শিশুদের নিউমোনিয়া ও সংক্রমণজনিত মৃত্যুহার কমাতে বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের আরও কার্যকর নিউমোকোকাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (পিসিভি) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আধুনিক ভ্যাকসিন যুক্ত হলে দেশের শিশু টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য আরও টেকসই হবে।
নতুন প্রজন্মের ভ্যাকসিন নিয়ে আলোচনা
১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে আইসিডিডিআর,বি এবং রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর যৌথ আয়োজনে এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য অধিক কার্যকর নিউমোকোকাল ভ্যাকসিন চালুর প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা হয়।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআর,বি-র সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. মোঃ মাসউদুল হাসান। তিনি জানান, বাংলাদেশে শিশুদের নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্যমান পিসিভি-১০ ভ্যাকসিন ২০১৫ সাল থেকে ব্যবহৃত হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এটি শিশুদের উদীয়মান কিছু নিউমোকোকাল ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারছে না।
গবেষণার ফলাফল ও সুপারিশ
ড. হাসান জানান, সরকার পরিচালিত শিশু হাসপাতালে আসা শিশুদের নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে—বর্তমান পিসিভি-১০ ব্যবহারের পরও নতুন ধরনের নিউমোকোকাল স্ট্রেইন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও মৃত্যুর ঝুঁকি রয়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে গবেষক দল সুপারিশ করে যে, বাংলাদেশে পিসিভি-১৩, পিসিভি-১৫ বা পিসিভি-২০-এর মতো উন্নত সংস্করণ চালু করলে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ১৭% থেকে ৫২% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের মতামত
বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিনা আহমেদ বলেন,
“নিউমোনিয়া এখনো শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। কার্যকর ভ্যাকসিন ব্যবহার করলে শিশুদের জীবনরক্ষা সম্ভব এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।”
সভায় সভাপতিত্ব করেন আইসিডিডিআর,বি-র সিনিয়র বিজ্ঞানী ও জাতীয় ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (NITAG)-এর সদস্য ড. শেফারদৌসী কাদের। তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই পিসিভি-১৩ বা তার উন্নত সংস্করণ গ্রহণ করেছে, যা শিশু মৃত্যুহার কমাতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সম্ভাবনা
ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR)-এর সহযোগী গবেষক ড. তাজুল ইসলাম জানান, অর্থনৈতিক দিক থেকে পিসিভি-১০ থেকে পিসিভি-১৩-তে উন্নীত হওয়া বাংলাদেশের জন্য যুক্তিসঙ্গত ও টেকসই হবে, কারণ এর দাম খুব বেশি নয় কিন্তু সুরক্ষা অনেক বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ড. ফারহানা হোসেন বলেন, “আধুনিক ভ্যাকসিন চালু করতে হলে লজিস্টিক ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা হালনাগাদ করা জরুরি। এতে ভ্যাকসিন সরবরাহে স্থায়িত্ব আসবে।”
সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা
ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর প্রতিনিধিরা জানান, বাংলাদেশ যদি নতুন প্রজন্মের ভ্যাকসিন গ্রহণ করে, তাহলে তারা কারিগরি সহায়তা ও সরবরাহ চেইন ব্যবস্থায় সহযোগিতা করবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব ড. জাকিরুল হাসান বলেন, “স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এখন একটি বৈশ্বিক অগ্রাধিকার। নতুন প্রজন্মের ভ্যাকসিন গ্রহণ করলে শুধু শিশুদের জীবন নয়, দেশের ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত হবে।”
সমাপনী বক্তব্য
সমাপনী অধিবেশনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী তানজিলা হাসান বলেন,
“আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট—শিশুদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত নতুন প্রজন্মের পিসিভি চালু করতে হবে। গবেষণার তথ্য বলছে, এটি শিশু মৃত্যুহার কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।”
সভায় অংশগ্রহণকারী সবাই একমত হন যে, পিসিভি-১৩, পিসিভি-১৫ বা পিসিভি-২০-এর মতো আধুনিক ভ্যাকসিন চালু করা শিশুদের উন্নত স্বাস্থ্যসুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ইমিউনাইজেশন কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই সাফল্য ধরে রাখতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ও নতুন প্রজন্মের ভ্যাকসিন অন্তর্ভুক্ত করাই হবে ভবিষ্যতের শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি।
#বাংলাদেশস্বাস্থ্য #শিশুটিকাদান #নিউমোনিয়া #আইসিডিডিআরবি #নতুনভ্যাকসিন #স্বাস্থ্যনীতি #সারাক্ষণরিপোর্ট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 









