ব্যাঙ্ক অব ইউফ্রেটিসের ধারে কুর্দি নারী যোদ্ধাদের গর্বের মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়েছে। সড়কের পাশে পড়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা সামরিক যান। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস নিয়ন্ত্রণ, আর সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় সিরিয়ায় কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের দীর্ঘ পরীক্ষার অধ্যায়।
হঠাৎ ভাঙনের শুরু
দীর্ঘ এক বছর ধরে দামেস্কের সঙ্গে আলোচনার পরও কোনো সমঝোতা না হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আলেপ্পোর কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় সরকারি বাহিনী ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সরকার অতিরিক্ত সেনা পাঠায়। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই আলেপ্পো ছেড়ে সরে যায় কুর্দি বাহিনী। এই পিছু হটার সুযোগে সিরিয়ার বিভিন্ন আরব গোত্র সিদ্ধান্ত বদলে সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। সেই মুহূর্তেই কার্যত ভেঙে পড়ে কুর্দি বাহিনীর শক্ত ভিত।
শাসনের সংকট ও আরব অসন্তোষ
ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কুর্দি বাহিনীর ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও যুদ্ধ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার বহু শহর আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় কুর্দি শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। রাক্কার মতো শহরে, যেখানে সুন্নি গোত্রের প্রভাব প্রবল, সেখানে কুর্দি প্রশাসন ক্রমে কঠোর হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন রাষ্ট্রপতির প্রশংসা বা সিরিয়ার বিপ্লবী পতাকা ওড়ানোও গ্রেপ্তারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয়দের চোখে এই শাসন আর মুক্তির প্রতীক ছিল না।
গোত্রীয় বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক চাপ
সরকারি বাহিনী যখন রাক্কা ও দেইর এজ জোর অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়, তখন অনেক এলাকা আগেই গোত্রীয় যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কুর্দি বাহিনীর ভেতর থাকা হাজার হাজার আরব সদস্য দলত্যাগ করে। বড় কোনো লড়াই ছাড়াই পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়। একই সময়ে রাষ্ট্রপতি একটি ডিক্রি জারি করে কুর্দি সাংস্কৃতিক অধিকারের স্বীকৃতি দেন, যা কুর্দি বাহিনীর দরকষাকষির শক্তি আরও দুর্বল করে দেয়।

ভবিষ্যতের অন্ধকার পথ
কুর্দি বাহিনীর সামনে এখন প্রায় কোনো বিকল্প নেই। তাদের ইউনিট ভেঙে সিরীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তবে আলাদা কুর্দি ইউনিট থাকবে না। যুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসন ও নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে মিলিয়ে যাবে। কয়েক সপ্তাহ আগেই আরও ভালো প্রস্তাব ছিল, যেখানে আলাদা সামরিক বিভাগ ও নেতৃত্বের পদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সেই সুযোগ আর নেই।
আন্তর্জাতিক সমর্থনের অবসান
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলেও কুর্দি বাহিনীর গুরুত্ব কমে গেছে। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে তাদের মূল ভূমিকা প্রায় শেষ। এখন কুর্দিদের একমাত্র আশার জায়গা নতুন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা। তবে অভ্যন্তরীণ বিভাজন কুর্দি শিবিরকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
সহিংসতার আশঙ্কা ও নতুন ঝুঁকি
সরকার চার দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে কুর্দি বাহিনীকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের সময় দেয়। যুদ্ধবিরতি শেষ হলে বড় শহরগুলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। কুর্দি এলাকাগুলো শক্তভাবে সুরক্ষিত হওয়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা প্রবল। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ভয় বাড়ছে। এই অস্থিরতার মধ্যেই আরেক বিপদ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি বাহিনীর পাহারায় থাকা ইসলামিক স্টেটের বন্দিদের একটি অংশ পালিয়ে গেছে। একটি যুদ্ধ শেষ হলেও নতুন সংঘাতের বীজ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি স্পষ্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















