ইরানে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে পোশাক ও জুতার দাম এক বছরে বেড়েছে ১০৩ দশমিক ৭ শতাংশ। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের অক্টোবরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু এই খাতেই নয়, শিক্ষা, পরিবহন, আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামেও নতুন রেকর্ড হয়েছে। সামগ্রিকভাবে গত অক্টোবর পর্যন্ত ১২ মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশে, যা প্রকাশিত তথ্যের পুরো সময়সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরকে ভিত্তি ধরে ভোক্তা মূল্যসূচক গত অক্টোবরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬১ দশমিক ৮ পয়েন্টে। অর্থাৎ ভিত্তিবছরের তুলনায় নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবার ঝুড়ি কিনতে এখন ৭ দশমিক ৬ গুণেরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
সাত মাসে দাম বেড়েছে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ
ইরানের নতুন বর্ষপঞ্জি শুরু হয় ২২ মার্চ। চলতি বছরের মার্চে দেশটির ভোক্তা মূল্যসূচক ছিল প্রায় ৫৪২ দশমিক ৩ পয়েন্ট। অক্টোবরের মধ্যে তা বেড়ে ৭৬১ দশমিক ৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র সাত মাসে সামগ্রিক মূল্যসূচক বেড়েছে ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ।
২০১১ সালের পর ইরানের কোনো বর্ষপঞ্জির প্রথম সাত মাসে এটিই সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি। এর আগে ২০২২ সালে একই সময়ে দাম বেড়েছিল ৩১ দশমিক ২ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ড ছাড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
অক্টোবরে সামগ্রিক বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে ১২টি প্রধান পণ্য ও সেবা খাতের মধ্যে ৯টিতেই প্রথমবারের মতো বার্ষিক মূল্যস্ফীতি তিন অঙ্কে পৌঁছেছে।
পোশাক ও জুতায় এক বছরে দাম বেড়েছে ১০৩ দশমিক ৭ শতাংশ
ইরানের পোশাক ও জুতা খাতে মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অক্টোবরে এ খাতের মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে কোনো অক্টোবর মাসে এই খাতে এত বেশি মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়নি। এর আগের রেকর্ড ছিল ২০১৮ সালের অক্টোবরে, যখন দাম বেড়েছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
আরও উদ্বেগজনক হলো, গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় চলতি বছরের অক্টোবরে পোশাক ও জুতার দাম বেড়েছে ১০৩ দশমিক ৭ শতাংশ। দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের সংরক্ষিত তথ্যের পুরো সময়সীমায় এই প্রথম এ খাতের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি তিন অঙ্কে পৌঁছাল।
১২ মাসের হিসাবে পোশাক ও জুতা খাতের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ২ শতাংশে, যা এ খাতের আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে।
শিক্ষায় মূল্যবৃদ্ধির নতুন রেকর্ড
অক্টোবরে শিক্ষা খাতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট হিসাবের সময়সীমায় এটিই এ খাতের সর্বোচ্চ বার্ষিক মূল্যবৃদ্ধি।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শিক্ষাসেবার ব্যয় বেড়েছে ৪৯ দশমিক ৯ শতাংশ। আর ১২ মাসের হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ। শিক্ষাবর্ষ শুরু ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সময় হওয়ায় সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—এই দুই মাসে শিক্ষা খাতের ব্যয় বেড়েছে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ। এই দুই মাসের হিসাবে এটিও নতুন রেকর্ড।
মূল্যস্ফীতির বড় চাপ পরিবহন ও আবাসনে
অক্টোবরের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ৭৫ শতাংশের বেশি এসেছে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা খাত থেকে। পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের ৭০ দশমিক ৫৬ শতাংশ এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। অক্টোবরে এ খাতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশীয় পয়েন্ট অবদান রেখেছে।
খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করেছে পরিবহন। অক্টোবরে এ খাতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। পরিবারের ভোগব্যয়ের ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ পরিবহন খাতে ব্যয় হয়। ফলে এক মাসেই সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে এ খাতের অবদান ছিল ০ দশমিক ৯৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আবাসন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি। পরিবারের ভোগব্যয়ের ৩৬ দশমিক ১১ শতাংশ এ খাতে ব্যয় হয়। অক্টোবরে খাতটিতে দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে ০ দশমিক ৭৭ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ করেছে।
এ ছাড়া পোশাক ও জুতা ০ দশমিক ৩৭, বিবিধ পণ্য ও সেবা ০ দশমিক ৩৩, স্বাস্থ্যসেবা ০ দশমিক ৩০ এবং আসবাব ও গৃহস্থালি সরঞ্জাম ০ দশমিক ২৮ শতাংশীয় পয়েন্ট অবদান রেখেছে।
অন্যদিকে খাদ্য, পানীয় ও তামাক খাতের অবদান ছিল মাত্র ১ শতাংশীয় পয়েন্ট। মাসিক মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি হলেও মোট পারিবারিক ব্যয়ের মাত্র ০ দশমিক ৮৮ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় হওয়ায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে এ খাতের অবদান ছিল ০ দশমিক ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।












