা।
এখানে অর্থনীতির একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে ব্যাংকে বিপুল অর্থ পড়ে রয়েছে, অন্যদিকে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অর্থাৎ, অর্থের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও উৎপাদনশীল খাতে ঋণের চাহিদা তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব বিশ্লেষণেও বিষয়টি উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুর্বল ঋণ চাহিদা বিনিয়োগের স্থবিরতা, ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ মুনাফা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা এবং কয়েকটি ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন। একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ সম্প্রসারণ দুর্বল রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহ দেখাতে পারে। সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ায় ব্যাংকের ঝুঁকি কমে। কিন্তু উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতে অর্থায়ন দুর্বল থাকলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে যায়। ফলে ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়লেও অর্থনীতিতে তার ইতিবাচক প্রভাব সীমিত থাকে।
বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কোথায় তৈরি হবে
বেসরকারি খাত বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান উৎস। নতুন কারখানা স্থাপন, শিল্পের সম্প্রসারণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সেবা খাতের বিকাশের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ঋণপ্রবাহ দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে নতুন কারখানা স্থাপন ও পুরোনো কারখানার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে নতুন চাকরি তৈরির সুযোগ কমে যায়।
এর প্রভাব শুধু নতুন চাকরিপ্রার্থীদের ওপর পড়বে না। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন কমানো, নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখা কিংবা কর্মীসংখ্যা কমাতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, নির্মাণ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে শ্রমবাজারের পরিস্থিতিতেও। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও এর বিপরীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ৮৭ লাখ। অর্থাৎ, প্রায় ৫৩ লাখ তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি হয়নি। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের গতি কমে গেলে এই চাপ আরও বাড়বে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও সমতা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল শ্রমচাহিদা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আনুমানিক আরও ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। একই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে আনুমানিক ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ ও রপ্তানি সংকোচনের পাশাপাশি উচ্চ ঋণব্যয় এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতাও এর পেছনে কাজ করেছে।
অর্থাৎ, ঋণপ্রবাহের সংকট শুধু ব্যবসায়ীদের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে মানুষের চাকরি, আয়, ক্রয়ক্ষমতা এবং দারিদ্র্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কর্মসংস্থান কমলে পরিবারের আয় কমে, ভোগব্যয় সংকুচিত হয়। এতে বাজারে পণ্যের চাহিদা আরও কমে যায়। উদ্যোক্তারা তখন উৎপাদন বাড়াতে বা নতুন বিনিয়োগ করতে আরও অনাগ্রহী হন। এভাবে অর্থনীতিতে একটি নেতিবাচক অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হতে পারে।
কম প্রবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে
বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্যও বড় ঝুঁকি। কারণ, অর্থনীতির উৎপাদনশীল সক্ষমতা বাড়াতে নতুন যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, কারখানা, অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ঋণ ও বিনিয়োগের গতি কমে গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগও সংকুচিত হয়।
বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭—উভয় অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। সংস্থাটি বলেছে, জ্বালানি খাতের সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগের নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকিং, জ্বালানি ও রাজস্ব খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি ব্যয় বা সরকারি ঋণ দিয়ে সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা সম্ভব হলেও তা বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প হতে পারে না। কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোক্তাদের নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সহজে অর্থায়ন পাওয়ার সুযোগ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসার স্থিতিশীল পরিবেশ।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কতটা কার্যকর হবে
আর্থিক খাতে গতি ফেরাতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক শিল্প, কৃষি ও অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় বিভিন্ন অর্থায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না। উদ্যোক্তারা যদি বাজারে চাহিদা না দেখেন, জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা না পান কিংবা ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে কম সুদের ঋণও প্রত্যাশিত ফল দেবে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিদ্যমান নীতি সুদহারের কারণে ব্যাংকগুলোর পক্ষে অনেক কম সুদে ঋণ দেওয়া কঠিন। একই সঙ্গে এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও অর্থ ছাড়ের গতি ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি ক্ষেত্রে একযোগে পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যাংকগুলো উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত জটিলতা কমিয়ে ব্যবসার ব্যয় ও অনিশ্চয়তা হ্রাস করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। তবে সুদের হার কমানো এককভাবে যথেষ্ট নয়। ঋণের অর্থ যেন প্রকৃত উৎপাদন, নতুন শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্যাংকে অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধিকে অর্থনীতির সুস্থতার একমাত্র সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সেই অর্থ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে, কারখানার উৎপাদনে এবং মানুষের কর্মসংস্থানে কতটা ভূমিকা রাখছে, সেটিই আসল বিষয়।
সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসা তাই একটি সতর্কসংকেত। এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিনিয়োগের স্থবিরতা, শিল্পের উৎপাদন সংকোচন, নতুন কর্মসংস্থানের অভাব এবং মানুষের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়বে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর। অর্থনীতিকে সচল রাখতে তাই শুধু ব্যাংকের তারল্য বাড়ানো নয়, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের বাস্তব পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।












