ট্রাম্পের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, গর্ভবতী নারীরা যদি টাইলেনল (প্যারাসিটামল) ব্যবহার করেন তবে তাদের সন্তানের অটিজম হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তিনি ছোট শিশুদের টিকা গ্রহণেও বিলম্ব বা বিরত থাকার আহ্বান জানান। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব মন্তব্য ভিত্তিহীন ও বিপজ্জনক।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব ওয়েস স্ট্রিটিং জনগণকে সতর্ক করে বলেছেন, চিকিৎসা বিষয়ে ট্রাম্পের কথায় কোনো গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অবস্থান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, ভ্যাকসিন জীবন রক্ষাকারী এবং অটিজমের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সংস্থার মুখপাত্র তারিক জাশারেভিচ বলেন, “ভ্যাকসিন অটিজম ঘটায় না। ভ্যাকসিন অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচায়, তাই এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো জায়গা নেই।”
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মত
ট্রাম্পের মন্তব্যের পরপরই যুক্তরাজ্যের মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি (MHRA) জানায়, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল ব্যবহারের সঙ্গে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই। সংস্থার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ড. অ্যালিসন কেভ বলেন, গর্ভবতী নারীদের ব্যথা ও জ্বর উপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তাই চিকিৎসকদের নির্দেশিত ওষুধ ব্যবহার জরুরি।
ইউরোপ ও স্পেনের প্রতিক্রিয়া
ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি (EMA) জানিয়েছে, বৈজ্ঞানিক তথ্য পর্যালোচনা করে তারা কোনো প্রমাণ পাননি যে গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল খেলে অটিজম হয়। স্পেনের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থাও একই অবস্থান জানায়। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোনিকা গার্সিয়া ট্রাম্পের মন্তব্যকে বিজ্ঞানের অস্বীকার বা ‘ডিনায়ালিজম’ বলে উল্লেখ করেন, যা জনজীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান
অস্ট্রেলিয়ার ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল নিরাপদ এবং অটিজম বা এডিএইচডির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বিশ্বজুড়ে অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে একযোগে ট্রাম্পের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের ভূমিকা
ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন তার স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের সঙ্গে। কেনেডি দীর্ঘদিন ধরে অটিজম ও টিকা নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক দাবি করে আসছেন। এ বছর তিনি অটিজমের ‘কারণ’ খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণযোগ্য কোনো তথ্য হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
অটিজম শনাক্তকরণ বাড়ার কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রতি ৩১ জন আট বছরের শিশুর মধ্যে একজনের অটিজম শনাক্ত হয়েছে। ২০০০ সালে এ হার ছিল ১৫০ জনে একজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর দুটি কারণ রয়েছে—
![]()
১. অটিজমের সংজ্ঞা প্রসারিত হয়েছে।
২. অভিভাবকরা সচেতনভাবে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন, ফলে শনাক্তকরণ বেড়েছে।
গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ
হোয়াইট হাউস একটি ২০২৫ সালের পর্যালোচনার ওপর নির্ভর করছে, যেখানে ৪৬টি গবেষণায় প্যারাসিটামল ব্যবহারের সঙ্গে স্নায়বিক জটিলতার সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তবে গবেষকেরা নিজেরাই জানিয়েছিলেন, এ গবেষণা কোনো কারণ-প্রমাণ করে না; বরং গর্ভবতী নারীদের সর্বনিম্ন মাত্রায় ও অল্প সময়ের জন্য ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে সুইডেনে ২৪ লাখ জন্মের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল ব্যবহার ও অটিজমের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
সারসংক্ষেপ
বিশ্বের প্রধান স্বাস্থ্য সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো একমত যে, প্যারাসিটামল ব্যবহারের সঙ্গে অটিজমের কোনো প্রমাণিত সম্পর্ক নেই। ট্রাম্প ও কেনেডির মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের চোখে বিপজ্জনক বিভ্রান্তি। চিকিৎসকরা বলছেন, জনগণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণিত তথ্য ও চিকিৎসকদের পরামর্শে আস্থা রাখতে হবে, রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 










