ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের মতো রোগ শুধু শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে না, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে ফেলে। এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ও ভালো ঘুম এই ঝুঁকির প্রভাব কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে। এতে বলা হয়েছে, বিপাকীয় ও হৃদ্রোগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা ভালো ঘুমান, তাঁদের মস্তিষ্কের আয়তন তুলনামূলক বেশি এবং বিভিন্ন জ্ঞানীয় পরীক্ষায় ফলও ভালো।
গবেষণায় প্রায় ৪ লাখ ৯ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁরা যুক্তরাজ্যের বায়োব্যাংকের অংশগ্রহণকারী। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫৪ হাজার মানুষের অন্তত একটি বিপাকীয় বা হৃদ্রোগজনিত সমস্যা ছিল। এই অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৩৫ হাজারের মস্তিষ্কের এমআরআই পরীক্ষাও করা হয়।
গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের অভ্যাস সম্পর্কে জানতে চান। তাঁদের বিবেচনায় ভালো ঘুমের মধ্যে ছিল রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো, সকালে স্বাভাবিকভাবে সক্রিয় থাকা, নাক না ডাকা, অনিদ্রা না থাকা এবং দিনের বেলায় ঘন ঘন ঘুম না পাওয়া।
ভালো ঘুমে মস্তিষ্কের আয়তন বেশি
গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা ভালো ঘুমান, তাঁরা সাধারণ জ্ঞানীয় দক্ষতা, সমস্যা সমাধান এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের পরীক্ষায় তুলনামূলক ভালো করেছেন।
শুধু পরীক্ষার ফল নয়, তাঁদের মস্তিষ্কের মোট আয়তনও তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের ধূসর ও সাদা পদার্থের পরিমাণ ভালো ঘুমানো ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি ছিল। যাঁদের বিপাকীয় বা হৃদ্রোগজনিত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট।
গবেষকদের মতে, ভালো ঘুম এসব রোগের সঙ্গে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং মস্তিষ্কের আয়তন হ্রাসের সম্পর্ক দুর্বল করতে পারে। তবে গবেষণাটি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ভালো ঘুম সরাসরি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ায়।
ঘুম কীভাবে মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দিতে পারে
গবেষণার সহলেখক ও সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নিউরোএপিডেমিওলজিস্ট অ্যাবিগেইল ডোভের মতে, ভালো ঘুম শরীরের সামগ্রিক প্রদাহ কমাতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ মস্তিষ্কের বয়সজনিত পরিবর্তন এবং জ্ঞানীয় সক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম কারণ। বিপাকীয় ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে এ ধরনের প্রদাহ সাধারণত বেশি থাকে।
আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো মস্তিষ্কের বর্জ্য অপসারণব্যবস্থা, যা গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থা মূলত ঘুমের সময় বেশি সক্রিয় থাকে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বর্জ্য অপসারণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। ফলে ক্ষতিকর পদার্থ জমে মস্তিষ্কের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঘুম বিশেষজ্ঞ ও স্নায়ুরোগ চিকিৎসক ক্রিস্টোফার উইন্টারও মনে করেন, পর্যাপ্ত সময় ধরে মানসম্মত ও নিয়মিত ঘুম শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ঘুম মস্তিষ্ক থেকে ক্ষতিকর পদার্থ ও প্রোটিনজাতীয় জমাট উপাদান সরানোর প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি রক্তচাপ ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপরও ঘুমের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও ঘুমের অভ্যাস
গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। ফলে ভালো ঘুমের কারণে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো থাকে, নাকি অন্য কোনো কারণ দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করছে, তা নিশ্চিত করা যায়নি। অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের তথ্যও তাঁদের নিজেদের দেওয়া উত্তরের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
উইন্টারের পরামর্শ, ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক রাখা জরুরি। শোবার ঘর অতিরিক্ত গরম বা উজ্জ্বল হওয়া, বেশি শব্দ, ঘুমের আগে ক্যাফেইন বা অ্যালকোহল গ্রহণ এবং নিয়মিত ব্যায়াম না করার মতো অভ্যাস ঘুমের মান নষ্ট করতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের অনিদ্রা বা অন্য ঘুমের সমস্যা শুধু অভ্যাস পরিবর্তন করে সমাধান নাও হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
গবেষকদের মূল বক্তব্য হলো, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের সঙ্গে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার সম্পর্ক থাকলেও ভালো ঘুম সেই ঝুঁকির প্রভাব কিছুটা কমাতে পারে। তাই এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি ঘুমের সময়, মান ও নিয়মিততার দিকেও নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।












