ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সচিব হিসেবে রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের নিয়োগের পর থেকে সরকারি নির্দেশনার উপর আস্থাহীনতা বাড়ছে। ফলে চিকিৎসক, গবেষক ও রাজ্য সরকারগুলো নিজেদের উদ্যোগে আলাদা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা দাঁড় করাচ্ছে।
নতুন পরামর্শ কমিটি নিয়ে অবিশ্বাস
সম্প্রতি ভ্যাকসিন সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে একাধিক টিকা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল। সেখানে চিকিৎসক ড. ড্যানিয়েল ক্রফোর্ড অভিযোগ করেন, কমিটি বিজ্ঞান নয় বরং পূর্বনির্ধারিত মতাদর্শের ভিত্তিতে কাজ করছে। তিনি জানান, তাদের সংগঠন আর এই কমিটির উপর ভরসা রাখছে না এবং বাইরের বিশেষজ্ঞদের উপর নির্ভর করছে।
‘ভ্যাকসিন ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্ট’
এই প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গড়ে তুলেছেন ‘ভ্যাকসিন ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্ট’। এ উদ্যোগ সর্বশেষ গবেষণা পর্যালোচনা করে চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকদের সঠিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন মাইকেল অস্টারহোম, যিনি দীর্ঘদিন ধরে সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করছেন। প্রাক্তন সিডিসি পরিচালক ড. রোশেল ওয়ালেনস্কি-ও এতে যুক্ত।
ট্রাম্প ও কেনেডির অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি শিশুদের টিকা আলাদা করে এবং দীর্ঘ ব্যবধানে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এছাড়া গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল ব্যবহারের সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক আছে বলে দাবি করেছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, এ দাবি প্রমাণহীন এবং গর্ভবতী নারীরা চিকিৎসকের পরামর্শে নিরাপদে এ ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন।
কেনেডি আবারও বলেন, ভ্যাকসিন ও অটিজমের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা দমন করা হয়েছে। কিন্তু মার্কিন চিকিৎসক সংগঠনগুলো এটিকে বিপজ্জনক দাবি করে জানায়, ভ্যাকসিনের সঙ্গে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই।
সিডিসি ও উপদেষ্টা প্যানেলে পরিবর্তন
মে মাসে কেনেডি গর্ভবতী নারী ও শিশুদের জন্য কোভিড টিকার সুপারিশ সরিয়ে দেন। জুনে এসে তিনি পুরো উপদেষ্টা কমিটি বদলে দেন, যেখানে সন্দেহপ্রবণ ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত হন। আগস্টে নতুন কমিটি কোভিড টিকা নিয়ে সরকারি জোরালো সুপারিশ প্রত্যাহার করে, চিকিৎসক বা নার্সের সঙ্গে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায়। এছাড়া চার বছরের নিচে শিশুদের জন্য এমএমআর ও চিকেনপক্সের যৌথ টিকার সুপারিশও বাদ দেওয়া হয়।

চিকিৎসক সমাজের প্রতিক্রিয়া
চিকিৎসক সংগঠনগুলো এ সিদ্ধান্তকে কঠোরভাবে সমালোচনা করছে। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের সভাপতি ড. সুসান ক্রেসলে বলেন, বৈঠকে ভুয়া দাবি প্রচার করা হয়েছে এবং শিশুদের নিয়মিত টিকা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা হয়েছে। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠনও জানিয়েছে, কোভিড টিকা নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও শক্তিশালী।
রাজ্য সরকারের ভূমিকা
কিছু অঙ্গরাজ্য সিডিসির পথ অনুসরণ না করে নিজেদের গাইডলাইন তৈরি করছে। ওরেগনের গভর্নর টিনা কোটেক বলেন, এখন রাজ্যগুলোকেই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, কারণ ফেডারেল সরকার বিশ্বাসযোগ্য নয়। পশ্চিম উপকূলের চারটি রাজ্য মিলে একটি নতুন জোট গঠন করেছে, যারা শরতের কোভিড, ফ্লু ও আরএসভি টিকার নিয়ম ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে, ফ্লোরিডা নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে তারা স্কুলশিশুদের টিকা বাধ্যতামূলক করবে না এবং ‘মেক আমেরিকা হেলদি এগেইন’ নীতির ভিত্তিতে নতুন কমিশন গঠন করবে।
ভ্যাকসিন ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্টের কার্যক্রম
![]()
এই প্রকল্প সরকারি সুপারিশ প্রতিস্থাপন করছে না, তবে গবেষণা-ভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করছে। অস্টারহোম জানিয়েছেন, তারা চিকিৎসক ও রাজ্য সরকারকে সহায়তা করতে তথ্য যাচাই করছে। গ্রীষ্মজুড়ে ড. কেটলিন ডাগডেল-সহ অনেক চিকিৎসক হাজারো গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ডেটা বাছাই করেছেন।
প্রকল্পের ফলাফল ইতিমধ্যেই বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন ব্যবহার করছে। যেমন, আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস নিজেদের টিকাদান সূচি প্রকাশ করেছে, যা সিডিসির থেকে আলাদা।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
সাবেক সিডিসি কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, যদি কেন্দ্রীয় জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দুর্বল হয়ে পড়ে তবে বিভ্রান্তি বাড়বে। অস্টারহোম বলেছেন, তাদের প্রকল্প অস্থায়ীভাবে চলছে, যতদিন না সিডিসি আবার আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
ফিলাডেলফিয়ার পারিবারিক চিকিৎসক ড. জেনিফার হ্যামিলটন বলেন, তিনি সবসময় সিডিসির নির্দেশনার উপর নির্ভর করতেন, কিন্তু এখন চিকিৎসক সংগঠনগুলোকেই বেশি বিশ্বাস করছেন। ‘আমি টুইটার পোস্ট থেকে স্বাস্থ্য নির্দেশনা নিতে অভ্যস্ত নই,’ তিনি মন্তব্য করেন।
কেনেডির নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক সমাজ, রাজ্য সরকার ও স্বাধীন গবেষকরা নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা দাঁড় করাচ্ছে। এতে কেন্দ্রীয় নীতির সঙ্গে সমান্তরাল এক জনস্বাস্থ্য জগৎ গড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে আরও গভীর বিভাজনের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 










